শেখ রফিক
মতামত
ডিজিটাল গণতন্ত্র ও উন্মুক্ত সরকার প্রসঙ্গ

গত এক দশক ধরে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ রাষ্ট্র, সরকার এবং নাগরিকের সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বর্তমান শতাব্দীতে গণতন্ত্র শুধু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ইন্টারনেট, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ওপেন ডেটা, ডিজিটাল পরিচয়, ই-গভর্নেন্স, সোশ্যালমিডিয়া, অনলাইন ডিসকোর্স, জনপরামর্শ এবং নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতন্ত্রের নতুন রূপ গড়ে উঠছে। এই নতুন ধারাকেই বলা হয় ডিজিটাল গণতন্ত্র বা ই-গণতন্ত্র বর্তমান বিশ্বে United Nations, OECD, Council of Europe এবং European Commission -সবগুলো প্রতিষ্ঠানই ডিজিটাল প্রযুক্তির গণতন্ত্রকে আরো অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করে।
ডিজিটাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিকরা রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এতে নির্বাচন, আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, জনপরামর্শ, বাজেট প্রণয়ন, সরকারি তথ্যপ্রাপ্তি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, ডিজিটাল গণতন্ত্রের লক্ষ্য নাগরিককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। রাজনৈতিক গবেষক Beth Simone Noveck- এর মতে, ডিজিটাল গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো ‘collaborative governance’, অর্থাৎ সরকার ও নাগরিক একসঙ্গে নীতি প্রণয়নে অংশ নেবে।
ডিজিটাল গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদান হচ্ছে- ই-ভোটিং বা নিরাপদ ডিজিটাল ভোটিং ব্যবস্থা। ই-পিটিশন, অংশগ্রহণমূলক বাজেট, অনলাইন জনপরামর্শ ও ওপেন গভর্নমেন্ট ডেটা। এসব ক্ষেত্রে সরকারি তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক থাকে।
এস্তোনিয়া, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ডিজিটাল গণতন্ত্রের উদাহরণ। ২০০৫ সাল থেকে দেশটি জাতীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট ভোটিং চালু করেছে। ওই দেশের নাগরিকরা নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে ভোট দিতে পারেন। একই সঙ্গে কর প্রদান, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা নিবন্ধন, ভূমি রেকর্ড, আদালতের নথি এবং সরকারি সেবার অধিকাংশই অনলাইনে সম্পন্ন হয়। ডিজিটাল পরিচয় ও শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তার কারণে এস্তোনিয়ার ডিজিটাল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবে একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত।
সুইজারল্যান্ড, প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের জন্য বিখ্যাত। তাইওয়ানের ঔড়রহ চষধঃভড়ৎস বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলসহ আরো কয়েকটি দেশে ডিজিটাল গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রয়েছে।
ডিজিটাল গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের প্রতিটি পর্যায়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর ফলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব কমে। সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরো স্বচ্ছ করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বৃদ্ধি পায়। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত জনমত নেওয়া সম্ভব হয় এবং নীতিনির্ধারণ আরো তথ্যনির্ভর হয়। সরকারি তথ্য উন্মুক্ত থাকলে দুর্নীতি, অপচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার কমানো সহজ হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ওপেন গভর্নমেন্ট ডেটা সরকারি জবাবদিহি বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যয় হ্রাস পায়। কাগজনির্ভর প্রশাসনের পরিবর্তে ডিজিটাল ব্যবস্থায় সময় ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হয়। প্রবাসী নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণ সহজ হয়। ফলে গণতন্ত্র আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল গণতন্ত্র ধীরে ধীরে চালু করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। দেশে ইতোমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র, ডিজিটাল সেবা, অনলাইন সরকারি প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন ই-গভর্নেন্স উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। এসব অবকাঠামোকে আরো নিরাপদ ও সমন্বিত করে নাগরিক অংশগ্রহণভিত্তিক ডিজিটাল গণতন্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। এজন্য জাতীয় পর্যায়ে সম্পূর্ণ অনলাইন ভোটিং চালুর আগে সাইবার নিরাপত্তা, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা, নাগরিকের ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অন্যথায় প্রযুক্তির প্রতি অনাস্থা গণতান্ত্রিক বৈধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল গণতন্ত্র বাস্তবায়ন করা জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল গণতন্ত্র নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এতে নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার, তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সরকারি তথ্য উন্মুক্ত করার নীতিমালা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
