মেহেদী হাসান

  ২ ঘণ্টা আগে

ন্যাশনাল গ্রিন মিশন শুরু আছে নানা চ্যালেঞ্জ

আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মেগা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গতকাল শনিবার কক্সবাজারে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন সরকারের অর্থমন্ত্রী।

সড়ক ও উপকূলীয় চরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির প্রকৃতি এবং ধরন বিবেচনায় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হবে। অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বনভূমি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণের খালি জায়গা। সরকারের প্রত্যাশা সবুজে ছেয়ে যাবে দেশ। পরিবেশবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, তা বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। সঙ্গে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে আসছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৯৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৩ হাজার ৭২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার, ৪ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭৬ হাজার এবং বসতবাড়ি বনায়নে ৫৬ লাখ চারা রোপণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে কার্বন ট্রেডিং কার্যক্রমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান বলেন, বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর লাখো গাছের চারা রোপণ করা হয়, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব গাছ টিকে থাকে না। গাছ লাগানো সহজ হলেও তা বড় করে তোলা কঠিন। বেশিরভাগ প্রকল্পে ভুল প্রজাতি নির্বাচন, পরিচর্যার অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। ফলে কাগজে-কলমে সাফল্য থাকলেও প্রকৃত পরিবেশে কোনো পরিবর্তন আসে না। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণকে শুধু সংখ্যার প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে হবে না। প্রয়োজন একটি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসম্পৃক্ততা। কোন অঞ্চলে কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে, সে বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা করতে হবে। দেশীয় প্রজাতির গাছ; বিশেষ করে ফলদ গাছকে অগ্রাধিকার দিলে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হবে।

কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মৃত্যুঞ্জয় রায় বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের আমলে যেসব বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে সে পরিসংখ্যান দেখি, তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে তার কত শতাংশ গাছ টিকে আছে। টিকে যে নেই তার বড় প্রমাণ হলো, দেশে বনভূমি বাড়েনি,

গ্রামীণ বনও কমছে, রাস্তার ধারে কিছু গাছপালা লাগানো হয়েছে, তবে তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এমনকি সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় লাগানো গাছগুলোর অনেক গাছই স্থানীয় অংশগ্রহণকারী উপকারভোগীদের উপযুক্ত পরিচর্যা ও সুরক্ষা না পেয়ে মরে গেছে অথবা লোভের কারণে ধ্বংস হয়েছে। বনভূমি দখল, বনের গাছ কাটা, নগর সম্প্রসারণ, ব্যাপক হারে বসতবাড়ি ও কলকারখানা এবং রাস্তাঘাট নির্মাণ, নদীভাঙন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে প্রতি বছর দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে গাছ উজাড় হচ্ছে।

একদিকে রোপিত গাছ টিকে না থাকা; অন্যদিকে বড় হয়ে ওঠা গাছগুলো কেটে ফেলা- এ দুটি প্রধান বাস্তবতায় দিন দিন দেশের সবুজ কমছে। ২০১৫ সালে জাতীয় বন জরিপে সে তথ্য উঠে এসেছে। সে সময় দেশে বন আচ্ছাদিত জমির পরিমাণ ছিল যেখানে ১২.৭৬ শতাংশ, সেখানে বর্তমানে তা কমে হয়েছে ১২.১১ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বনভূমি কমেছে দেশের পার্বত্যাঞ্চলে। রাঙামাটিতেই কমেছে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি। শুধু বনভূমির হিসাব কষলেই হবে না, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের গাছপালার বর্তমান অবস্থাও জানতে হবে। এরপর ঠিক করতে হবে সেসব জায়গার কোথায় কোন গাছ, কতটা গাছ লাগাতে হবে। এজন্য সার্বিক অবস্থা, সুযোগ ও সক্ষমতা বিবেচনা করে পরিকল্পনা করতে হবে। বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভালো হবে। পদক্ষেপগুলোকে সাজাতে হবে পাঁচটি প্রধান কার্যক্রমে-বাস্তব সমীক্ষা, পরিকল্পনা গ্রহণ, সক্ষমতা উন্নয়ন, কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও মনিটরিং বা পরিবীক্ষণ।

