reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১ ঘণ্টা আগে

বিপন্ন মানুষের ডাকে জলমগ্ন বাঁশখালীতে জামায়াত আমিরের ত্রাণ বিতরণ

ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার গুনাগরি এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের চিত্রটি গত শুক্রবার ছিল অন্যরকম। চারদিকে থৈ থৈ পানি, তারই মধ্যে হঠাৎ গুঞ্জন—‘ওই যে দাদু আসছে’। ঘরের বারান্দা, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা কোমরসমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বানভাসি মানুষেরা একে অন্যকে হাত নেড়ে এই খবর দিচ্ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চিরচেনা এই ‘দাদু’ সম্বোধনটি যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, তা বুঝতে স্থানীয়দের মুহূর্তকালও সময় লাগেনি। বন্যার্তদের মাঝে তার এই আগমন যেন এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা করে।

শুকনো মেঝে ছেড়ে জলমগ্ন উঠানে বিরোধীদলীয় নেতা বন্যাকবলিত এলাকায় পৌঁছে ডা. শফিকুর রহমান গাড়ি থেকে নেমেই সাধারণ মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করেন। এরপর তিনি গুনাগরির লাবুর দোকানের পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে যান। সেখানে গত তিন দিন ধরে আশ্রয় নিয়ে থাকা শতাধিক পরিবারের মাঝে ব্যক্তিগতভাবে নগদ অর্থ ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

তবে কেবল শুকনো বা নিরাপদ স্থানে দাঁড়িয়ে ত্রাণ দেওয়ার প্রথাগত নিয়ম ভেঙে তিনি নিজেই নেমে পড়েন জলমগ্ন পথঘাটে। পাঞ্জাবি গুটিয়ে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে পায়ে হেঁটে চলে যান চারদিকে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা বাড়িগুলোতে। সেখানে দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে বিপন্ন পরিবারগুলোর খোঁজ নেন। ঘরের ভেতর আটকে থাকা শিশু ও প্রবীণদের মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেন এবং নিজ হাতে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দিয়ে মনে সাহস জোগান।

‘ছবি তুলতে নয়, উনি এসেছেন কষ্ট ভাগ করতে’ গুনাগরি এলাকার বন্যাকবলিত বাসিন্দা আহমেদ হোসেন নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, "তিন দিন ধরে পানির নিচে ডুবে আছি। অনেকেই এসে দূর থেকে ছবি তুলে চলে গেছে। কিন্তু উনি আমাদের ঘরের দুয়ার পর্যন্ত এসে হাত ধরে খোঁজ নিয়েছেন।"

একই আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া ফারাছা বেগম ও কিরণ বালা জলদাস জানান, বন্যার তীব্রতায় ঘরবাড়ি ছেড়ে তারা শুধু প্রাণটুকু নিয়ে বের হয়েছিলেন। ২০ দিনের নবজাতক ও ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে তারা চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এই কঠিন সময়ে দেশের একজন শীর্ষ নেতাকে এত কাছে পেয়ে তারা নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস পাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, এই অঞ্চলের প্রায় ৩০০টি বাড়ি সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে, যার মধ্যে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে চরমে পৌঁছেছে।

সংসদে জোরালো দাবি ও দ্রুত পুনর্বাসনের তাগিদ ত্রাণ কার্যক্রম শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডা. শফিকুর রহমান। মানবিক এই সফরের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তিনি বলেন, "আমি এখানে কোনো রাজনীতি করতে আসিনি, তীব্র সংকটে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে এসেছি। চট্টগ্রামের এই ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি নিজের চোখে সরাসরি দেখতে এবং ভুক্তভোগীদের দুঃখ-কষ্ট ভাগ করে নিতেই আমার এই ছুটে আসা।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জোরালো আলোচনা করা হয়েছে এবং সরকারের পক্ষ থেকেও ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, "মানুষের প্রকৃত দুর্ভোগ কখনো কাগজে-কলমে বা ফাইলে বন্দি থেকে বোঝা যায় না। মাঠে এসে বাস্তব চিত্র না দেখলে এই কষ্ট অনুধাবন করা অসম্ভব। আমি সরকারের কাছে অবিলম্বে বন্যাদুর্গতদের উদ্ধার, দ্রুত পুনর্বাসন ও পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।"

সাম্প্রতিক এই বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। আনুষ্ঠানিক বক্তব্য শেষে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তেও তিনি ক্ষণিকের জন্য থমকে দাঁড়ান এবং জলমগ্ন মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের সাথে হাত মিলিয়ে তাদের দুঃখের কথা শোনেন। আর দূর থেকে তখনো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল অবরুদ্ধ মানুষের সেই পরম নির্ভরতার ডাক—‘দাদু আসছেন...’।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়