মো. মেহেরাব হোসেন রিফাত, বিএম কলেজ, বরিশাল

  ২৯ জুন, ২০২৬

১৩৭ বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য, সংকট ও সম্ভাবনার আলোয় দক্ষিণের উচ্চশিক্ষার বাতিঘর

ইতিহাস, ঐতিহ্য, আন্দোলন, সংগ্রাম, অর্জন, সংকট ও সম্ভাবনার ১৩৭ বছরে পদার্পণ করেছে বরিশাল তথা দক্ষিণ বাংলার উচ্চশিক্ষার বাতিঘর সরকারি ব্রজমোহন কলেজ। দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড নামে খ্যাত এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন ও সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল। আঠেরো শতকের শেষ দিকে যে বীজটি রোপণ করা হয়েছিল, আজ সেটি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। যার ছায়ায় প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ তাদের ভবিষ্যতের ভিত গড়ে নিচ্ছেন।

বরিশালের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বাবু রমেশচন্দ্র দত্তের অনুরোধে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুন সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষানুরাগী অশ্বিনীকুমার দত্ত তার পিতা ব্রজমোহন দত্তের নামে এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। সত্য, প্রেম ও পবিত্রতার মহান আদর্শকে ধারণ করে ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএম স্কুলের ক্যাম্পাসেই কলেজটির পথচলা শুরু হয়। অশ্বিনীকুমার দত্ত নিজে ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, স্বদেশী চেতনার প্রবক্তা এবং বরিশালের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তার হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠান তাই শুরু থেকেই শুধু পাঠ্যজ্ঞানের নয়, জাতীয় চেতনার এক আধার হয়ে উঠেছিল।

প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরে কলেজটি অশ্বিনী ভবনে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৮৯৮ সালে বিএম কলেজ ও বিএম স্কুলকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়। বিএম স্কুল নিজস্ব ভবনে চলে যায় এবং কলেজটি পূর্ণ স্বাধীনভাবে তার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। তৎকালীন সময়ে কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। সেই সময় কলেজের পাঠ্যক্রম, শিক্ষকমণ্ডলী এবং ফলাফলের মান এতটাই উঁচুতে ছিল যে শিক্ষাবিদ ও প্রশাসকরা একে দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড বলে অভিহিত করতেন। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি সারা দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য এই প্রতিষ্ঠানে ছুটে আসতেন।

এই কলেজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনেক কিংবদন্তির নাম। বাংলা সাহিত্যের নির্জনতার কবি জীবনানন্দ দাশ এই কলেজে অধ্যাপনা করেছেন, যা এই প্রতিষ্ঠানকে বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ করে তুলেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৬৫ সালের ১ জুলাই কলেজটি প্রাদেশিক সরকার কর্তৃক সরকারিকরণ করা হয়। এরপর ১৯৭২ সালের ১৮ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার এটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ হিসেবে ঘোষণা করে, যা প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা আরো উন্নীত করে। ১৯৮৯ সালের ১৪ জুন কলেজটি তার গৌরবময় শতবর্ষে পদার্পণ করে এবং ১৯৯২ সালের ২৫, ২৬ ও ২৭ অক্টোবর জাঁকজমকপূর্ণ শতবর্ষপূর্তি উৎসব আয়োজিত হয়।

বর্তমানে প্রায় ৬০ একর বিস্তৃত এই সবুজ ক্যাম্পাসটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। এখানে ৩০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী অনার্স, মাস্টার্স ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের ২২টি বিষয়ে স্নাতক ও মাস্টার্স পর্যায়ের পাঠদান চলছে। সহশিক্ষা কার্যক্রমে রয়েছে কেন্দ্রীয় ডিবেটিং ক্লাব, বিএনসিসি, বাঁধন, সন্ধানী, রোভার স্কাউট, উত্তরণসহ নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। প্রতি বছর এই কলেজের শিক্ষার্থীরা বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগ, এনটিআরসিএ, এসআই প্রাথমিক শিক্ষা এবং বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিযোগীতামূলক চাকরিতে মেধার স্বাক্ষর রাখছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক গুণগত মানের পরিচয় বহন করে। কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা অধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। কলেজের ডিবেটিং ক্লাবের বিতার্কিকরা জাতীয় ও টেলিভিশন বির্তকেও একাধিকবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে তাদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। এছাড়াও সকল সহশিক্ষা কার্যক্রমে কলেজের শিক্ষার্থীদের সাফল্য রয়েছে।