দেশের কোন অঞ্চলের কোথায় বর্তমানে কতটুকু বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা এবং কী কী গাছপালা রয়েছে, তার একটি সমীক্ষা দরকার। বৃক্ষরোপণের আগে সেসব অঞ্চলের ভৌগোলিক ও মৃত্তিকা বৈচিত্র্য, পরিবেশগত চাহিদা ইত্যাদি বিষয় মাথায় রেখে সমীক্ষায় দেখা উচিত যে কোন কোন গাছ সে স্থানের জন্য বেশি উপযুক্ত। স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য যেসব গাছ ভালো, সেগুলোকে তালিকায় রাখতে হবে। বৃক্ষরোপণে সংখ্যার চেয়ে প্রজাতিগত বৈচিত্র্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো এলাকায় গাছ লাগানোর আগে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি কার্যকর সমীক্ষার কাজ মাঠে নামার আগে করতে হবে। স্পষ্টভাবে বৃক্ষরোপণের জন্য এলাকা বা অঞ্চলভিত্তিক ম্যাপিং করতে হবে। অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় গাছ লাগানোর আগে চিহ্নিত করতে হবে বসতবাড়ি, রাস্তা, রেলপথের ধার, চর, বনভূমি, শিক্ষা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আঙিনা, উপকূল, নদী ও খালের তীরবর্তী ভূমি, খাস পতিত জমি, পাহাড়, পার্ক ইত্যাদি।

বন অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিদেশি প্রজাতির পরিবর্তে দেশীয় দ্রুতবর্ধনশীল মেহগনি, গামার, জারুল, জীবন, কদম, আগর ও বাঁশগাছ রোপণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন অধিদপ্তর। এছাড়া অগ্রাধিকার পাচ্ছে শিলকড়ই, জাম, মহুয়া, বহেরা, অর্জুন, নিম, হরীতকী, কাঁঠাল ও চালতা। উপকূলীয় এলাকায় লাগানো হবে ঝাউ। আর সুন্দরবন এলাকায় রোপণ করা হবে সুন্দরী, গেওয়া, বাইন ও গরানগাছ। বিশ্লেষক ও পরিবেশবিদদের মতে, এদেশে চার শতাধিক প্রজাতির বিপন্ন ও দুর্লভ উদ্ভিদ প্রজাতি রয়েছে। বৃক্ষরোপণে এসব প্রজাতি রোপণে গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো লাগিয়ে সুরক্ষিত রাখার সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল।

দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি একটি করে বোটানিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা যায় ও সেসব গার্ডেনে যদি সে অঞ্চলের উপযোগী বিপন্ন উদ্ভিদগুলো লাগানোর ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে বিপন্নতার হাত থেকে গাছগুলো রেহাই পাবে। এরই মধ্যে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং আইইউসিএন বাংলাদেশ ১ হাজার প্রজাতির গাছের একটি রেড ডাটা বই প্রকাশ করেছে। এ বইয়ে ৩৭৫ প্রজাতির গাছকে বিপন্ন উদ্ভিদ হিসেবে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে, ৫৪ প্রজাতির আছে সংরক্ষিত উদ্ভিদ। এ ব্যাপারে সেটির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তাহলে অন্তত এসব প্রজাতির গাছ রক্ষা পাবে। জাতীয় উদ্ভিদ উদযানসহ দেশের ৫৪টি সংরক্ষিত বনে কয়েক লাখ গাছ লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এসব স্থানে গাছ লাগানোর বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। সেভাবে বিভিন্ন পার্কেও সুযোগ অনুযায়ী খালি জায়গায় গাছ লাগানো যায়।

বন্য প্রাণী ও বনবিশেষজ্ঞ রেজা খান বলেন, দেশীয় প্রজাতির গাছ দিয়েই এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা দরকার। একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, কাঠ উৎপাদনের জন্য এ বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে না। এর মূল উদ্দেশ্য পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। দেশীয় প্রজাতির গাছ ছাড়া সেই উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব নয়। এক জায়গায় অতিরিক্ত গাছ রোপণ করলে পানির ওপর চাপ পড়তে পারে। গাছের পানির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কৃষিজমির পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোন অঞ্চলে গাছ কমে গেছে, সেই উপাত্ত সংগ্রহ করে গাছ রোপণ করতে হবে। এজন্য মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও প্রাণিবিদদের সমন্বয়ে সরকারের একটি কমিটি গঠন করে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ভিভিআইপিদের বৃক্ষরোপণের জন্য যেসব দেশীয় বৃক্ষ তালিকায় থাকতে পারে তা হলো- পলাশ, শিমুল, উদাল, সোনালু, গর্জন, শাল, ছাতিম, তেলসুর, বৈলাম, সিভিট, পারুল, তুন, রক্তন, স্বর্ণচাঁপা, কাঞ্চন, কুরচি, চালতা, তেতুল, বনাক, নিম, আউয়াল, গান্ধিগজারি, কুটিকদম, কদম ইত্যাদি। এছাড়া বিদেশি গাছ সরকারের গ্রিন কর্মসূচিতে রাখা যাবে না। নার্সারি থেকেই এটি মনিটরিং করতে হবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়