সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলে মরিচের বাম্পার ফলন

সিরাজগঞ্জ জেলার কয়েকটি উপজেলা যমুনার তীর ঘেসে গড়ে উঠেছে। এগুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, চৌহালি, শাহজাদপুর ও বেলকুচি উপজেলা। চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জীবিকা সন্ধানে কৃষিকাজের সাথে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও চরাঞ্চলে এবার বারোমাসি মরিচের আবাদ করেছেন । অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শে হাইব্রিড ও দেশীয় বিভিন্ন জাতের মরিচ চাষে সফলতা পেয়েছেন হাজারো কৃষক। পেয়েছে মরিচের বাম্পার ফলন তাছাড়াও বাজারে কাঁচা মরিচের দাম সন্তোষজনক হওয়ায় কৃষকেরা মুখে হাসি ফুটেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা থাকলেও। কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে মরিচের আবাদ করেছেন। বিশেষ করে যমুনা নদীসংলগ্ন চরাঞ্চলগুলোতে মরিচ চাষের বিস্তার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
উল্লেখিত সূত্রে আরো জানা যায়, জেলায় যমুনা, বিজলী, রশনী, ঝিলিক, বারি মরিচ-৩, সুপার সনিক, বগুড়া ও রংপুরীসহ বিভিন্ন উন্নত ও স্থানীয় জাতের মরিচের আবাদ হয়েছে। অধিক ফলন এবং তুলনামূলক কম রোগবালাইয়ের কারণে এসব জাতের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
চরাঞ্চলের মাঠজুড়ে সবুজ গাছের ডালে ঝুলে থাকা লাল-সবুজ মরিচ এখন গ্রামীণ জনপদে এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৪ হাজার মেট্রিক টন মরিচ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ফলন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হওয়ায় উৎপাদন সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী মমিন সেখ বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৪০ থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষক হানিফ উদ্দিন জানায়, উৎপাদন ব্যয় বাদ দিয়েও আমরা ভালো মুনাফা পাচ্ছি। সে আরো জানায়, অনেক ক্ষেত্রে পাইকাররা সরাসরি মাঠ থেকেই মরিচ কিনে নেওয়ায় পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ঝামেলাও কমেছে।
বর্তমানে নাটুয়ারপাড়া, সোনামুখী, মাইজবাড়ী, ওমরপুর ও শুভগাছাসহ বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মরিচ কেনাবেচা হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এসব মরিচ ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া চর এলাকার কৃষক মো. আব্দুল হাকিম বলেন, এ বছর দুই বিঘা জমিতে যমুনা ও সুপার সনিক জাতের মরিচ চাষ করেছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন খুব ভালো হয়েছে। প্রতিদিন মরিচ বিক্রি করছি এবং ভালো দামও পাচ্ছি। এতে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কিছু টাকাও আমাদের সঞ্চয় হচ্ছে।
অপরদিকে একই এলাকার কৃষাণী রহিমা খাতুন বলে, আমরা গরিব মানুষ। আর্থিক কষ্ট আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমি আমার স্বামীর সাথে মরিচের জমিতে কাজ করি। এবার মরিচের ভালো ফলন ও বাজারদরের কারণে প্রতিদিন নগদ আয় হচ্ছে। ফলে বর্তমানে সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ অনেক সহজ হয়েছে।
এলাকার কৃষকরা জানায়, বারোমাসি মরিচের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বছরের অধিকাংশ সময়ই ক্ষেত থেকে মরিচ সংগ্রহ করা যায়। ফলে এককালীন ফসলের তুলনায় ঝুঁকি কম এবং দীর্ঘ সময় ধরে আয় নিশ্চিত হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এটি লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, যমুনা নদীর চরাঞ্চলের বেলে-দোআঁশ মাটি মরিচ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পাশাপাশি চলতি মৌসুমে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় গাছের বৃদ্ধি ও ফলন দুটোই ভালো হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে তারা ভালো ফলন পাচ্ছেন। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি বাজারমূল্যও কৃষকের পক্ষে রয়েছে।
সরকারি সহায়তা, উন্নত বীজের সহজলভ্যতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা গেলে সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম মরিচ উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হবে বলে এলাকার সচেতন মহল মনে করেন।
পিডিএস/এমএইউ









































