মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

  ১ ঘণ্টা আগে

বর্ষা মৌসুমে চলনবিলের মানুষের চাঁই তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ায় চলনবিল অঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজারে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী ফাঁদ 'ধুন্দি' বা 'চাঁই' বিক্রির ধুম পড়েছে। বর্ষার নতুন পানিতে মাছ শিকারের জন্য স্থানীয় জেলে ও শৌখিন মৎস্য শিকারিরা দল বেঁধে এই ফাঁদ কিনছেন।জেলেরা জানান, বর্ষা মৌসুমে ক্ষেতে কাজ নেই, তাতে কী? জীবনযুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষগুলো হারতে নারাজ। জীবন-জীবিকার জন্য অভাবিরা এ সময় বেছে নেয় অন্য পেশা।

এ অঞ্চলের তৈরি চাঁই স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। গুণগত মান ভালো হওয়ায় আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন চাঁইশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। চলনবিলের নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে চাঁই তৈরিকে বেছে নিয়েছে।

বাঁশ ও তালগাছের কাণ্ডের আঁশ, কান্তি দিয়ে তৈরি এই চাঁই বর্ষাকালে বিভিন্ন জলাশয়ে ছোট মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। মাছ ধরার এসব ফাঁদ তৈরি করে প্রতিটি পরিবার দিনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকে। পরিবারের প্রায় সব সদস্যই চাঁই তৈরির কাজে জড়িত থাকেন। এ বছর চলনবিলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানি আসায় চাঁইয়ের চাহিদা বেড়েছে।

চাঁই তৈরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁই তৈরি করে লাভবান হওয়ায় এ অঞ্চলের অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সারা বছরই মাছ ধরার বিভিন্ন ধরনের চাঁই তৈরি করছেন। চলনবিল এলাকার কয়েক হাজার মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করলেও এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও ব্যক্তির কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তাঁরা কোনো রকমে এ পেশায় টিকে আছেন।

চাঁই, বিভন্ন এলাকায় ধন্দি, বানা, খাদন, খালই, বিত্তি ও ভাইর নামে পরিচিত। সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুরা, ফরিদপুর, হান্ডিয়ালসহ নাটোরের গুরুদাসপুর; বড়াইগ্রাম, সিংড়া উপজেলার উপজেলার বিপুলসংখ্যক নিম্ন আয়ের মানুষ বর্তমানে চাঁই তৈরি ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার উপজেলার নওগাঁ হাট ঘুরে দেখা যায়, এলাকাজুড়ে শুধু চাঁই আর চাঁই। চাঁইশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান,তাড়াশের নওগাঁ হাট ছাড়াও গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় হাট, চাটমোহর হাট, বড়াইগ্রাম ও সিংড়া উপজেলার বিভিন্ন হাটে নানা রকম চাঁই বিক্রি হচ্ছে। এক জোড়া চাঁই (খোলসুন) আকারভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, বিত্তি ৪০০ টাকা, ভারই ৩৫০ টাকা, ধন্দি ৩০০ টাকা, বানা ৫০০ টাকা, খাদন ৫৫০ টাকা ও খালই ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নওগাঁ হাটে উল্লাপাড়া থেকে আসা ক্রেতা কবির হোসেন বলেন, নওগাঁ হাটে কম দামে চাঁই পাওয়ায় তাঁরা কিনেছেন।

হান্ডিয়াল গ্রামের সুবোধ রুহিদাস জানান, আগে তিনি নিজেই চাঁই তৈরি করতেন। এখন প্রতি সপ্তাহে তাঁর পরিবার থেকে ৭-৮টি করে চাঁই তৈরি করছেন। ৮টি খোলসুন তৈরিতে ৩০০ টাকা ব্যয় হয়। বিক্রি করেন ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

খুচরা বিক্রেতা আব্দুর রহমান বলেন, তিনি চাঁই প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে আকারভেদে একেকটি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় কিনে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। তা ছাড়া চলনবিলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি বাড়ায় বর্তমানে চাহিদা অনেক বেশি। এ কারণে দামও বেশি।

ঢাকা থেকে আসা ব্যাপারী ফরিদুল মোল্লা বলেন, প্রতি হাটে তিনি প্রায় এক লাখ টাকার চাঁইসহ মাছ ধরার বিভিন্ন প্রকারসামগ্রী কিনে তা ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন। এতে তার খরচ বাদে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ হয়।

নওগাঁ হাটে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ধরার সামগ্রী বিক্রি হয়। চলনবিল এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ এ হাটে এসব সামগ্রী কিনতে আসেন।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়