মো. সাইদুর রহমান
দৃষ্টিপাত
পল্লবীর নূর জাহান বেগম এবং আমাদের সভ্যতার ময়নাতদন্ত

ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের সমাজব্যবস্থায় যৌথ পরিবার এবং পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধকে একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। তবে নানা কারণে এই পারিবারিক কাঠামোয় বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে পঁচাত্তর বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের পচা-গলা এবং পোকায় ধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি আমাদের সমাজকে এক চরম নৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একই ফ্ল্যাটের পাশের রুমে মেয়ে বসবাস করলেও মায়ের মৃত্যুর খবর রাখেনি, এমনকি তার সন্তানরাও যাদের একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের অধ্যাপক এবং আরেকজন কানাডা প্রবাসী। দীর্ঘদিন ধরে তারা মায়ের কোনো খোঁজখবর নেননি। এই ধরনের চরম অবহেলা কেবল একটি নৈতিক অবক্ষয়ই না বরং এটি দেশের প্রচলিত আইনেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রবীণদের এই আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রণীত হয়েছিল ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’। এই আইনের ২(খ) ধারায় ‘ভরণ-পোষণ’ শব্দটিকে বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এখানে ভরণপোষণ বলতে কেবল অন্ন, বস্ত্র এবং বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদাই নয়, বরং নিয়মিত চিকিৎসা সেবা, পরিচর্যা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ‘সঙ্গ প্রদান’ বা মানসিক সাহচর্যকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ।
এই আইনের ধারা ৩(১) ও ৩(২) অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে যৌথভাবে এটি নিশ্চিত করতে হবে। ধারা ৩(৩) ও ৩(৪) পিতামাতার সাথে একই স্থানে সহ-বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। পিতামাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা আলাদা স্থানে বসবাস করতে বাধ্য করা যাবে না। রাখলে এটি একটি মূল অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা বা তিন মাসের কারাদণ্ড প্রযোজ্য হবে। ধারা ৩(৫) ও ৩(৬) অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিতে হবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা ও পরিচর্যা করতে হবে এবং আলাদা বসবাসের ক্ষেত্রে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতে হবে। ধারা ৩(৭) পিতামাতা আলাদা বসবাস করলে প্রত্যেক সন্তানকে তার দৈনিক, মাসিক বা বাৎসরিক আয়ের একটি যুক্তিসঙ্গত অংশ পিতামাতাকে নিয়মিত প্রদান করতে হবে। ধারা ৪ অনুযায়ী পিতার অবর্তমানে দাদা-দাদীকে এবং মাতার অবর্তমানে নানা-নানীকে ভরণপোষণ প্রদান করতে সন্তান বাধ্য থাকবে। এই বিধানগুলো (ধারা ৩ ও ৪) লঙ্ঘন হলে ধারা ৫(১) অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা অর্থদণ্ড এবং অর্থদণ্ড অনাদায়ে অনূর্ধ্ব ৩ (তিন) মাসের কারাদণ্ড হতে পারে। ধারা ৫(২) অনুযায়ী সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, পুত্র-কন্যা বা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় যদি ভরণপোষণ প্রদানে বাধা সৃষ্টি বা অসহযোগিতা করেন, তবে তারাও অপরাধে সহায়তাকারী হিসেবে দণ্ডিত হবেন। এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধসমূহ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য হিসেবে গণ্য হয়। তবে ধারা ৭(২) অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পিতামাতার ‘লিখিত অভিযোগ’ ব্যতীত কোনো আদালত এই অপরাধ বিচারের জন্য আমলে নিতে পারেন না এবং যদি কোনো সন্তান পিতামাতাকে ভরণপোষণ দেওয়া অস্বীকার করে বা অবহেলা করে, তবে সেই বঞ্চনা বা অধিকার অস্বীকারের দিন থেকে ১২ বছরের মধ্যে দেওয়ানি বা পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। তবে ?২০১৩ সালে আইনটি প্রণীত হলেও প্রায় এক দশক ধরে এর মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ সীমিত ছিল। এই প্রশাসনিক ও আইনি স্থবিরতা দূর করতে ২০২৩ সালে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ বিধিমালা, ২০২৩’ প্রণয়ন করা হয়।
পল্লবীর হৃদয়বিদারক ঘটনাটি আমাদের সমাজতাত্ত্বিক চিন্তার একটি বড় অসঙ্গতি দূর করে দেয়। সাধারণত ধারণা আছে যে কেবল অর্থনৈতিক অনটন বা দারিদ্র্যের কারণে প্রবীণরা অবহেলার শিকার হন। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত ও সুশিক্ষিত মহলে পিতামাতাকে একা ফেলে রাখার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই শ্রেণির সন্তানেরা আর্থিকভাবে অত্যন্ত স্বাবলম্বী এবং পিতামাতাকে টাকা-পয়সা বা ওষুধ কিনে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন, তবুও তারা বাবা-মায়ের খোঁজ নেন না বা যত্ন করেন না। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা মনে করেন যে প্রতি মাসে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দেওয়া কিংবা ঘরে একজন নার্স বা সাহায্যকারী রেখে দেওয়াই তাদের দায়িত্বের শেষ। তারা ভরণপোষণের আইনি ও মানবিক সংজ্ঞার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘সঙ্গ প্রদান’ সম্পূর্ণ এড়িয়ে যান। পুঁজিবাদী মানসিকতা এবং ক্যারিয়ারের পেছনে অন্ধ দৌড় মানুষকে এতটাই যান্ত্রিক করে তোলে যে তারা বাবা-মায়ের প্রতি মানবিক টান হারিয়ে ফেলে। ?পল্লবির ঘটনায় যেমনটি দেখা গেছে, তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানোর আগে আশপাশের কেউ জানতেই পারেনি যে পাশে একজন মা মারা গেছেন। এই নিঃসঙ্গতা এবং আড়ালে থাকা অবহেলা ধনী সমাজে মানসিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে পিতামাতাকে অবহেলা করেও সন্তানেরা সামাজিক মর্যাদার আড়ালে নিজেদের আড়াল করে রাখতে পারেন।
