লাবনী আক্তার শিমলা
মতামত
তীব্র্র শীতে পিঠা যখন জীবিকা

শীতের আগমনে শৈত্যপ্রবাহের দাপটে যখন জনজীবন প্রায় নিথর হয়ে পড়ে, তখন পিঠার আমেজে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় শহর ও গ্রামাঞ্চল। শীতের প্রচণ্ডতায় কর্মসংস্থান হারান অনেকেই; দিনমজুরদের একটি বড় অংশের কাজ এ সময় স্থগিত হয়ে যায়। ঠিক তখনই পিঠার সমারোহ নতুন এক জীবিকার পথ খুলে দেয়- পিঠা বাণিজ্য।
গ্রামে খেজুরের গুড়, দুধ, তিল, চালের গুঁড়া আর নারকেল দিয়ে ঘরে ঘরে তৈরি হয় বাহারি পিঠা। শহরে সেই সুযোগ সীমিত হলেও পিঠার প্রতি মানুষের আকর্ষণ মেটাতে অলিগলিতে গড়ে ওঠে অস্থায়ী পিঠার দোকান। খোলা জায়গায় দোদুল্যমান ছাউনির নিচে, তীব্র শৈত্যপ্রবাহে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতেই পিঠা বিক্রি করেন বিক্রেতারা। মাটির চুলার আগুনে যেমন তাদের জীবিকা জ্বলে ওঠে, তেমনি সেই আগুন ঘিরেই পূরণ হয় মানুষের শীতের পিঠার চাহিদা।
পিঠার এই ঐতিহ্য বাঙালি সংস্কৃতির লোকজ জীবন, উৎসব ও আভিজাত্যের সঙ্গে বহু প্রাচীনকাল থেকেই জড়িয়ে আছে। দ্বাদশ শতকের সংস্কৃত মহাকাব্য নৈষধচরিত-এ বাঙালি খাদ্যতালিকায় পিঠার বিভিন্ন প্রকারের উল্লেখ পাওয়া যায়। আবার ষোড়শ শতাব্দীতে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে পাটিসাপটা পিঠার কথা ওঠে এসেছে। ধান, গুড়, নারকেলসহ স্থানীয় উপাদাননির্ভর এই খাবার তাই নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি ও পৌষ পার্বণের মতো শস্য উৎসবের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। এসব উৎসব বাংলার জনজীবনে যুগ যুগ ধরে শীতের আনন্দ ও প্রাচুর্যের প্রতীক হয়ে আছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাটিসাপটা, ভাপা, চিতই, দুধপুলি, শেউয়ি, ফুলপিঠা, তেলের পিঠা, জামাই পিঠা, পুলি পিঠা, নকশি পিঠা, ঝাল পিঠা, চন্দ্র পিঠা, রসপান, তক্তি পিঠা, কদম পিঠা, লবঙ্গ পিঠা, গোলাপ পিঠা, খেজুর পিঠা, ঝিনুক পিঠা, খাস্তা পিঠা, পানতোয়াসহ অসংখ্য পিঠার প্রচলন রয়েছে। অথচ শহরের অনেক মানুষ এসব পিঠার নাম অবধি জানেন না- স্বাদ জানা তো দূরের কথা। এটি শুধু খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালির দূরত্ব নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ারও ইঙ্গিত দেয়।
তেঁতুলিয়া থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব শহরেই শীত মৌসুমে পিঠা বাণিজ্য এখন একটি পরিচিত দৃশ্য। তবে শহরের ঝলমলে আয়োজন আর গ্রামের মাটির চুলার পিঠার স্বাদের মধ্যে যে তফাৎ, তা স্পষ্ট। এই স্বাদ ও আমেজের ব্যবধানেই শহুরে জীবনের মানুষ অনেক সময় পিঠার আসল আনন্দ থেকে বঞ্চিত হন। তবু নিম্নআয়ের মানুষের হাতে বানানো পিঠার কারণেই থমকে যায়নি আমাদের এই ঐতিহ্য।
এই মানুষগুলো বছরের মাত্র তিন থেকে চার মাস, কখনো তারও কম সময়, পিঠা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। বাকি সময় তারা অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে জীবন নির্বাহ করেন। পিঠার এই মৌসুমি বাণিজ্য সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব অর্থের ওপর নির্ভরশীল। সারা বছরের সঞ্চিত সামান্য অর্থ দিয়ে কেউ উদ্যোগ শুরু করেন, কেউ আবার বাধ্য হয়ে নিজের মূল্যবান জিনিস বিক্রি করেও এই ব্যবসায় নামেন।
