কেমন কাটল শিক্ষার্থীদের এবারের ঈদ

দিনের রুটিনটা যেমন ছিল-
বছরব্যাপী অপেক্ষার পর ঈদ আসে এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে। এ যেন খুশির জোয়ার, ভালোবাসার উচ্ছ্বাস। এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের সকাল আমাদের হৃদয়ে বয়ে আনে ভিন্ন রকমের এক প্রশান্তি, কৃতজ্ঞতা আর আনন্দের মিলনমেলা। এই বিশেষ দিনের প্রতিটি মুহূর্তই সাজানো থাকে এক নির্দিষ্ট ছন্দে, যা আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অঙ্গ। ঈদের দিন শুরু হয় যেন এক অন্যরকম আলোয়। ফজরের নামাজের পরই শুরু হয় ঈদের প্রস্তুতি। পরিধান করে নতুন বা পরিষ্কার পোশাক, সুগন্ধি ব্যবহার করে নিজেদের স্নিগ্ধ করে তোলে। এরপরই মনের প্রশান্তি আর আল্লাহর শুকরিয়া নামাজ আদায়ের জন্য যাত্রা শুরু হয় ঈদগাহ ময়দানে। ঈদের নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয় বরং এটি ভালোবাসার এক নিদর্শন। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ শেষে একে অপরকে আলিঙ্গন করার যে অনুভূতি তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সবাই হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করে, ছোটরা বড়দের থেকে সালামি পায় আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে ঈদের অনাবিল আনন্দে। নামাজ শেষে বাড়ি ফিরেই শুরু হয় ঈদের বিশেষ খাবারের আয়োজন। গরম গরম সেমাই, পায়েস, হালুয়া কিংবা ফিরনি সবার সামনে সাজিয়ে রাখা হয় বাহারি সব মিষ্টি খাবার। একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার এ আনন্দই তো ঈদের সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তোলে। ঈদ মানেই কেবল নিজের জন্য নয় বরং সবাইকে নিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার দিন। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া এসবের মাধ্যমেই ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায়। পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসে গল্পের আসর জমে ওঠে। বিকেল মানেই আড্ডার সময়। কেউ বের হয় ঘুরতে, কেউ খেলায় মেতে ওঠে, কেউ আবার ঘরে বসে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে উপভোগ করে ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান। অনেকেই বন্ধুদের নিয়ে সিনেমা দেখতে যায় বা বিশেষ কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। আবার কেউ কেউ দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মুখেও হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে। মনে রাখতে হবে ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করার একটি অনন্য উপলক্ষ্য।
ইব্রাহিম খলিল
শিক্ষার্থী
ঢাকা কলেজ।
অনলাইনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়-
ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব আর একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানো। আগে যেখানে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের মূল মাধ্যম ছিল চিঠি, কার্ড বা সরাসরি সাক্ষাৎ। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে তা হয়ে উঠেছে অনেক বেশি সহজ এবং গতিশীল। এখন অনলাইনের মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছা জানানো এক অসাধারণ ও জনপ্রিয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন- ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদির মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয় খুবই সহজে। ভিডিও কল, ভয়েস মেসেজ, ডিজিটাল কার্ড এবং ইমোজির মাধ্যমে মানুষ তার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে। একসময়কার ঈদ কার্ডের যে আবেগ তা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে বহু গুনে স্থান পেয়েছে। আগে হাতে লেখা কার্ডে ব্যক্তিগত ছোঁয়া থাকতো কিন্তু এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ইমোজি, জিআইএফ, অ্যানিমেটেড ভিডিও এবং স্পেশাল ফিল্টার ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ তাদের শুভেচ্ছা প্রকাশ করছে। একই সাথে বিকাশ, নগদ বা অন্যান্য অ্যাপসের মাধ্যমে সালামি পাঠিয়ে ঈদ আনন্দ করছে শিক্ষার্থীরা। