মো. মমিনুল ইসলাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

  ৩০ জুন, ২০২৬

লাওচাপড়া বিনোদন কেন্দ্রে একদিন

শহরের ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক লেখাপড়ার চাপ থেকে স্বস্তি পেতে গ্রামের বাল্যকালের বন্ধুরা মিলে জামালপুরের বকশীগঞ্জে লাওচাপড়া বিনোদন কেন্দ্রে পাহাড় ভ্রমণের পরিকল্পনা করলাম। পরিকল্পনা মতো নির্ধারিত দিনে খুব সকালে যাত্রা শুরু করলাম। দুপুরে খাওয়ার জন্য গরুর মাংস দিয়ে খিচুরি ও ডিম ভাজি রান্না করে নিলাম। ভ্রমণ সঙ্গী হিসেবে আছে বাল্যবন্ধু রুহুল আমিন, হামিদুল, আজিজুর, আব্দুল কাইয়ুম,খালাতো ভাই ইমাম হাসান ও বড় ভাই বাবুল হোসেন।

গাড়ি চলছে আর আমরা বিভিন্ন বিষয়ে গল্পে মেতে উঠছি। শৈশবে একসঙ্গে খেলাধুলা করা, দলবদ্ধভাবে নদীতে গোসল করতে যাওয়া, স্কুলে গিয়ে দুষ্টামি করা, ঝড়ের দিনে আম কুড়ানো ইত্যাদি স্মৃতিচারণায় আমাদের যাত্রা প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল আমরা ক্ষণিকের জন্য সোনালি অতীতে ফিরে গিয়েছি। রাস্তা চলতে চলতে জামালপুরের কামালপুরে একটি নির্জন জায়গায় যাত্রা বিরতি দিলাম। বিরতির মাঝে সবাই মিলে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম আজকে আমরা কলার পাতায় মধ্যাহ্নভোজ করবো। তাই রাস্তার ধার থেকে কয়েকটি কলার পাতা নিলাম। গাড়ি আবার চলতে শুরু করল। সকাল নয়টার দিকে বিনোদন কেন্দ্রে প্রবেশের আগে সকালের নাশতার বিরতি দিলাম। গ্রামের বাজারে ছোট একটি খাবার হোটেল থেকে ডাল, পরোটা ও মিষ্টি দিয়ে ঝটপট নাশতা সেরে নিলাম। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই বিনোদন কেন্দ্রে পৌঁছে গেলাম।

পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়লো সবুজ পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। গেইট ফি দিয়ে আমরা বিনোদন কেন্দ্রে প্রবেশ করলাম। গেটের পাশে শুরুতেই ছোট ছোট কিছু দোকান দেখতে পেলাম। দোকানে রয়েছে হরেক রকমের খেলনা, খাবার এবং বাচ্চাদের খুব সুন্দর সুন্দর জামা। প্রচণ্ড রোদ তাই আমরা কয়েকজনে দোকান থেকে সানগ্লাস কিনলাম। সামনে অগ্রসর হতেই চোখে পড়ল একটু উঁচু টাওয়ার। দশ টাকার বিনিময়ে টাওয়ারে ওঠার টিকিট কিনলাম। টাওয়ারে উঠে চারপাশের বিস্তীর্ণ উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়, বনভূমি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক নজরে উপভোগ করলাম। সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হলাম। টাউয়ার থেকে স্মার্ট ফোন দিয়ে কিছু স্থির ছবি গ্রহণ করলাম। এরপর শুরু হলো পাহাড়ে ওঠার পালা।

