মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

  ১ ঘণ্টা আগে

চলনবিলে চায়না দুয়ারি জালে বিপন্ন দেশি মাছ

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

চলনবিল অঞ্চল একসময় দেশের সর্ববৃহৎ মিঠাপানির মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে সুপরিচিত ছিল। তবে প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট এবং নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এখন চরম হুমকির মুখে। অথচ একসময় চলনবিলের জলাশয়গুলো ছিল কই, শিং, মাগুর, পাবদা, আইড়, বোয়াল, চিতল, ফলুই, বাচাসহ প্রায় ১৫১ প্রজাতির দেশি মাছের নিরাপদ আবাসভূমি।

বর্ষার নতুন পানিতে চলনবিল যখন অথৈ জলরাশিতে রূপ নেয়, তখন দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বিলের বুক। কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ উপহার আজ এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি। চলনবিলের বুক চিরে একশ্রেণির অসাধু মৎস্য শিকারির পেতে রাখা ক্ষতিকর ‘রিং জাল’ বা ‘চায়না দুয়ারি’ জালের মরণফাঁদ দিন দিন বিপন্ন করে তুলছে আমাদের জলজ পরিবেশকে।

কারেন্ট জালের চেয়েও মারাত্মক ‘রিং জাল’

চলনবিল অঞ্চলের মৎস্য সম্পদের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারেন্ট জালের চেয়েও সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর এই রিং জাল। আষাঢ়-শ্রাবণের নতুন পানিতে যখন ডিমওয়ালা মা মাছগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে বেড়ায়, ঠিক তখনই তাড়াশসহ চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে পেতে রাখা হয় সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত এই জাল। অত্যন্ত ঘন ও ক্ষুদ্র ফাঁসের এই জালের গঠন এমন যে, একবার কোনো জলজ প্রাণী এর ভেতরে প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না। ফলে রেণু পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ থেকে শুরু করে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছগুলো নির্বিচারে ধরা পড়ছে। এমনকি মাছের খাদ্য হিসেবে পরিচিত জলজ কীটপতঙ্গ এবং ছোট শামুক-ঝিনুকও এই জালের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

খাদ্যশৃঙ্খল ও জীবিকায় চরম আঘাত

এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব শুধু মাছের বংশনাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা আঘাত হানছে চলনবিলের সামগ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে। ছোট মাছ ও জলজ প্রাণীর তীব্র সংকটে পড়ে খাদ্যহীনতায় ভুগছে চলনবিলে আসা অতিথি পাখিসহ স্থানীয় বক, পানকৌড়ি ও চিল। অন্যদিকে, মাছের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়—যারা বংশপরম্পরায় এই বিলের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন—তাদের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

প্রয়োজন কঠোর আইন ও সামাজিক সচেতনতা

প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং নিষিদ্ধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলার মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বিশাল চলনবিল অঞ্চলের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। হাট-বাজারগুলোতে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে এই নিষিদ্ধ জাল, যা প্রশাসনের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেবল সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।

পরিবেশবাদী লেখক ও শিক্ষাবিদ সনাতন দাশ বলেন, "চলনবিলের এই অমূল্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এখনই সমন্বিত এবং কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, রিং জাল ও চায়না দুয়ারির মতো ক্ষতিকর জালের উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি বিল পাড়ের সাধারণ জেলে ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।"

প্রশাসনের আশার বাণী

তাড়াশ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দীন জানান, "নিষিদ্ধ রিং জাল ও চায়না দুয়ারি জাল দেশের মৎস্য সম্পদের জন্য এক বড় অভিশাপ। নতুন পানি আসার পর থেকেই চলনবিলে দেশীয় প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধির মোক্ষম সময়। এই সময়ে একশ্রেণির অসাধু জেলে আইন অমান্য করে রিং জাল ব্যবহার করছেন। আমরা ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে তদারকি শুরু করেছি। মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।"

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, "চলনবিলের মৎস্য ঐতিহ্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। নিষিদ্ধ রিং জাল দিয়ে মা ও পোনা মাছ ধ্বংস করা দণ্ডনীয় অপরাধ। আমরা খুব দ্রুতই চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে এবং হাট-বাজারগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করব। যারা এই অবৈধ জাল তৈরি, বিক্রি বা মাছ শিকারে ব্যবহার করছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।"

পিডিএস/পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়