ফাইদুল ইসলাম, পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও)

  ২০ জুলাই, ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ

গ্রামীণ সড়ক বেহাল, কর্তৃপক্ষের নজর বিলাসী প্রকল্পে

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীণ কাঁচা সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। বর্ষা এলেই এসব রাস্তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে অথচ সেদিকে নজর নেই কর্তৃপক্ষের। উল্টো গ্রামীণ সড়ক উন্নয়নের বরাদ্দ কমিয়ে উপজেলা পরিষদ চত্বরের পুকুর পাড়ের সৌন্দর্যবর্ধন এবং কার্যালয় সজ্জাসহ বিলাসী প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে উপজেলা প্রশাসন বলছে, শহরের থেকে গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য মতে, উপজেলায় মোট রাস্তার দৈর্ঘ্য এক হাজার ২৯ কিমি। এর মধ্যে পাকা ৩৪৩ কিমি। কাঁচা রাস্তা ৬৭৮ কিমি আর অন্যান্য ৮ কিমি। কাঁচা রাস্তাগুলো অবস্থা তেমন ভালো না।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, মাইলের পর মাইল রাস্তা কাঁচা। রাস্তার উভয়পাশে হাজারো বসতবাড়ি। উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগের ভরসা এসব কাঁচা রাস্তা। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাগুলো কাদা আর পানিতে একাকার হয়ে যায়। ফলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ পথচারীদের যাতায়াত দুষ্কর হয়ে পড়েছে। রাস্তা খারাপ হওয়ায় কোনো জরুরি রোগী বা অন্তঃসত্ত্বা নারীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স বা অটোরিকশা প্রবেশ করতে চায় না। অথচ সরকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এডিপির আওতায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করেন। বরাদ্দের অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় করা হয় না বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে গ্রামীণ রাস্তাঘাট সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি বড় অংশ এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) ও অন্যান্য খাত থেকে উপজেলা পরিষদ থেকে বিলাসী খাতে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদ রংকরণ তথা সংস্কারে ৩০ লাখ, সীমানা প্রাচীর সংস্কার তথা নির্মাণে ৩ লাখ, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের রান্নাঘর সংস্কার ও স্ট্যান্ড নির্মাণ ৩ লাখ, ইউএনও’র বাড়ির চারদিকে হাঁটার রাস্তা নির্মাণ ৩ লাখ, ইউএনও’র বাসার অফিস সজ্জিতকরণ ৩ লাখ, উপজেলা পরিষদে এমপি’র অফিস সাজসজ্জাকরণে ৬ লাখ, উপজেলা পরিষদের পুকুর পাড় সৈন্দর্যবর্ধনে সাড়ে ৯ লাখসহ নানা বিলাসী কাজে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। টিআর সাধারণ এবং বিশেষ প্রকল্পেরও বেশির ভাগ গ্রহণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উন্নয়নে। সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদে গৃহীত বেশির ভাগ প্রকল্প পিইসির মাধ্যমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে সরকারি অর্থের নয়ছয় করা হয়েছে। যেখানে গ্রামীণ সড়কের টেকসই সংস্কার করা বেশি জরুরি ছিল, সেখানে প্রশাসনের এমন বিলাসী খরচকে ‘অর্থের অপচয়’ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

উপজেলার বহড়া গ্রামের মকসেদ আলী জানান, ভোটের সময় সবাই রাস্তা পাকা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। নির্বাচনের পর আর তেমন খোঁজ রাখে না। বর্ষা এলেই পটুয়াপাড়া-বহড়া সড়কসহ বেশ কিছু কাঁচা রাস্তা কাদা-পানিতে ভরে যায়। সেদিকে জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন নজর রাখে না।

পাটুয়াপাড়া গ্রামের নবাব বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে কাঁচা রাস্তাগুলোর তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। বর্ষা এলেই বাড়ি থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে যায়। অন্তার খালের পশ্চিম পাড় দিয়ে একটি পাকা রাস্তা বহু বছরের দাবি।

আবু সায়েম বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তৃণমূলের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। কিন্তু গ্রামীণ রাস্তাঘাট অবহেলিত রেখে উপজেলা পরিষদের সৌন্দর্যবর্ধন কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।

হাজীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন বলেন, চাহিদা বেশি। বরাদ্দ কম। এজন্য রাস্তার গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রকল্প নেওয়া হয়। সব রাস্তা একবারে ঠিক করা সম্ভব হয় না।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মাইদুল ইসলাম বলেন, গ্রামীণ রাস্তাগুলো পর্যায়ক্রমে পাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার কারণে সব রাস্তা একসঙ্গে করা সম্ভব হচ্ছে না। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের মাধ্যমে ২০০ কিমি রাস্তা পাকাকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার জানান, উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কিছু সংস্কার কাজ করা হয়েছে। তবে গ্রামীণ সড়কগুলোর সমস্যা সমাধানে কিছু প্রকল্পও চলমান রয়েছে। আরো নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, যাতে জনগণের ভোগান্তি কমে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়