কিন্তু কলেজের আবাসিক সুবিধার চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। ছাত্রদের জন্য রয়েছে চারটি হল ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক (মুসলিম) হল, মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত (ডিগ্রি) হল, কবি জীবনানন্দ দাশ (হিন্দু) হল এবং সুরেন্দ্র ভবন। ছাত্রীদের জন্য আছে বনমালী গাঙ্গুলী মহিলা হোস্টেল, দেবেন্দ্র ভবন ছাত্রীনিবাস এবং নৃপেন্দ্র ভবন ছাত্রীনিবাস। কিন্তু এই হলগুলোর একটি বড় অংশের অবস্থা এখন এতটাই শোচনীয় যে সেগুলো বসবাসের প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম হল ও সুরেন্দ্র ভবনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বর্ষা মৌসুমে কক্ষের ছাদ থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ে, মেঝে তলিয়ে যায়, শৌচাগারের দুরবস্থা চরমে পৌঁছায়। দীর্ঘ বছর ধরে কোনো সংস্কার না হওয়ায় দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের চাহিদার তুলনায় হলের মোট আসন সংখ্যাও অপ্রতুল, ফলে বহু শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে বাইরে মেস ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে।

৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর পাঠের সহায়তায় কলেজে মাত্র একটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি রয়েছে, যেটিও শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের পরে খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লাইব্রেরিটিতে আধুনিক গবেষণার উপযোগী বই ও জার্নাল অপ্রতুল, নেই ডিজিটাল সুবিধা, নেই কোনো গবেষণাগার। উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য এই দীনতা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। এদিকে কবি জীবনানন্দ দাশের নামে কলেজে একটি কেন্টিন রয়েছে, তবে সেটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ পড়ে আছে। কর্তৃপক্ষ কুরবানির ঈদের পরে কেন্টিনটি চালু করার প্রতিশ্রতি দিলেও আজ অবধি তা কার্যকর হয়নি। বিশাল এই ক্যাম্পাসে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ মাত্র চারটি বাস যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।

শিক্ষক সংকট এই কলেজের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। অনেক বিভাগে প্রয়োজনীয় শিক্ষকের তুলনায় কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা অনেক কম। ফলে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, পাঠ্যক্রম সময়মতো শেষ করা যাচ্ছে না এবং শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় একাডেমিক গাইডেন্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শ্রেণিকক্ষের সংকটও কম নয় অনেক বিভাগে মাত্র একটি দুটি কক্ষ দিয়ে সকল বর্ষের ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে মাঝে মাঝে সেমিনার কক্ষে ক্লাস করতে হয়। ১৩৭ বছরের পুরোনো এই ক্যাম্পাসে কোনো আধুনিক বিজ্ঞানাগার নেই, ভাষাগবেষণা বা সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও অনুপস্থিত। এই ঘাটতি কলেজটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রজমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের মূল কণ্ঠস্বর। দীর্ঘদিন ধরে বাকসু নির্বাচন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই দাবিতে ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করেন। কর্তৃপক্ষ ওই বছরের ডিসেম্বরেই বাকসু নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্ধারিত সময়ে তা অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার এই ব্যবধান শিক্ষার্থীদের হতাশ করেছে। এছাড়া কলেজে দুটি বড় খেলার মাঠ থাকলেও সংস্কারের অভাবে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় সেগুলো খেলাধুলার অনুপযোগী থাকে, যা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

সংকটের এই দীর্ঘ তালিকা সত্ত্বেও ব্রজমোহন কলেজের গৌরব ও সম্ভাবনাও কম নয়। ১৩৭ বছর ধরে এই বিদ্যাপীঠ দক্ষিণ বাংলার অগণিত মানুষের জীবন আলোকিত করেছে, জাতীয় আন্দোলন সংগ্রামে অবদান রেখেছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। বর্তমানে যে সমস্যাগুলো বিরাজ করছে, সেগুলো অপ্রতিকার্য নয়। প্রয়োজন কেবল যথাযথ কর্তৃপক্ষের আন্তরিক উদ্যোগ, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং সময়োচিত সংস্কার। হলগুলো পুনর্নির্মাণ, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক লাইব্রেরি ও গবেষণাগার স্থাপন এবং বাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা গেলে দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড তার হারানো মহিমা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি কেবল বরিশালের নয়, সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের মানুষের গর্ব এই প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা তাই রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়