জুবাইয়া বিন্তে কবির
৪৭তম বিসিএসের বার্তা : সংখ্যায় নয় সংকট দক্ষ মানবসম্পদের

৪৭তম বিসিএসের ফলাফল বাংলাদেশের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় জনবল পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রায় পৌনে চার লাখ আবেদনকারীর মধ্যেও দুই হাজারের বেশি ক্যাডার পদ শূন্য থেকে যাওয়া কেবল একটি নিয়োগ-পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থার শক্তি ও সীমাবদ্ধতার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে যোগ্য প্রার্থীর সংকট উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যকে সামনে এনেছে। এই বাস্তবতায় বিষয়টি শুধু সরকারি কর্ম কমিশনের নয়; বরং সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক, গবেষণা সংস্থা এবং সমাজের সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও দক্ষ রাষ্ট্রীয় জনবল গঠনের স্বার্থে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
বিসিএসের ইতিহাসে বিরল এক বাস্তবতা : ৪৭তম বিসিএসে মোট ক্যাডার পদ ছিল ৩ হাজার ৬৬৩টি। কিন্তু চূড়ান্তভাবে সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র প্রায় ১ হাজার ৩২০ জন। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পদই পূরণ করা যায়নি। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং রাষ্ট্রীয় জনবল পরিকল্পনার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা। কারণ শূন্য থেকে যাওয়া এসব পদের বড় অংশই এমন খাতে, যেখানে দেশের উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য, কৃষি, গবেষণা, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
আবেদনকারী বেশি মানেই যোগ্য প্রার্থী বেশি নয় : অনেকেই মনে করেন, কয়েক লাখ আবেদনকারী থাকলে সব পদ সহজেই পূরণ হওয়ার কথা। বাস্তবতা ভিন্ন। বিসিএসে আবেদন করার ন্যূনতম যোগ্যতা থাকলেই কেউ যোগ্য প্রার্থী হয়ে যান না। আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ প্রস্তুতিহীন অবস্থায় পরীক্ষা দেন। অনেকেই কেবল অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আবেদন করেন। আবার অনেকেই শুধু ভাগ্য পরীক্ষা করতে অংশ নেন। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো প্রস্তুতিপ্রাপ্ত প্রার্থীর সংখ্যা আবেদনকারীর তুলনায় অনেক কম।
সবচেয়ে বড় সংকট কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে : পিএসসির তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে টেকনিক্যাল ও প্রফেশনাল ক্যাডারে। কারণ এসব পদে শুধু বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই হয় না; নির্দিষ্ট বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি, পেশাগত দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় একাডেমিক মানও থাকতে হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী সাধারণ বিষয়ে স্নাতক হলেও কৃষি, পরিসংখ্যান, গণিত, গবেষণা, প্রকৌশল, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, খাদ্য প্রযুক্তি কিংবা বিশেষায়িত বিষয়ে তুলনামূলক কম শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ফলে এসব ক্যাডারে স্বাভাবিকভাবেই যোগ্য প্রার্থীর সংকট তৈরি হয়।
উচ্চশিক্ষা বাড়ছে, দক্ষতা বাড়ছে না : বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, স্নাতকের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু শিল্পখাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কারিগরি সেবার চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে দক্ষ জনবল তৈরি করা যায়নি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো গবেষণাগার সীমিত, ব্যবহারিক শিক্ষা দুর্বল, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ফলে ডিগ্রি অর্জিত হলেও দক্ষতা অর্জিত হচ্ছে না।
মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব : বিসিএসের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং ব্যক্তিত্ব মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফল করলেও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণধর্মী দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেন না। এ কারণেই প্রিলিমিনারি থেকে লিখিত এবং লিখিত থেকে মৌখিক- প্রতিটি ধাপে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী বাদ পড়ে যান।
