কাজী তারিক আহম্মদ
বিশ্ব খাদ্য দিবস
চাই শক্তিশালী খাদ্য ব্যবস্থাপনা

মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মধ্যে খাদ্য প্রথম; কিন্তু বিশ্বে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ১০ জন মানুষ অনাহারে ভুগছেন। পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে রয়েছেন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ ৮২ কোটি ৮ লাখ মানুষ। এ সংখ্যা প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন বেড়ে চলেছে অনাহারের মাত্রা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
খাদ্যের জোগানের একমাত্র মাধ্যম কৃষি। গত কয়েক দশকে পৃথিবীর আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাষযোগ্য জমি সংরক্ষণ, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বনায়ন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো, বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ব্যস্ত হয়ে আছে বিশ্বের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।
কৃষিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্যের জোগান, দরিদ্র ও পুষ্টিহীনতা দূর করে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জন্ম নেয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। লাতিন ভাষায় এর স্লোগান ‘ফিয়াত পানিস’- ‘সবার জন্য রুটি’। বর্তমানে ১৯৭টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে পরিচালিত এফএওর মূল সদস্য সংগঠন ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থা গঠনের ধারণাটি সর্বপ্রথম দেন মার্কিন কৃষিবিদ ডেভিড লুবিন। ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর কানাডার কুইবেক শহরে ‘আন্তর্জাতিক কৃষি ইনস্টিটিউট’ গঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আনুষ্ঠানিকভাবে এ সংগঠনের ইতি ঘটে। পরে এটি খাদ্য ও কৃষি সংস্থা নামে আত্মপ্রকাশ করে। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের শেষ সময় থেকে এফএও জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্য থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
১৯৭৯ সালে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০তম সাধারণ সভায় হাঙ্গেরির তৎকালীন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. প্যাল রোমানি এফএওর জন্মদিনটি বিশ্বব্যাপী উদযাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৮১ সাল থেকে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিষ্ঠার দিনটি (১৬ অক্টোবর, ১৯৪৫) দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিবৃত্তির লক্ষ্যে এবং বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।
আর ১৯৮১ সালেই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিটি দেশের সরকার ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে জড়িত করার প্রতিপাদ্য নিয়ে ‘বিশ্ব খাদ্য দিবস’ উদযাপন শুরু হয়। বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো- ক্ষুধা, অপুষ্টি ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলা, কৃষির উন্নতিতে মনোযোগ দেওয়া, কৃষিভিত্তিক উৎপাদনে উৎসাহ দান করা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা গ্রহণে উৎসাহ প্রদান। গ্রামীণ জনগণ, মূলত নারী ও পিছিয়ে পড়া মানুষের অবদানে উৎসাহদান ও প্রযুক্তির সমৃদ্ধিকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাটি বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে আধুনিক ও উন্নত কৃষি, প্রাণী, বনায়ন ও মৎস্য চাষে সহায়তার মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। তাই বিভিন্ন দেশে কৃষি ও খাদ্যের সঙ্গে জড়িত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এফএও বিশ্বের বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে মিলে একসঙ্গে নানা প্রকল্প হাতে নিয়ে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, যেন সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তার সুযোগ তৈরি হয়।
সংস্থাটির নিরলস প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী যে সাফল্যগুলো অর্জিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- ৩০টিরও বেশি দেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় জনগণের জন্য খাদ্য লাভের অধিকারকে প্রধান মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি ও নিশ্চিতকরণ, সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস তৈরি, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছধরা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়ন, গবাদি পশুর প্লাগ নির্মূলকরণ, লাতিন আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা, খাদ্য ও কৃষিতে বিশ্বের বৃহত্তম এবং সর্বাধিক বিস্তৃত পরিসংখ্যানীয় ডেটাবেইস বজায় রাখা ইত্যাদি।
২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ফলপ্রসূ সহযোগিতা করে যাচ্ছে। পৃথিবী জুড়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিংসহ সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি।
চলমান প্রতিকূলতার মাঝে ২০২০ সালে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়ার লড়াইয়ে ভূমিকা রাখায় শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। ‘বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি’ জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা-সংক্রান্ত এক শাখা, যা যারা নিজেদের ও পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার উৎপাদন কিংবা আহরণ করতে সক্ষম নয়, তাদের সহায়তা করে। বিশ্বব্যাপী কোভিড মহামারির কারণে পুষ্টিকর খাদ্যের আবশ্যকতা ভিন্নভাবে উপলব্ধি হচ্ছে।
কৃষিকাজে নারীর গুরুত্ব তুলে ধরে কৃষিতে নারীরা যদি পুরুষের সমানভাবে অংশ নেন, তাহলে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ১৫ কোটি পর্যন্ত কমতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা দূর করে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করে কৃষিতে টেকসই উন্নয়নের জন্য এফএওর সুপারিশক্রমে প্রণীত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার’ আটটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বিশ্বের সব দেশকে একে অন্যকে সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে কাজ করে যেতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা সবার ক্ষুধা দূর করা, অপুষ্টির শিকার পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু, অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে, গর্ভবতী ও বুকের দুধদানকারী নারী এবং বয়স্ক ব্যক্তিসহ সব মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ, কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় দ্বিগুণ করা, টেকসই কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কৃষি উৎপাদনে পরিবেশের ভারসাম্য নিশ্চিত করে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিকূল আবহাওয়া, বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতে ফসল টিকে থাকতে পারে, তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষিভিত্তিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করা, বিশ্ব কৃষি বাজারের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কৃষিপণ্য আমদানি-রপ্তানিতে অহেতুক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়গুলো এড়িয়ে চলা এবং বিশ্ব খাদ্যপণ্যের বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বিশ্ব খাদ্য দিবস পালন যথার্থতা লাভ করবে।
সাম্প্রতিক দশকগুলো বিশ্বব্যাপী কৃষি ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। যদিও চাহিদার দিক বিবেচনা করলে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন যথেষ্ট, তবুও সার্বিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় রয়ে গেছে অসমাঞ্জস্য। খাদ্যব্যবস্থার সমস্যাগুলোর মধ্যে আছে ক্ষুধা, অস্বাভাবিক স্থূলতা, পরিবেশগত অবক্ষয়, জৈবিক বৈচিত্র্য হ্রাস, খাদ্য ও বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘র্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট অব ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটি ইন দ্য কনটেক্স অব কোভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিগত ৪০ বছরে কৃষিক্ষেত্রে ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বিশেষত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাদযোগ্য জমি হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ার চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছে, পেরেছে শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস উৎপাদনে ব্যাপক সফলতা।
বাংলাদেশের এ অর্জন অন্য সদস্যদেশগুলোর জন্য উদাহরণ। বাংলাদেশের সংবিধানে খাদ্য ও পর্যাপ্ত পুষ্টিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাই অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, জাতীয় কৃষি নীতি-২০১৮ ও তার কর্মপরিকল্পনা, জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতি ২০২০-তে দেশের খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরের জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
"



