এদিকে আইনের এই কঠোরতা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে এর ব্যবহার তেমন দেখা যায় না। পিতামাতারা এই আইন ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করেন, কেন করেন তা বিশ্লেষণ করলে কতগুলো সুস্পষ্ট বাস্তবতা উঠে আসে। যেমন, ?বাঙালি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো পারিবারিক বন্ধন ও সন্তানের মঙ্গল কামনা। কোনো পিতামাতাই চান না যে তাদের সন্তানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করুক বা সমাজের চোখে তারা অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হোক। সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে মামলা দায়ের করাকে পিতামাতারা নিজেদেরই জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এবং সামাজিক লজ্জা মনে করেন। ‘লোকে কী বলবে’ এই চিন্তায় তারা নীরবে অবহেলা সহ্য করে মৃত্যুবরণ করেন, তবু আইনের আশ্রয় নেন না। তারপর, ??এই আইনের ৭(২) ধারার বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, ভুক্তভোগী পিতামাতার নিজস্ব ‘লিখিত অভিযোগ’ ছাড়া আদালত মামলা গ্রহণ করতে পারে না। যে প্রবীণ মা বা বাবা শয্যাশায়ী, অবহেলার শিকার এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, তার পক্ষে নিজে উদ্যোগী হয়ে আদালতে গিয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা অত্যন্ত দুরূহ ও অবাস্তবসম্মত। এদিকে, ?যদিও আইন অনুযায়ী পুত্র ও কন্যা উভয়ই ভরণপোষণ দিতে সমানভাবে বাধ্য, তবে আমাদের দেশের প্রচলিত সামাজিক কাঠামোতে অধিকাংশ বিবাহিত কন্যাসন্তানরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা আর্থিক স্বাবলম্বিতা না থাকার কারণে তারা স্বামীর পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। যার কারণে তারা ভরনপোষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হন। পিতামাতারাও সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে বিবাহিত মেয়ের সংসারে গিয়ে বোঝা হতে চান না, যার ফলে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়।
??পিতামাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে শুধুমাত্র এই আইন ব্যবহারই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী আইনি সংস্কার এবং সামাজিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন। যেমন, ?আইনের ৭(২) ধারাটি সংশোধন করা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে কেবল পিতামাতা নিজে নন, বরং সমাজের যেকোনো সচেতন নাগরিক, নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী বা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ভুক্তভোগী পিতামাতার পক্ষে আদালতে সরাসরি অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে পারেন। এটি প্রবীণদের আইনি জটিলতা ও মানসিক সংকোচ থেকে মুক্তি দেবে। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তি সেল গঠন করে অত্যন্ত ঘরোয়া ও সম্মানজনক পরিবেশে পিতা-মাতা এবং সন্তানের মধ্যকার দূরত্ব দূর করার চেষ্টা করতে হবে। এটি মামলা-মোকদ্দমার ভীতি ছাড়াই পিতামাতার অধিকার ফিরিয়ে দেবে। তারপর ?উচ্চবিত্ত ও চাকরিজীবী সন্তানদের ক্ষেত্রে তাদের মাসিক বেতন বা আয়ের উৎস থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি কেটে পিতামাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের আইনি বাধ্যবাধকতা প্রশাসনিকভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। পল্লবীর ঘটনার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যেভাবে অভিযুক্ত যুগ্ম সচিব সন্তানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা সকল স্তরের চাকরিজীবীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের তদারকি কমিটিগুলোকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে নিয়মিত প্রবীণদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেখানে সহ-বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে, সেখানে প্রবীণদের জন্য সম্মানজনক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ডে-কেয়ার সেন্টার বা প্রবীণ নিবাসের ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে, যা পিতামাতার ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত হবে। ?আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন এবং পিতামাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের গুরুত্ব পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। ?তবে আইন প্রণয়ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও, সেই আইনকে মানবিক রূপ দেওয়া আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও পারিবারিক কর্তব্যের অংশ। একটি সভ্য সমাজের পরিচয় মেলে সেখানে প্রবীণরা কতটা শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে শেষ জীবন কাটাচ্ছেন তার ওপর। পল্লবীর ঘটনাটি আমাদের জন্য শেষ সতর্কবার্তা।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
"






