সংসদ, মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকারে অনলাইন জনপরামর্শ প্ল্যাটফর্ম চালু করা যেতে পারে। নতুন আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের আগে নাগরিকদের মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হলে নীতিনির্ধারণ আরো অংশগ্রহণমূলক হবে।
জাতীয় ই-পিটিশন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নির্দিষ্টসংখ্যক ডিজিটাল স্বাক্ষর সংগ্রহ হলে সংসদ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
ওপেন গভর্নমেন্ট ডেটা সম্প্রসারণ করতে পারলে বাজেট, সরকারি ব্যয়, প্রকল্পের অগ্রগতি, ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য এবং উন্নয়ন সূচক জনগণের জন্য সহজলভ্য হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক ডিজিটাল বাজেট চালু করা যেতে পারে। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণে নাগরিকদের অনলাইন মতামত গ্রহণ করা যেতে পারে।
নিরাপদ ডিজিটাল পরিচয় ও শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক ই-ভোটিং চালানো যেতে পারে। যেমন, প্রবাসী ভোটার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচন বা পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে। সফলতা ও আস্থা অর্জনের পরই জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত প্রয়োগ বিবেচনা করা উচিত।
ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, কার্যকর তথ্য সুরক্ষা আইন, স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং প্রযুক্তির ওপর সর্বদলীয় রাজনৈতিক আস্থা গড়ে তোলাও অপরিহার্য।
ডিজিটাল গণতন্ত্র আধুনিক গণতন্ত্রের একটি ক্রমবর্ধমান রূপ। বাংলাদেশ যদি নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো, তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ডিজিটাল গণতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াবে, জবাবদিহি শক্তিশালী করবে এবং একটি অধিক স্বচ্ছ, দক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উন্মুক্ত সরকার হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে সরকার তার কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত, ব্যয়, নীতিমালা, চুক্তি এবং তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করে এবং নাগরিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান করে। এর মূল দর্শন হলো-সরকার জনগণের জনগণের সেবক। তাই রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কিত তথ্য জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখার পরিবর্তে উন্মুক্ত করা উচিত।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্রের গুণগত মান নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অংশগ্রহণের মাত্রা। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র পরিচালনা মূলত আমলাতান্ত্রিক গোপনীয়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, গণতান্ত্রিক চর্চার সম্প্রসারণ এবং নাগরিক অধিকারের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বব্যাপী একটি নতুন ধারণার উত্থান ঘটে, যার নাম উন্মুক্ত সরকার। রাজনৈতিক গবেষক Mark Fenster উন্মুক্ত সরকারকে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন যেখানে রাষ্ট্রের কার্যক্রম জনগণের পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে।
জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, OECD এবং Open Government Partnership (OGP)-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত সরকারকে সুশাসন, দুর্নীতি দমন এবং টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশ উন্মুক্ত সরকার নীতি অনুসরণ করছে এবং নাগরিক অংশগ্রহণ ও তথ্য উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনাকে আরো গণমুখী করার চেষ্টা করছে।
উন্মুক্ত সরকারের মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক অংশগ্রহণ। সরকারি সিদ্ধান্ত, বাজেট, ব্যয়, প্রকল্প, চুক্তি এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের কার্যক্রমের জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। আইন, নীতি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় জনগণের মতামত গ্রহণ করা হবে এবং তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। বর্তমানে অনেক দেশ এই তিন স্তম্ভের সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও ওপেন ডেটা যুক্ত করেছে।