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যেসব শিক্ষার্থী ও বন্ধুরা রয়েছেন তাদের জন্য ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো অনলাইন। যে কেউ মুহূর্তেই তার ভালোবাসার মানুষদের শুভেচ্ছা জানাতে পারেন। ব্যস্ত জীবনে চিঠি বা কার্ড পাঠানোর ঝামেলা ছাড়াই দ্রুত শুভেচ্ছা জানানো যায়। এক ক্লিকেই অসংখ্য মানুষের কাছে শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। আগে যেখানে একেকজনের জন্য আলাদা করে শুভেচ্ছা জানাতে হতো এখন একবারে শত শত বা হাজার হাজার মানুষকে একই বার্তা পাঠানো যায়, যা সময় এবং শ্রম দুই-ই সাশ্রয় করে। অনলাইনে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় আমাদের সময়ের এক অনিবার্য বাস্তবতা। তবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং আন্তরিকতার ছোঁয়া বজায় রাখলেই এটি সত্যিকারের আনন্দ বয়ে আনতে পারে। ঈদ মানে মিলন। তাই অফলাইন বা অনলাইনের যে মাধ্যমেই হোক, শুভেচ্ছা জানানো হোক মনের উষ্ণতা নিয়েই! পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করাই ঈদের মূল আবেদন।
রবিউল হাসান সাগর
শিক্ষার্থী
ঢাকা কলেজ।
গ্রামে ঈদের আলাদা আমেজ-
মুসলিম উম্মাদের জন্য রমজান একটি সাধনার মাস। কেননা, এই মাসজুড়ে রোজা রেখে রয়েছে গুনাহ মাপের সুযোগ। রমজান মাস জুড়ে গুনাহ মাপ করে নেওয়ার সুযোগ ব্যক্তিকে করে পরিশুদ্ধ এবং পবিত্র। মহত্ত্বের মাস রমজান ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ করে বলেই মনে হয় সবার নিকট ঈদ এতো বেশি আনন্দের। একমাস রোজা রাখার পরে শাওয়াল মাসের প্রথম দিন উদযাপিত হয় ঈদুল ফিতর। এটি সংযম, আত্মশুদ্ধি, সংহতির এবং আনন্দের প্রতীক। আর ঈদ গ্রামে করলে আনন্দের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। গ্রাম ও ঈদ উদযাপনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ঈদের প্রকৃত আনন্দ, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় গ্রামীণ পরিবেশে। গ্রাম প্রত্যেক মানুষের আত্মার সাথে সম্পর্কিত। গ্রাম হলো মানুষের শেকড়। ঈদ এলেই শহরে থাকা মানুষ কর্মব্যস্ততা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যান। প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা ঈদের মূল চেতনার অংশ। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির নিবিড় ছায়ায় অবস্থিত গ্রামগুলোতে ঈদ আসে এক অনন্য আনন্দ আর উচ্ছ্বাস নিয়ে। ঈদের আনন্দ আর গ্রামের প্রতি ভালোবাসা দুটোর সমন্বয়ে একজন মানুষের ঈদের একটি দিন হতে পারে অনাবিল শান্তি আর আনন্দের। গ্রামে প্রতিদিনের মতো ঈদের সকালও শুরু হয় পাখির কূজন আর শিশিরভেজা বাতাসের সঙ্গে ফজরের ওয়াক্তের প্রস্তুতিতে। ফজরের নামাজ পড়ে একজন প্রকৃতিপ্রেমী সবুজ মাঠে খোলা আকাশের নিচে শিশিরভেজা ঘাসে হাঁটার মতো অসম্ভব সুন্দর অনুভূতি কখনোই মিস করবে না। গ্রামে ঈদের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো- এক সাথে ঈদ উদযাপনের ঐতিহ্য। নিজেকে প্রস্তুত করে মায়ের হাতে বানানো মিষ্টান্নের স্বাদ নিয়ে বাবা, ভাই, চাচা এবং প্রতিবেশীদের সাথে গ্রামের শান্ত, নির্মল ও প্রাকৃতিক পরিবেশের অনুন্নত পথ দিয়ে ঈদগাহের উদ্দেশ্যে পায়ে হেটে রওনা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় দারুণ একটি সকাল। গ্রামের ঈদগাহে পরিচিত সবার সাথে ঈদের নামাজ আদায় করার আনন্দই অন্যরকম। খোলা আকাশের নিচে একসঙ্গে নামাজ আদায় করার ফলে পারস্পরিক বন্ধন আরো দৃঢ় হয়। গ্রামের ঈদ মানে সবাই একে অপরের বাড়িতে যাওয়া, কুশল বিনিময় করা এবং একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা। গ্রামের সাদাসিধা জীবনযাত্রায় মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তুলনামূলক ভালো হওয়ায় ঈদের দিন উঁচু-নিচু ব্যবধান ভুলে আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বেশি থাকে। গ্রামে ঈদের দিন বাচ্চারা দলবেঁধে আনন্দ করে। তারা গুরুজনদের কাছ থেকে সালামি সংগ্রহ করে এবং মাঠে খেলাধুলা করে। এতে করে শহর থেকে গ্রামে ঈদ উদযাপন করতে আসা বাচ্চাদের সামাজিকীকরণ আরো সুন্দর হয়। গ্রামের ঈদ মানেই ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় ভরা একটি মিলনমেলা যেখানে ঈদের আনন্দ প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়। বিশেষ করে গ্রামে ঈদের আনন্দ আরো আন্তরিক, হৃদ্যতাপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী। ঈদ মানেই গ্রামীণ পরিবেশের কাছে ফেরা, শেকড়ের টান অনুভব করা আর ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করা।
