বেড়া-সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি

  ১৩ ঘণ্টা আগে

পাবনার সাঁথিয়া

প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণচেষ্টা, সালিশে রায় ২০ ঘা জুতার বাড়ি

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় এক বুদ্ধি ও বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে এই গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান ও সদস্যদের উপস্থিতিতে গ্রাম্য সালিশে ২০ ঘা জুতার বাড়ি দিয়ে দফার চেষ্টা করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর এলাকায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার দুপুর ২টার দিকে উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত মহব্বত আলী খাঁ (৪৫) ওই গ্রামের মৃত তায়জাল খাঁর ছেলে।

ঘটনার দিন ওই প্রতিবন্ধীকে বাড়িতে একা রেখে তার মা পাশে তার ছেলের বাড়িতে যান। এই সুযোগে মহব্বত আলী ঘরে ঢুকে ওই নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় প্রতিবন্ধী নারীর গোঙানি ও চিৎকার শুনে তার মা ও প্রতিবেশীরা ছুটে এলে মহব্বত আলী পালিয়ে যান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনাটি পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল চার দিন ধরে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। সর্বশেষ গত রবিবার সন্ধ্যায় হারিয়াকাহন এলাকার ইউপি সদস্য মালেকের বাড়ির উঠানে এক সালিশের আয়োজন করা হয়।

অভিযোগ উঠেছে, গৌরীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব, ইউপি সদস্য মিল্টন, আরশেদ আলী ও মালেকসহ স্থানীয় মাতব্বরেরা এই সালিশের নেতৃত্ব দেন। সালিশে অপরাধ স্বীকার করায় অভিযুক্তকে শারীরিক শাস্তি হিসেবে ‘২০টি জুতার বাড়ি’ দেওয়ার রায় দেওয়া হয়। সেখানেই এই প্রহসনের বিচারকার্য সম্পন্ন করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধকে জুতার বাড়ি দিয়ে মীমাংসা করা দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর শামিল। ভুক্তভোগী পরিবারটি সরল ও আইন সম্পর্কে কম বোঝায় জনপ্রতিনিধিরা সালিশের নামে এ নাটক করেছেন। এ ঘটনায় সালিশকারীদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত।

ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী নারীর দুলাভাই বলেন, মহব্বত এর আগেও দুই জায়গায় একই অপরাধ করেছে। আমার শ্যালিকার ঘটনায় শনিবার সালিশ বসার কথা থাকলেও আসামি আসেনি। রবিবার সালিশের শুরুতে আসামিকে ৭টি জুতার বাড়ি ও জুতার মালা পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে টাকা খেয়ে ম্যানেজ হওয়া কয়েকজন মাতব্বরের কথায় শুধু ২০টি জুতার বাড়িতে দফা করা হয়। এতে আসামির মামাশ্বশুর নাসির খাঁও জড়িত।

তিনি আরো বলেন, এক অসহায় প্রতিবন্ধীর ইজ্জতহানির বিচার কি শুধু ২০টি জুতার বাড়ি? আমি এই অন্যায় রায় না মেনে সালিশ থেকে চলে এসেছি। আমাদের থানায় যেতে এখনো বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা কোনো টাকা-পয়সা চাই না, অন্যায়ের সঠিক বিচার চাই। সবার সঙ্গে আলোচনা করে আমরা আইনের দ্বারস্থ হব।

ইউপি সদস্য আরশেদ আলী বলেন, আমি এই আইনটি জানি না। ওটা আমার ওয়ার্ডও না। চেয়ারম্যান ডেকেছিলেন, তাই গিয়েছিলাম। চেয়ারম্যান সবকিছু ভালো জানেন।

গৌরীগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল ওহাব বলেন, ওই ছেলে অপরাধ স্বীকার করেছে। এই অপরাধ সালিশে বিচার করার আইন যে নেই, তা আমি জানি। কিন্তু দুই পক্ষ বসে সমাধান করতে চেয়েছিল বলেই সালিশটি করা হয়েছে।

সাঁথিয়া থানার ওসি বলেন, বিষয়টি জানার পর ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছেন। অভিযোগ পেলেই দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিজু তামান্না বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের বিচার কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিশে করার সুযোগ নেই। আইন অমান্য করে চেয়ারম্যান ও অন্যরা কেন এটি করলেন, তা জানতে চেয়ারম্যানকে ডাকা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরো বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে তার নজরে এসেছে। এরপরই তিনি ওসিকে খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়