বর্তমানে বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশ Open Government Partnership-এর সদস্য এবং বিভিন্ন মাত্রায় উন্মুক্ত সরকার বাস্তবায়ন করছে। United States উন্মুক্ত সরকার ধারণার অন্যতম পথিকৃৎ। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে Freedom of Information Act (FOIA) কার্যকর রয়েছে। যার মাধ্যমে নাগরিকরা সরকারি তথ্য চাওয়ার আইনগত অধিকার পান। এছাড়া সরকারি তথ্য উন্মুক্ত করার জন্য Data.gov-এর মতো ওপেন ডেটা প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকারি ব্যয়, মন্ত্রণালয়ের তথ্য, সরকারি ক্রয় এবং নীতিনির্ধারণ সম্পর্কিত বহু তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করে। নাগরিকরা বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতে পারেন এবং সংসদীয় পিটিশনের মাধ্যমে নীতি প্রভাবিত করতে পারেন।
এস্তোনিয়া ডিজিটাল শাসনের বিশ্বনেতা হিসেবে পরিচিত। সরকারি সেবার অধিকাংশই অনলাইনে উন্মুক্ত এবং নাগরিকরা সহজেই সরকারি তথ্য ও প্রশাসনিক নথি দেখতে পারেন।
ফিনল্যান্ড, সুইডেন, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরয়িাও ওপেন ডেটা, স্বচ্ছ বাজেট, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং ডিজিটাল শাসনের মাধ্যমে উন্মুক্ত সরকার বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
উন্মুক্ত সরকারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দুর্নীতি হ্রাস। যখন সরকারি ব্যয়, প্রকল্প, ক্রয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তখন অনিয়ম ও দুর্নীতি গোপন রাখা কঠিন হয়ে যায়। ফলে প্রশাসনের ওপর জননিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। এটি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে। নাগরিকরা যখন দেখতে পান যে সরকার তথ্য গোপন করছে না এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস বাড়ে। নীতিনির্ধারণের মান উন্নত হয়। নাগরিক, গবেষক, বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের অংশগ্রহণের ফলে সরকার আরো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। জনপর্যবেক্ষণের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অপচয় ও অনিয়ম কমে। গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। উন্মুক্ত সরকার উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও সহায়ক। সরকারি তথ্য উন্মুক্ত হলে গবেষণা, ব্যবসা এবং প্রযুক্তি খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশে উন্মুক্ত সরকার আরো ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠা করার যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। যদিও দেশে তথ্য অধিকার আইন, ডিজিটাল সেবা, ই-গভর্নেন্স এবং কিছু ওপেন ডেটা উদ্যোগ রয়েছে, তবুও সরকারি তথ্যপ্রাপ্তি, নীতিনির্ধারণে জনসম্পৃক্ততা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, স্থানীয় সরকার উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং দুর্নীতি হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক আরো ইতিবাচক হবে।
বাংলাদেশে উন্মুক্ত সরকার বাস্তবায়নের জন্য প্রথমে তথ্য অধিকার আইনকে আরো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নাগরিক যেন সহজে ও দ্রুত সরকারি তথ্য পেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ওপেন ডেটা পোর্টাল প্রতিষ্ঠা বা সম্প্রসারণ করতে হবে, যেখানে বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি ব্যয়, টেন্ডার, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্য উন্মুক্ত থাকবে। সংসদ ও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক জনপরামর্শ ব্যবস্থা চালু করা উচিত। গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতিমালার খসড়া জনগণের জন্য প্রকাশ করে মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
স্থানীয় সরকারে অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা জনসম্মুখে প্রকাশ এবং নাগরিক পরামর্শের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন তথ্য উন্মুক্ত করতে হবে। কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, কে কাজ করছে, কাজের অগ্রগতি কতটুকু-এসব তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য হওয়া উচিত। স্বাধীন তথ্য কমিশন, দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান এবং সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতি বাস্তবে কার্যকর হয়।
উন্মুক্ত সরকার রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি নতুন দর্শন। এর মূল ভিত্তি হলো-তথ্য জনগণের, ক্ষমতা জনগণের এবং সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায় যে উন্মুক্ত সরকার দুর্নীতি কমায়, আস্থা বৃদ্ধি করে, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করে এবং গণতন্ত্রকে আরো অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর করে তোলে। উন্মুক্ত সরকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাংলাদেশ আরো স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও গণমুখী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারবে।
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক
"






