প্রথমে কয়েকটি ছোট পাহাড়ে উঠলাম। পাহাড়ের ছোট ছোট অনেক কাঠবিড়ালির ছোটাছুটি এবং পাখির কিচিরমিচির শব্দ বেশ ভালো লাগল। কয়েকটি পাহাড় উঠতেই সবাই ক্লান্ত হয়ে গেলাম তাই পাহাড়ের চূড়ায় বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিশ্রাম নিতে নিতে ভাবলাম সবাই মিলে পাহাড়ে ওঠার প্রতিযোগিতা দেই, কে আগে চূড়ায় পৌঁছাতে পারে। সবাই আমার কথায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মতি দিল। উঁচু একটি পাহাড়ে ওঠার প্রতিযোগিতা শুরু করলাম। হাসি, আনন্দ আর বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। প্রতিযোগিতায় বন্ধু আজিজুর রহমান প্রথম হলো। কখন যেন দুপুর একটা বেজে গেল বুঝতেই পারলাম না। দুপুরের খাবার ও নামাজের বিরতি দিলাম। পাহাড়ের পাদদেশে লেকের পাশে ছোট একটি মসজিদে জামাতের সঙ্গে জোহরের নামাজ আদায় করলাম। নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর্ব। সবাই পাহাড়ের চূড়ায় বসে খাবার খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করল। তাই খাবার নিয়ে পাহাড়ে উঠলাম।

সমতল জায়গায় কলার পাতা বিছিয়ে খাবার পরিবেশন করলাম। খোলা আকাশের নিচে পাহাড়ের চূড়ায় সবুজ চত্বরে বসে কলাপাতায় খাবার খাওয়ার অনুভূতিটা ছিল সত্যিই ভীষণ আনন্দের। পাহাড়ের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আনন্দের মেলবন্ধনে এই দুপুরের খাবারের মুহূর্তটা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। খাবার শেষে ছোট একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। কেউ কবিতা আবৃত্তি করল, কেউ মজার গল্প শোনাল আবার কেউ এককভাবে প্রতিভা প্রদর্শন করতে লাগলো। প্রতিভা প্রদর্শনীতে সবচেয়ে ভালো অভিনয় করল খালাতো ভাই ইমাম হাসান, সে বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। সবশেষে বন্ধু রুহুল আমিন খালি গলায় সুললিত কণ্ঠে কয়েকটি ইসলামী সংগীত পরিবেশন করে শোনালো। আমরাও রুহুল আমিনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাওয়ার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘদিন পর সবাই মিলে এরকম প্রাণবন্ত সময় কাটাতে পেরে বেশ ভালো লাগল।

সাংস্কৃতিক পর্ব শেষে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গারোদের গ্রাম দেখতে বের হলাম। গারোদের গ্রামের ছোট ছোট বাড়ি, বাজারে হরেক রকমের খাবার ও হাতের তৈরি সৌখিন জিনিস দেখে খুবই ভালো লাগল। তাদের জীবন বৈচিত্র্য সম্পর্কে সামান্য অভিজ্ঞতা অর্জন হল। পরিশেষে পড়ন্ত বিকেলে ছোট ছোট কয়েকটি টাওয়ারে উঠে কিছু গ্রুপ ফটো নিলাম এবং লেকের ধারে বসে আইসক্রিমের আসর জমালাম। রুহুল আমিনের পক্ষ থেকে আইসক্রিমের আসরের আয়োজন করা হলো। এবার ফেরার পালা। ফেরার আগে সবার ব্যক্তিগত কেনাকাটার জন্য ত্রিশ মিনিট মিনিট সময় দেওয়া হল। আমি একটি ওয়ালেট, পাঁচমিশালী আচার কিনলাম এবং ভাতিজা ও ছাত্রীর জন্য কাঠে খোদাই করা নাম কিনলাম। আছরের নামাজ আদায় করে বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ফেরার পথে সন্ধ্যায় নদীর ধারে গ্রামের ছোট্ট একটি বাজারে চা-আড্ডার আয়োজন করলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পরস্পরে সারাদিনের স্মৃতি আনন্দ ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলাম। অবশেষে সন্ধ্যার পর আমাদের ভ্রমণের ইতি টানি এবং যার যার বাসায় চলে যাই। আনুষ্ঠানিকভাবে আজকের ভ্রমণ শেষ হলেও লাওচাপড়ার সবুজ পাহাড়, শৈশবের স্মৃতিচারণ, আইসক্রিমের আসর, চা আড্ডা এবং সারাদিনের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো চিরজীবন হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে এবং স্মৃতির পাতায় সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে। আজকের মতো এরকম আনন্দময় দিন জীবনে বার বার ফিরে আসুক এটাই প্রত্যাশা।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়