সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি

  ২ ঘণ্টা আগে

হারিয়ে যাচ্ছে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ছাতা মেরামতের পেশা

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

একসময় বর্ষা মৌসুম এলেই শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই শোনা যেত ছাতা মেরামতকারীদের চিরচেনা হাঁকডাক। ভাঙা শিক, ছেঁড়া কাপড়, নষ্ট স্প্রিং কিংবা হাতল বদলে অত্যন্ত অল্প খরচে পুরোনো ছাতাকে নতুনের মতো সচল করে তুলতেন এই কারিগরেরা। তবে সময়ের পরিবর্তনে শতবর্ষের এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি আজ বিলুপ্তির পথে। নতুন ছাতার সহজলভ্যতা, কম আয় এবং অনিয়মিত কাজের কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে ছাতা মেরামতের কারিগরেরা।

জীবিকা সংকটে কারিগরেরা

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার তাজুরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কোবাদ আলী দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ছাতা মেরামতের কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে আঁকড়ে রাখা এই পেশাই ছিল তাঁর পরিবারের প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু বর্তমান বাজারে সেই পেশায় আর আগের মতো আয় নেই।

কাজের ফাঁকে আক্ষেপ করে কোবাদ আলী বলেন, "আগে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আয় হতো। বর্ষার তিন মাস ভালোভাবে কাজ করতে পারলে বাকি সারা বছরের সংসার খরচ উঠে যেত। আর এখন দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল বৃষ্টি হলে একটু কাজ পাওয়া যায়।"

কমছে কদর

কাজিপুরের সোনামুখী গ্রামের শিক্ষক সোহরাব হোসেন তাঁর স্মৃতিচারণ করে বলেন, "আগে বর্ষার দিনে গ্রামে গ্রামে ছাতা মেরামতকারীদের হাঁকডাকে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। এখন বাজারে কম দামে নানা ধরনের নতুন দেশি-বিদেশি ছাতা সহজেই পাওয়া যায়। ফলে মানুষ আর পুরোনো ছাতা মেরামত করতে চান না, বরং নতুন ছাতা কিনতেই বেশি আগ্রহী।"

রন্ধ্রে রন্ধ্রে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় ছাতার গঠনেও এসেছে পরিবর্তন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির অনেক ছাতা সহজে মেরামত করা যায় না। ফলে এই পেশার চাহিদা দ্রুত কমছে। একই সঙ্গে আয়ের অনিশ্চয়তা ও অনিয়মিত কাজের কারণে নতুন প্রজন্মও আর এই পেশায় আসতে চাইছে না।

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার আকুতি

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান খান বলেন, "ছাতা মেরামতের মতো ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলোকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু কিছু মানুষের জীবিকা রক্ষা করা নয়; বরং আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, দক্ষ কারিগরি এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা।"

কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যেতে বসা এই লোকজ পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, সামাজিক সহায়তা এবং প্রান্তিক কারিগরদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তা না হলে হয়তো অচিরেই এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়