পর্যবেক্ষণ

আরব বিভাজন ও নতুন মেরুতে মধ্যপ্রাচ্য

আবুল খায়ের সুমন

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

আরব বিশ্ব যে নতুন মেরুতে চলে গেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সৌদি জোট এখন প্রকাশ্যেই তার বন্ধুরাষ্ট্র নিয়ে কূটনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সমীকরণ যে এক দিনেই ঘটেছে, তা কিন্তু নয়। ২০১৭ সালের জুনে উপসাগরীয় দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে সৌদি আরব, মিসর, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ ও মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো বিরোধী রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ এনে কাতারের ওপর স্থল, নৌ ও আকাশপথে অবরোধ আরোপ করে দেশ চারটি। ঘটনার প্রবহমান ধারা বইতে শুরু করে তখন থেকেই। সৌদি জোটের কর্মতৎপরতা এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বিশ্ববাসী তখন জানতে পারে। কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের পর তা প্রত্যাহারে ১৩টি শর্ত দেয় দেশ চারটি। এসব শর্তের মধ্যে ছিল আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক বন্ধ, তুর্কি বাহিনী বহিষ্কার, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ। কাতার এই শর্ত মানবে না সৌদিজোট। বিষয়টি সবার কাছেই পরিষ্কার ছিল। ইয়েমেনে বাব-এল-মান্দেবকে কেন্দ্র করে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ এখনো চলমান। ওদিকে তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়াও নতুন এক বলয় তৈরির পথে হাঁটছে। সৌদি রাজপরিবারের জন্য তা অশনিসংকেত। তাছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত কিছু সৌদি ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক ‘ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি পার্টি’ গঠন করে সৌদি রাজপরিবারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। এর আগে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে বিরোধী দল গঠনের প্রচেষ্টা হয়েছিল। সৌদি আরব প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্কে জড়াবে না, এটা স্পষ্ট। তবে সৌদি আরব তার বিপদে ইসরায়েলের সহায়তা পাবে, এটাও ঠিক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় গত ১৩ আগস্ট মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে; যাকে দুই দেশের প্রধানরা ‘ঐতিহাসিক অগ্রগতি’ বলে মনে করছেন। যদিও ইসরায়েলি সরকার বলছে, পশ্চিমতীর সংযুক্ত করার পরিকল্পনা তারা বাদ দিচ্ছে না, স্থগিত রাখছে মাত্র। বিগত বছরগুলোতে ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রনীতির দিকে তাকালে দেখি ইয়েমেনে এর ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ, লিবিয়ায় ছায়াযুদ্ধ, তিউনিসিয়া, তুরস্ক এবং কাতারের প্রতি তার অস্থিতিশীল নীতি এবং সিরিয়ার বাশার আল আসাদ ও মিসরের আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির মতো আঞ্চলিক স্বৈরশাসকের পক্ষে সমর্থন। দেশটির এসব নীতি সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। ক্ষুদ্র এই ধনী দেশটি আসলে কী চায়। এ বছর দেশটি মঙ্গলগ্রহে রকেট পাঠিয়েছে। বিতর্কের তোয়াক্কা না করে আরবদের চিরশত্রু ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। যেভাবে করোনাভাইরাস সামলেছে, তা নিয়েও প্রশংসিত হচ্ছে দেশটি। যদিও সমালোচকরা এ ক্ষেত্রে সৌদি প্রভাবকে বড় করে দেখিয়ে থাকেন তবু মধ্যপ্রাচ্যে যে এক নতুন ভূরাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়েছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

আরব দেশগুলোর মধ্যে এখন যে বিভক্তি এবং বিরোধ, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে আর দেখা যায়নি। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কয়েকটি অলিখিত জোটে তারা ভাগ হয়ে গেছে। একটি ব্লকে সৌদি আরবের সঙ্গে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন; অন্যদিকে ইরান-ইরাক-সিরিয়া; আবার কাতার যোগ দিয়েছে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দ্বিধাবিভক্তির অবস্থানকে কাজে লাগাচ্ছে ইসরায়েল। মিসর ও জর্ডানের মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে। তবু দেশ দুটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চুক্তি করেছে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের পক্ষে হোয়াইট হাউসের বর্তমান প্রশাসনের পুরোপুরি একপেশে আচরণ করে চলেছে। ফিলিস্তিনিরা এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় আছে। আরব দুনিয়ায় তাদের এখন মিত্রের সংখ্যা কমছে এবং দুর্দিনে অভিযোগ জানানো বন্ধুর সংখ্যাও কমছে।