এই সীমিত পুঁজি থেকেই তৈরি হয় আরেকটি বড় সংকট। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অনেক সময় পিঠা তৈরিতে বিশুদ্ধ ও মানসম্মত উপাদান ব্যবহার করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কম মূল্যের ভেজাল গুড়, নিম্নমানের চালের গুঁড়া কিংবা দুধ ব্যবহার করতে গিয়ে একদিকে যেমন পিঠার স্বাদ নষ্ট হয়, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁঁকিও বাড়ে। কম খরচের চাপ ও দ্রুত বিক্রির তাগিদে অনেক সময় ঐতিহ্যিক পদ্ধতি বাদ পড়ে যায়। এতে পিঠার আসল স্বাদ ও বৈচিত্র্য হারানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ফলে পিঠার প্রতি মানুষের আগ্রহও ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করে- যা এই ঐতিহ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এ ছাড়া সঠিক অবকাঠামো ও পানির ব্যবস্থা না থাকায় স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা কঠিন হয়। ফলে ভোক্তাদের কাছে দোষারোপের শিকার হন ক্ষুদ্র বিক্রেতারাই- যেখানে দায় আসলে কাঠামোগত।
পুঁজি সংকটের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে দেশের অস্থিতিশীল দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি। চাল, তেল, গুড় ও দুধের মতো প্রয়োজনীয় উপকরণের পর্যাপ্ততা থাকলেও অতিরিক্ত মূল্যের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আশাহত হয়ে পড়ছেন। তার ওপর শহরের বড় বড় রেস্টুরেন্ট ও নামি-দামি পিঠা স্টলের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা তাদের অবস্থাকে আরো বেহাল করে তুলছে।
বর্তমানে শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও বসছে পিঠার হাট। সেখানে পিঠার বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্য চোখে পড়লেও তীব্র শৈত্যপ্রবাহ অনেকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পর্যাপ্ত সুরক্ষা, শীতবস্ত্র কিংবা স্থায়ী অবকাঠামোর অভাবে অনেকেই এই ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যেতে পারছেন না। উত্তরবঙ্গের শীতে ভ্রাম্যমাণ পিঠা বিক্রেতাদের জীবন এক ধরনের নীরব সংগ্রামের গল্প। ভোরের কুয়াশায় যখন অধিকাংশ মানুষ ঘর ছেড়ে বের হতে চান না, তখন তারা পিঠার হাঁড়ি কাঁধে নিয়ে রাস্তায় নামেন। কেউ কেউ বাইসাইকেলে, কেউ পায়ে হেঁটে-এক বাজার থেকে আরেক বাজারে।
অনেকে জানান, সকালে আগুন জ্বালাতে কাঠ জোগাড় করাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। কখনো ঠাণ্ডায় আগুন জ্বলে না, কখনো বাতাসে চুলার আগুন নিভে যায়। হাত-পা অবশ হয়ে আসে, তবুও বিক্রি বন্ধ করা যায় না। কারণ একদিন বসতে না পারলে সেদিনের আয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরো সপ্তাহের সংসারের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।
পিঠা তৈরির বড় অংশে নারীদের শ্রম যুক্ত থাকলেও বাজারে তাদের উপস্থিতি ও স্বীকৃতি তুলনামূলক কম। ঘরে তৈরি পিঠার পেছনে থাকা নারীদের শ্রম অর্থনৈতিকভাবে দৃশ্যমান হয় না। এ ছাড়া সমাজের অনেকেই এই নারীদের সঙ্গে সম্মানসূচক ব্যবহার করে না; তাদের কোনো ত্রুটির কারণে ছোট করা হয়, যা তাদের মানসিক চাপ তৈরি করে। এই সংকটগুলো থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান স্বল্পসুদে ঋণ ও মৌসুমি ভর্তুকি দিলে বিক্রেতারা মানসম্মত উপাদান ব্যবহার করতে পারবেন। শীত মৌসুমে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের জন্য শীতবস্ত্র ও গরম পানির ব্যবস্থা করা হলে তাদের সংগ্রাম কিছুটা সহজ হবে। স্থানীয় সরকার উদ্যোগে গ্রামভিত্তিক পিঠা হাট বা উৎসব নিয়মিত আয়োজন করা সম্ভব; এতে পিঠা বিক্রির হার ও নিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাবে। ঘরে বসে পিঠা তৈরি করা নারীদের প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। স্বাস্থ্যসম্মত পিঠা তৈরিতে প্রশিক্ষণ ও সহজ সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।