সাধারণ ক্যাডারের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক, অবহেলিত বিশেষায়িত ক্যাডার : বাংলাদেশে বিসিএস মানেই অধিকাংশ চাকরিপ্রার্থীর কাছে প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, কর বা কাস্টমস ক্যাডার। সমাজে মর্যাদা, পদোন্নতির সুযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা এবং দৃশ্যমান প্রভাবের কারণে সাধারণ ক্যাডারের প্রতি আগ্রহ দীর্ঘদিন ধরেই বেশি। বিপরীতে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, খাদ্য, পরিসংখ্যান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কিংবা অন্যান্য পেশাগত ক্যাডারকে অনেকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বিবেচনা করেন না। ফলে যারা এসব বিষয়ে পড়াশোনা করেন, তাদেরও একটি অংশ বেসরকারি খাত, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার গড়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে রাষ্ট্রের বিশেষায়িত ক্যাডারগুলোতে দক্ষ জনবল সংকট আরো তীব্র হয়।
মেধা পাচারও বড় একটি কারণ : বাংলাদেশের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য চলে যান। অনেকে আর দেশে ফিরে আসেন না। আবার প্রকৌশলী, চিকিৎসক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, কৃষিবিজ্ঞানী কিংবা গবেষকদের একটি বড় অংশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা অথবা বেসরকারি খাতে তুলনামূলক বেশি সুযোগ-সুবিধা পান। ফলে সরকারি কারিগরি ক্যাডারের জন্য সম্ভাবনাময় একটি অংশ প্রতিযোগিতা থেকেই বাইরে থেকে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রীয় জনশক্তি পরিকল্পনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
পরীক্ষা পদ্ধতির কঠোরতা নাকি যোগ্যতার প্রকৃত মূল্যায়ন? প্রতি হাজার আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র চারজনের সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া বিসিএস পরীক্ষার কঠোরতা ও প্রতিযোগিতার মাত্রাকেই নির্দেশ করে। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক- তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়, যেখানে জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, ভাষা, ব্যক্তিত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পেশাগত যোগ্যতা একসঙ্গে মূল্যায়িত হয়। এই কঠোরতা রাষ্ট্রের জন্য যোগ্য কর্মকর্তা বাছাইয়ে সহায়ক হলেও একই সঙ্গে এটি শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে নিয়ে আসে। কারণ এত বিপুলসংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যেও যদি প্রয়োজনীয় মানসম্পন্ন প্রার্থী পাওয়া না যায়, তবে সমস্যাটি শুধু পরীক্ষায় নয়; বরং প্রস্তুতি ও দক্ষতা তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরির বাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব : বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির বাস্তব চাহিদার ব্যবধান এখনো স্পষ্ট। অনেক বিভাগে এমন বিষয় পড়ানো হয়, যার বাস্তব প্রয়োগ সীমিত। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, বায়োটেকনোলজি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু বিজ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা কিংবা আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষ জনবল এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায় : উন্নত দেশগুলোতে সরকারি নিয়োগব্যবস্থা শুধু পরীক্ষানির্ভর নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, ইন্টার্নশিপ এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদ তৈরি করা হয়। অনেক দেশে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সরাসরি সমন্বয় থাকে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সময়ই বাস্তব কর্মপরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ফলে নিয়োগের সময় যোগ্য প্রার্থীর সংকট তৈরি হয় না। বাংলাদেশেও শিক্ষা, গবেষণা ও সরকারি জনবল পরিকল্পনার মধ্যে এমন সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
মানবসম্পদ উন্নয়নের আয়নায় ৪৭তম বিসিএস : ৪৭তম বিসিএসের ফলাফল শুধু কয়েক হাজার চাকরিপ্রার্থীর সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। আবেদনকারীর সংখ্যা নয়, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ভর করে দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল জনবল তৈরির ওপর। তাই শিক্ষা, গবেষণা ও নিয়োগব্যবস্থাকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে, ৪৭তম বিসিএসের ফলাফল আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, একই সঙ্গে একটি সম্ভাবনারও দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই সংকটকে যদি শিক্ষা সংস্কার, গবেষণার প্রসার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র আরো যোগ্য, দক্ষ ও পেশাদার জনবল পাবে। সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিলে ভবিষ্যতের বিসিএসগুলোতে শুধু শূন্য পদই কমবে না, বরং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেশের সর্বোচ্চ যোগ্য ও মেধাবী তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। সেটিই হবে একটি আধুনিক, দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
"









