ইব্রাহিম শান্তি-ঐক্য চুক্তি নামে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের ভেতর যে সমঝোতা হয়; তার দিকে নজর দিলে দেখতে পাই যে, সেখানে বারবার একটি শব্দের পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে। আর সেটা হলো, ‘সম্পর্কের সম্পূর্ণ স্বাভাবীকরণ’। এই ঘটনা ২০ বছর আগে ঘটলেও আরব বিশ্বে যেরকম প্রতিক্রিয়া হতো, এখন তা হচ্ছে না। কারণটা আমরা কম বেশি জানি। চুক্তিতে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে। শান্তি, কূটনীতি, পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বিবৃত হয়েছে। তবে চুক্তির শুরুতে অনুমোদন দিয়ে বলা হচ্ছে যে, আরব এবং ইহুদিরা একই পূর্বপুরুষের অংশ এবং ইব্রাহিম থেকে উৎসারিত। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম ইহুদি এবং খ্রিস্টান ইব্রাহিমীয় অস্তিত্বে বিদ্যমান বিষয়গুলোর ওপর এবং তাদের জাতীয়তাবাদ, পারস্পরিক সহযোগিতা, বিশ্বাস, পারস্পরিক সম্মান এবং নিজস্ব অস্তিত্বে জোর দেবে। দূতাবাস স্থাপনের বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক আইন মেনে চুক্তি স্বাক্ষরের পরেই স্থায়ী অ্যাম্বাসেডর নিয়োগ বিনিময় হবে। সামনের দিনগুলোতে ইসরায়েলের এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিদল নিয়মিত মিলিত হবে নানা বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করতে। এরমধ্যে বিনিয়োগ, পর্যটন, দুদেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট, নিরাপত্তা, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ কিছুই বাদ যাবে না। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত বলছে, একটি আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্পর্কের বিনিময়ে ইসরায়েল পশ্চিমতীরের যেসব ফিলিস্তিনি এলাকা তার সীমানায় ঢোকানোর পরিকল্পনা করছিল, তা আপাতত স্থগিত রাখবে। এই শব্দগুলো কি শুধুই ফাঁকা বুলি? আমাদের বুঝতে হলে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

বিশ্লেষকরা যে যাই বলুক, দেশগুলোকে যে সৌদি আরব চালিত করছে, এ ব্যাপারে অনেকেই প্রকাশ্য কথা বলতে শুরু করেছেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের সঙ্গে গোপন সম্পর্কের কারণ কী? প্রশ্নের উত্তরটা কয়েক বছর আগেও ধোঁয়াশাপূর্ণ ছিল। তবে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এমনভাবে বদলে গেছে যে, সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের রহস্য এখন আর কারোরই অজানা বিষয় নয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ক্রমশ সৌদি আরবের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও শক্তি মোকাবিলায় ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের এক ধরনের সখ্য গড়ে উঠেছে। ইসরায়েলি চিফ অব স্টাফ জেনারেল যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি সংবাদপত্রকে একবার বলেছিলেন, ইরানকে মোকাবিলায় তার দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য প্রস্তুত রয়েছে এবং তিনি আরো বলেন, আমাদের মধ্যে স্বার্থের মিল রয়েছে ইরানি চক্র মোকাবিলার ব্যাপারে, আর এ ব্যাপারে আমরা সৌদি আরবের সঙ্গে আছি। এসব কথা যে শুধু কথার কথা নয়, পরবর্তীতে তাদের কার্যক্রমই আমাদের বলে দেয়। তাছাড়া তুরস্কের নব-উত্থানেও চিন্তিত সৌদি রাজপরিবার।

মধ্যপ্রাচ্যের এই দ্বিধাবিভক্তিতে লাভক্ষতির খতিয়ান টানলে ইসরায়েলের চাওয়া-পাওয়াগুলো বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি শোনা যাচ্ছে আরো কয়েকটি আরব কিংবা মুসলিম রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। ইসরায়েল লেবাননেরও বিভক্তি চায়। পার্শ্ববর্তী এই দেশটিতে বারবার হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। নিজ দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলিমকে ঠেলে দিয়েছে লেবাননে। ইসরায়েল তার চলার পথে সব সময় আমেরিকাকে পাশে পেয়েছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় বসার পর ইসরায়েলের পক্ষেই বেশি কাজ করেছেন। কোনো পক্ষকেই স্বীকৃতি না দেওয়ার মার্কিননীতি থেকে তিনি বেরিয়ে এসে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতায় সৌদি আরব তার রাজপরিবারকে খুব সচেতনভাবেই ক্ষমতার শীর্ষে রাখতে চায়। এ ক্ষেত্রে সৌদি সরকার যেকোনো শক্তির সঙ্গে হাত মেলাবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই মেরূকরণে ফিলিস্তিনিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং হবে। অপরদিকে ইসরায়েল লাভবান হবে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আগামী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাদের সাম্প্রতিক কার্যকলাপের ডানা মেলে ধরবেন এবং অতীত সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তারা নিশ্চিত লাভবান হবেন। তাই আরব বিভাজন ও নতুন মেরুর মধ্যপ্রাচ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন ভূখন্ডের আশা স্বপ্নই রয়ে যাবে এবং আরো ফুলে ফেঁপে উঠবে ইসরায়েল। তবে এটাই শেষ কথা নয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"