আলী হোসেন, বেলাবো (নরসিংদী)

  ২০ জুলাই, ২০২৬

নরসিংদীর বেলাবো

কোটি টাকার লটকন বাণিজ্য হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান

টক-মিষ্টি স্বাদের ছোট এক ফল লটকন, যা এখন হাজারো মানুষের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার। এক সময় বাড়ির আঙিনায় অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই ফলটি এখন নরসিংদী জেলার অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন নরসিংদীর বেলাবো, শিবপুর, রায়পুরা, মনোহরদী উপজেলার হাজার হাজার কৃষক। চলতি মৌসুমেও জেলায় কোটি টাকার লটকন বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। লটকন চাষ করে জেলার বহু পরিবার আজ পাকা বাড়ি ও গাড়ির মালিক হয়েছেন। বাগান পরিচর্যা, ফল সংগ্রহ, প্যাকিং ও পরিবহনে যুক্ত হয়েছেন হাজারো বেকার যুবক ও নারী। ধান বা অন্যান্য ফসলের চেয়ে লটকন চাষে খরচ অনেক কম, কিন্তু লাভ কয়েকগুণ বেশি।

নরসিংদীর শিবপুর, বেলাবো ও রায়পুরা এবং মনোহরদী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি লটকন চাষ হয়। এখানকার লালচে রঙের উঁচু মাটি লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। লটকন গাছ রোপণের ৪-৫ বছরের মধ্যে ফল আসে এবং একটি গাছ টানা ৩০-৪০ বছর ফল দেয়। রায়পুরা উপজেলার মরজালের লটকন বাজারসহ স্থানীয় আড়ৎগুলোতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার লটকন বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা প্রতিদিন এখান থেকে ফল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের গন্ডি পেরিয়ে নরসিংদীর লটকন এখন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, লটকন চাষিদের সবধরনের কারিগরি ও পরামর্শ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা গেলে লটকন চাষের মাধ্যমে এই অঞ্চলের অর্থনীতি আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি লটকনের বাগান রয়েছে বেলাবো ও শিবপুর উপজেলায়। এ এলাকায় ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও লটকনের স্বতন্ত্র বাগান ছিল না। তখন অন্যান্য ফলগাছের সঙ্গেই দু-একটি গাছ লাগানো হতো। স্থানীয় লটকন চাষিরা জানান, একসময় লটকনের তেমন চাহিদা ছিল না, দামও ছিল কম, সে কারণে কেউ লটকনের স্বতন্ত্র বাগান করার চিন্তা করতেন না। বর্তমানে লটকনের চাহিদা ও মূল্য দুটিই বেড়েছে।

বেলাবো উপজেলার আমলাব ইউনিয়নের পাহাড় উজিলাবো গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক মাস্টার বলেন, আমি প্রায় ১০ বিঘা জমিতে লটকন চাষ করেছি। গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন তেমন ভালো হয়নি। তবে বিগত বছরের তুলনায় দাম সন্তোষজনক। আশা করি এ বছর বিক্রি ভালো হবে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রকৌশলী, বর্তমানে সফল লটকন চাষি নুরুল আমিন ভূঞা বাচ্চু,বলেন, লটকন একটি ঔষধি ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধি ফল। তাই এর চাহিদা ব্যাপক। একটি পূর্ণবয়স্ক লটকন গাছে ৫ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। অন্য ফসলের তুলনায় লটকনে উৎপাদন খরচ কম কিন্তু আয় বেশি হওয়ায় লটকন চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। তাছাড়া এখানকার লটকন অন্যান্য অঞ্চলের লটকনের তুলনায় অনেক সুস্বাদু।

কৃষি উপসহকারী ফাতেমা বেগম বলেন, লটকন চাষিদের কৃষি অফিসের পক্ষ হতে প্রতিনিয়ত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

বিগত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে ফলন ভালো হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহিবুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, নরসিংদীর লটকন দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে; যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ এলাকার লটকন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করে।

এ বছর বেলাবো উপজেলায় প্রায় ২০৫ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হলেও ১৯০ হেক্টর জমি থেকে লটকন উৎপাদন হচ্ছে। এ মৌসুমে এখানে প্রায় তিন হাজার ৫শ টন লটকন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যার বাজারমূল্য ৫ কোটির উপরে। আবহাওয়া ও বাজারমূল্য ভালো থাকায় লটকন চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের।

নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আজিজল হক বলেন, নরসিংদীতে চলতি বছর ১৮শ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৩০ হাজার ৭শ টন লটকন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার দাম প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। প্রতি কেজি লটকন স্থানীয় বাজারে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়