বিক্রেতারা অর্থাৎ একাধিক ক্ষুদ্র উৎপাদনকারী মিলে একটি উপাদান ক্রয়-সমবায় গঠন করতে পারেন। একসঙ্গে বেশি পরিমাণে চালের গুঁড়া, গুড়, নারকেল ইত্যাদি কিনলে খরচ কম পড়ে এবং মানসম্মত জিনিস কেনার সামর্থ্য হয়। খেজুরের গুড়, পাটালি গুড়ের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও সস্তা ফল (যেমন- কুল, বেল, গাজর) দিয়ে নতুন ধরনের পিঠার স্বাদ তৈরি করা যায়। এতে খরচ কমবে এবং বৈচিত্র্য বাড়বে। পরিবেশবান্ধব ও সস্তা উপাদান- যেমন কলাপাতা, শালপাতা, স্থানীয় মাটির পাতিল বা খড় দিয়ে তৈরি পাত্র- ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ঐতিহ্যও বজায় রাখবে এবং আলাদা একটি আকর্ষণ তৈরি করবে।
ক্রেতারা চাইলেই পিঠা বিক্রেতাদের এই উদ্যোগকে সহায়তা করতে পারেন। ইউটিউবে ছোট ভিডিও (রিলস/শর্টস) খুব কার্যকর। মোবাইল দিয়ে পিঠা বানানোর সুন্দর ভিডিও (যেমন- নকশি পিঠার নকশা তোলা, রস পিঠায় রস ঢালা) ধারণ করে স্থানীয় ফেসবুক গ্রুপে শেয়ার করা এবং হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা (যেমন- শীতেরপিঠা, নাটোরের ভাপাপিঠা, কুমিল্লার চিতই) হলে মানুষের মাঝে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পরিচিতি বাড়বে।
অনেক এনজিও (ব্র্যাক, আশা ইত্যাদি) শীতকালে নিম্নআয়ের নারীদের জন্য আয়বর্ধক কর্মসূচি চালায়। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পিঠা তৈরির উপকরণ বা বিক্রয়ের জন্য প্রাথমিক পুঁজি সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। এখান থেকে ক্ষুদ্র ঋণ (মাইক্রো-ক্রেডিট), ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ এবং কখনো কখনো সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
পিঠা তৈরির দক্ষতাকে ‘কোর্স’ হিসেবে গড়ে তোলা দরকার; কেননা রন্ধনশিল্পের মধ্যে পিঠা তৈরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ নারী উৎপাদনকারীরা স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারে বা নিজেদের বাড়িতে অন্যদের (বিশেষ করে তরুণীদের) জন্য ছোট ছোট কর্মশালার আয়োজন করতে পারেন। এর জন্য সামান্য ফি নেওয়া যেতে পারে, যা তাদের আয়ের পথ সুগম করবে। এ ছাড়া একই এলাকার কয়েকজন নারী মিলে একটি ছোট ‘পিঠা উৎপাদন ও বিপণন গ্রুপ’ তৈরি করতে পারেন। একজন তৈরি করবেন, একজন প্যাকেজ করবেন, আরেকজন বিক্রি বা ডেলিভারির দায়িত্ব নেবেন। এতে কাজের চাপ কমবে এবং আয় ভাগাভাগি হবে।
পরিশেষে, পিঠা শুধু একটি মৌসুমি খাবার নয়; এটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাত। সামান্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সামাজিক সচেতনতা এবং উৎপাদনকারীদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম। এছাড়া হাজার হাজার নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য একটি মজবুত আয়ের উৎস হিসেবে আশার আলো দেখাবে আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। তাই নাগরিক, সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান- বাঙালির এই ঐতিহ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা এবং নিম্নবিত্ত মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা। শুধু সহায়তা নয়, পিঠাকে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ বা ‘জিআই’ পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রচেষ্টাও এই ঐতিহ্যকে বিশ্বে পরিচিতি দিতে পারে।
শহরের আনাচে-কানাচে, গলির মুখে শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গেই বসে বিক্রেতারা তৈরি করছেন পিঠা এবং রচনা করছেন তাদের জীবনের গল্প। তাদের সহযোগিতা করা না হলে আমরা হারাব বাঙালিয়ানা, ঐতিহ্য ও এসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
"






