মেহেদী হাসান জিহাদ
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ছিন্নমূলের হৃদয়ে ঈদের আনন্দ-
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে চারদিকে জমকালো আলোর রোশনাই, নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। কিন্তু শহরের এক কোণে, রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, ফুটপাতে, ওভারব্রিজের নিচে, বস্তির আঁধারে একদল ছিন্নমূল মানুষের কাছে এ উৎসব শুধুই আরেকটি দিন যেখানে বেঁচে থাকার জন্য দুমুঠো খাবার জোগাড় করাই এসব মানুষদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের নেই নতুন পোশাক, নেই সুগন্ধি আতর, নেই সাজানো খাবারের থালা। উৎসবের আলোয় নিমজ্জিত এই শহরে, ছিন্নমূল মানুষদের কাছে, ঈদ তাদের জন্য শুধুই ক্ষুধার জ্বালা, অবহেলার বোঝা আর উপেক্ষার কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু ঈদ হবার কথা ছিল একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উৎসব, যেখানে ধনী-গরিবের ব্যবধান মুছে গিয়ে সকলে আনন্দে মেতে উঠবে। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ঈদের আনন্দ ছিন্নমূল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে। মানবিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সমাজের সামর্থ্যবানরা যদি তাদের পাশে দাঁড়ায়, তবে এই ঈদ সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য আনন্দময় হয়ে উঠবে। বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে কেবল নিজেদের জন্য ঈদ উদযাপনের নীতি থেকে বেরিয়ে সমাজের ছিন্নমূল অবহেলিত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো ও তাদের মুখেও হাসি ফোটানোর দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই ঈদ তার প্রকৃত সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হবে সবার জন্য সমানভাবে।
প্রজ্ঞা দাস
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ।
ঈদ শেষে ক্যাম্পাসে ফেরা-
ঈদ মানে আনন্দ, হাসি-খুশি, আপন পরিজনের সাথে কাটানো কিছু অমূল্য মুহূর্ত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আনন্দের এই উৎসবেরও ইতি ঘটে। শুরু হয় ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন নামক এক সংগ্রামের অধ্যায়। ঈদের ছুটি শেষ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানো আনন্দঘন মুহূর্তগুলো এখন স্মৃতির পাতায় সঞ্চিত। উৎসবের আমেজ, সেমাইয়ের স্বাদ, সবার সাথে গল্প আর গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি এসব এখন মনের কোণে জমা রাখা সুখ স্মৃতি। কিন্তু সময়ের নিয়ম মেনে আবার ফিরতে হলো চেনা ক্যাম্পাসে। একদিকে আপন পরিজনের সঙ্গে কাটানো কিছু রঙিন মুহূর্ত অন্যদিকে ক্যাম্পাসের প্রতি টান এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দেয়। ঈদের ছুটি শেষ হলেই যখন ঢাকায় আসা হয় তখন বাসায় প্রিয়জনদের সাথে কাটানোর সময়গুলো হয়ে উঠে অতীতের মুহূর্ত। ঈদের আনন্দ যেমন অনন্য, তেমনি ক্যাম্পাসের জীবনও। পরিবার থেকে দূরে থাকলেও, ক্যাম্পাসের বন্ধুরাই হয়ে উঠে আরেকটা পরিবার। তাই ঈদের পর ক্যাম্পাসে ফেরা মানেই স্মৃতি আর বাস্তবতার এক রঙিন মেলবন্ধন, যেখানে ঈদের রেশ মিশে যায় নতুন স্বপ্ন আর ব্যস্ততার মাঝে। ঈদের আনন্দের রেশ শেষ হলেও ক্যাম্পাসের কর্মব্যস্ত জীবনে ফেরার মধ্যেই নতুন এক উদ্যম কাজ করে। প্রিয় ক্যাম্পাস, চিরচেনা ক্লাসরুম, ব্যস্ত করিডোর এসবের মাঝেই আবার শুরু হলো নতুন অধ্যায়। সামনের দিনগুলো হবে আরো কর্মমুখর, আরো স্মরণীয়; এটাই প্রত্যাশা।
আহসান শাওন
শিক্ষার্থী
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
"









































