শামশুল আলম শ্রাবণ ও নাজমুল সোহেল, কক্সবাজার
কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার
আজীবন দেশ গড়ার কাজ করে যাব
* পাতলী খাল পুনর্খননের উদ্বোধন * ৫ বছরে ২৩ হাজার খাল খননের লক্ষ্য * ৬০ পণ্যে কর প্রত্যাহারের দাবি * বাজেট নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা * ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক পরিদর্শন

মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে কক্সবাজারের পিএমখালীতে ঐতিহাসিক পাতলী খাল পুনর্খননকাজের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধন শেষে স্থানীয় জনগণের সমাবেশে তিনি বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করাই তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য এবং শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করে যাবেন। জনগণের সমর্থনই আমাদের শক্তি। যতক্ষণ প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাব। এ সময় তিনি সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। আগামী ৫ বছরে ২৩ হাজার খাল পুনর্খননের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, দেশের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থে কর কমানো ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ার পরও বিরোধীরা বাজেটের বিরোধিতা করছে।
গতকাল শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পৌঁছান। সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে তিনি সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে খাল পুনর্খননকাজের উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানও ছিলেন বলে জানান তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে পিএমখালীতে যান প্রধানমন্ত্রী। বৃষ্টির মধ্যেই কোদাল দিয়ে পাতলী খাল পুনর্খননকাজ শুরু করেন। পরে তিনি খালের পাড়ে একটি খেজুরগাছের চারা লাগান। পুনর্খনন উপলক্ষে খালের পাড়ে পাতলী গ্রামবাসীরা জড়ো হন। তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেখতে সকাল থেকে বৃষ্টির মধ্যেই অপেক্ষায় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসী তাকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। তারা প্রধানমন্ত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম বলে স্লোগান দেন।
পিএমখালী ইউনিয়নের পাতলী খাল পুনর্খননকাজ শুরুর পরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিএনপি জনগণের জন্য রাজনীতি করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির সব ক্ষমতার উৎস হচ্ছে জনগণ। আর বিএনপি সরকার দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে চায়। তিনি বলেন, খবরের কাগজগুলোয় দেখলাম, এবারের বাজেটের পরে এখন পর্যন্ত কোন জিনিসের দাম বাড়েনি। কারণ চাল, ডাল, তেল, নুনসহ সব প্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর যে ট্যাক্স ছিল বর্তমান সরকার এ দুদিন আগের বাজেটে ৬০টি পণ্যের ওপর থেকে তা তুলে নিয়েছে। যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম না বাড়ে। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই- দেশের মানুষ যাতে ভালো থাকতে পারে। দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে বিরোধী দল প্রস্তাবিত বাজেটের বিরোধিতা করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল বলছে যে, এই গণবিরোধী বাজেট তারা মানে না।
উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আপনাদের কাছে আমি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, যেই বাজেটে ট্যাক্স কমানো হয় সেই বাজেটও বিরোধী দল মানে না। যেই বাজেটে মদের দাম বাড়ানো হয়, যেই বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হয়, সেই বাজেটও বিরোধী দলের পছন্দ নয়। তাহলে এবার বিরোধী দলের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন? তারেক রহমান বলেন, বিরোধী দলের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয়। তাদের উদ্দেশ্য একটাই- সেটা হচ্ছে দেশের মধ্যে অস্থিতিশীতা ও অশান্তি তৈরি করা, মানুষকে বিভ্রান্ত করা। বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত জনগণের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, এখানে কেনো এসেছি বলেন তো? পাতলী খাল পুনর্খননকাজের উদ্বোধন করতে। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে এ খাল খনন করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এ খাল খননের ফলে ৪০ হাজার মানুষের উপকার হবে। উপকৃত হবে সাড়ে ৮ হাজার কৃষক। এ কারণে আমারা আগামী ৫ বছরে ২৩ হাজার খাল খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কিন্তু কৃষির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শিল্প-বাণিজ্যেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি ঘটলে আমাদের সন্তানদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারবে। এ কারণে যেসব দ্রব্য দেশে উৎপাদিত হয় অথচ একই জিনিস যেগুলো বিদেশ থেকে আসে, সেগুলোর ওপর আমরা ট্যাক্স বাড়িয়েছি। যাতে করে দেশে উৎপাদিত দ্রব্যটি যারা উৎপাদন করে, সেই শিল্প কারখানাটি সাপোর্ট পায়, তার ব্যবস্থা আমরা এ বাজেটের মধ্যে রেখেছি। এটিও বিরোধী দলের পছন্দ নয়। তিনি বলেন, আমি বলতে চাই, এদেশের মালিক আপনারা। দেশের মালিক কোন রাজনৈতিক দল নয়, দেশের মালিক কোন পরিবার নয়, দেশের মালিক হচ্ছে বাংলাদেশের ২০ কোটি জনগণ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ আমাদের সকলের। এদেশই আমাদের প্রথম ঠিকানা, এদেশই আমাদের শেষ ঠিকানা। সেজন্যই আমরা বলি এদেশকে গড়লে আমরাই ভালো থাকব, আমাদের সন্তানরাই শান্তিতে থাকতে পারবে। তিনি বলেন, এদেশকে যদি আমরা গড়তে না পারি, তাহলে আমাদের সন্তানরা দুঃখ কষ্টে থাকবে। কেউ কি চায় নিজের সন্তান কষ্টে থাকুক? কেউ আমরা চাই না। সেজন্যই আমরা একটি কথাই বলি, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী মুষল বৃষ্টির মধ্যেই ফ্লাইট থেকে নেমে সড়কপথে পিএমখালীতে আসেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই নিজের হাতে কোদাল দিয়ে পাতলী খাল পুনর্খননকাজের উদ্বোধন করেন তিনি। পরে প্রধানমন্ত্রী খালের পাড়ে একটি খেজুর গাছের চারা রোপণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক পরিদর্শন করেছেন। পিএমখালী ইউনিয়নের পাতলী খালের পুনর্খননকাজের উদ্বোধন শেষে ডুলাহাজরা সাফারি পার্ক পরিদর্শনে আসেন। সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। তারা পার্কের ভেতরের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী খুবই উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এ সময় সাফারি পার্কের মূল ফটকের সামনে একটি নাগলিঙ্গম গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি সাফারি পার্কের স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। একইসঙ্গে স্মারক বইয়ে স্বাক্ষর করেন ডা. জুবাইদা রহমানও।
এর আগে ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার বিমানবন্দরে নেমে মুষল বৃষ্টির মধ্যে নিজেই গাড়ি চালিয়ে খাল খনন কর্মসূচির স্থলে যান। পাশের আসনে বসান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। এরপর সেখান থেকে আবারও নিজে গাড়ি চালিয়ে ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় রাস্তাজুড়ে হাজার হাজার স্থানীয় সাধারণ জনগণ এবং দলীয় নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফুল ছিটিয়ে ও হাত নেড়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং স্লোগান দিতে থাকেন।
দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত কক্সবাজারে বহু পর্যটক গেলেও জেলার অন্যতম আকর্ষণ এ সাফারি পার্ক। এটি দেশের প্রথম সাফারি পার্ক। পাহাড়, বন, জলাধার আর উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণকারী শত শত প্রাণী নিয়ে গড়ে উঠেছে এ অনন্য বন্য প্রাণীর জগৎ। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজরায় অবস্থিত পার্কটি। চট্টগ্রাম শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১০৭ কিলোমিটার। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার। এ সাফারি পার্কের যাত্রা শুরু ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে। তখন ৪২.৫ হেক্টর বনভূমি নিয়ে এখানে একটি হরিণ প্রজননকেন্দ্র গড়ে তোলে বন বিভাগ। পরে দেশের প্রথম সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৪৮ বছর আগে ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান পিএমখালীতে এসে কোদাল দিয়ে পাতলী খাল খননকাজের সূচনা করেছিলেন। সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি খালের পারে একটি খেজুরগাছও রোপণ করেন। গাছটি এখনো আছে। এ খাল পুনর্খননে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ উপকৃত হবে বলে জানান পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় প্রকৌশলীরা। সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান, স্থানীয় বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ প্রমুখ বক্তব্য দেন। সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজার সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল মাবুদ।
"









































