পাবিপ্রবির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ভাবনায় সমাবর্তন
২০০১ সালে ১৫ জুলাই পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হলেও দীর্ঘ সাত বছর পর ২০০৮ সালে ৫ জুন শহরে থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে রাজাপুর সংলগ্ন এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার ১৮ বছরেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আয়োজন করেনি সমাবর্তন। এ প্রসঙ্গে পাঁচটি অনুষদের প্রাক্তন পাঁচ শিক্ষার্থীর অনুভূতি তুলে ধরেছেন প্রকাশ করেছেন পাবিপ্রবি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. বাপ্পি হোসেন

* সমাবর্তন একটি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চূড়ান্ত গৌরবোজ্জ্বল পরিণতি, সাফল্যের মহিমান্বিত স্বীকৃতি ও আবেগঘন পরিসমাপ্তি। পরিতাপের বিষয়, আমাদের প্রাণের পাবিপ্রবি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ১৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও এখনো সেই আয়োজন অনুপস্থিত। একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে এ বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত, বঞ্চিত ও বিমর্ষ করে।
সমাবর্তন নিছক সনদ বিতরণের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা, ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের গৌরবদীপ্ত স্বীকৃতি। এই অনুপম মুহূর্তে পরিবার, শিক্ষক ও সহযাত্রীদের সঙ্গে অর্জনের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার যে অনির্বচনীয় অনুভূতি তা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। ফলে আমাদের একাডেমিক জীবনের পরিসমাপ্তি যেন এক অপূর্ণতার বিষণ্ণ ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পেশাগত প্রতিযোগিতা কিংবা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সমাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দ্রুত কার্যকর, সুদূরদর্শী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবে এবং আমাদের প্রাপ্য সম্মানকে মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করবে।
আব্দুর রহমান
ফার্মেসী বিভাগ, ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান : প্রভাষক, ফার্মেসী বিভাগ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
* একজন শিক্ষার্থী যখন স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে একটা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়, তখন তার চোখে থাকে গগনচুম্বি স্বপ্ন আর মনে থাকে একটা বর্ণিল পথের চাওয়া। সে চায় বিশ্ববিদ্যালয়টা তার শুধুমাত্র একটা পরিচয় নয় বরং তার জীবনের একটা সুন্দরতম অংশ হয়ে থাকুক। বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তাই তার জল্পনা-কল্পনা, আশা-আকাঙ্ক্ষার কোনো শেষ থাকে না। আর এর মধ্যে অন্যতম একটা স্বপ্ন হলো সমাবর্তনের স্বপ্ন। কালো আলখেল্লা গায়ে, মাথার কালো ক্যাপ উড়িয়ে ছবি ওঠাটা নিছকই একটা স্বপ্ন নয়, এ যেন এক রূপকথার জগতকে নিজের করে পাওয়া।
সমাবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম ও সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তাদের উৎসাহিত করা। এটি শুধু আনন্দের অনুষ্ঠান নয়, বরং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নতুন জীবনে প্রবেশের প্রতীক।
তুমি দুহাত বাড়িয়ে দাও
মোরা ডানা ঝাঁপিয়ে যাই,
তুমি হৃদয় বাড়িয়ে দাও
মোরা আকাশ ছাপিয়ে যাই।
জান্নাতুল ফেরদৌস কবিতা
ইংরেজি বিভাগ, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান: প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়।
* সমাবর্তন একটি শিক্ষাজীবনের গৌরবময় অধ্যায়- কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সাফল্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; বরং দীর্ঘ একাডেমিক পথচলার অর্জনকে সম্মানের সঙ্গে উদযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই দিনটি প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আত্মবিশ্বাস, গর্ব এবং নতুন ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা বহন করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর অতিক্রম করলেও এখন পর্যন্ত আমাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি। সময়ের সঙ্গে প্রশাসনের পরিবর্তন হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে, তবে বাস্তবায়নের অভাবে প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সমাবর্তন প্রত্যাশীদের মাঝে দীর্ঘদিনের হতাশা থেকেই গেছে।
একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সমাবর্তন প্রত্যাশী হিসেবে নতুন প্রশাসনের নিকট আন্তরিক অনুরোধ থাকবে- যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাবর্তন আয়োজনের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় এবং আমাদের শিক্ষাজীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ অর্জনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি শুধু একটি অনুষ্ঠানের দাবি নয়, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর পরিশ্রম ও স্বপ্নের মর্যাদা প্রদানের প্রত্যাশা।
মো. মিরাজুল ইসলাম
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান : প্রভাষক, ব্যবসায় প্রশাসন, হামদর্দ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
* পৃথিবীর যেখানেই নিজের পরিচয় দিই না কেনো, ‘পাবিপ্রবি’ নামটি উচ্চারণ করতে গর্ব অনুভব করি। তবে গভীর দুঃখের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি। সমাবর্তন কোনো সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও অর্জনের মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।
হাজারো প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী আজও সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটির অপেক্ষায়- যেখানে তারা গাউন পরে, টাসেল ঘুরিয়ে, সমাবর্তন ক্যাপ আকাশে উড়িয়ে প্রিয় ক্যাম্পাসে নিজেদের অর্জন উদযাপন করতে পারবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি শুধু একাডেমিক কার্যক্রমে নয়, বরং শক্তিশালী অ্যালামনাই নেটওয়ার্কেও নিহিত।
নিয়মিত সমাবর্তনের অভাবে সেই কাঙ্ক্ষিত অ্যালামনাই সংযোগও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, যা ভবিষ্যৎ সহযোগিতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি বিনীত আহ্বান, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে নিয়মিত সমাবর্তনের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হয় এবং পাবিপ্রবি তার পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক ঐতিহ্যের দিকে আরো এগিয়ে যায়।
অনামিকা রহমান
ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ,
২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমানে অধ্যয়নরত: ইউনিভার্সিটি অব তুরিন, ইতালি।
* ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত উত্তরবঙ্গের অন্যতম বিদ্যাপিঠ পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেড় দশক পার করলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি।
ফলে আমরা হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি গ্রহণের আনন্দ ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। সমসাময়িক যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক সমাবর্তন হলেও পাবিপ্রবি পিছিয়ে রয়েছে, যা হতাশাজনক।
সমাবর্তন আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বইচ্ছার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাসের স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। স্মারকলিপি প্রদান ও নিয়মতান্ত্রিক দাবির মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করা জরুরি।
দ্রুত সমাবর্তন সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনতিবিলম্বে কার্যকর কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে সমাবর্তন আয়োজনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দ্রুত ফলপ্রসু পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের এই যৌক্তিক দাবি পূরণে প্রশাসন দ্রুত উদ্যোগী হবে- পাবিপ্রবির প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে এটাই প্রত্যাশা।
মোছা. সুমনা পারভীন
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষ
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমান: সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) বস্ত্র অধিদপ্তর, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।
"









































