reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১২ জুলাই, ২০২১

কিশোর গ্যাং রোধে শিক্ষার্থীদের ভাবনা

বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে কিশোর গ্যাং একটি আতঙ্ক। করোনার মতোই এ সমস্যা যেন মহামারি আকার ধারণ করছে। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই বিভিন্ন কিশোর অপরাধের খবর চোখের সামনে ভেসে আসে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪ কোটি শিশু-কিশোর। এদের মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ শিশু-কিশোর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। আর এ শিশুরা সহজে নিজেদের বিভিন্ন অপরাধমলূক কাজে জড়িয়ে নিয়েছে। কিশোর অপরাধকে এভাবে বাড়তে দেওয়া যায় না, কেননা তারা আমাদের আগামী ভবিষ্যৎ। কীভাবে কিশোর গ্যাং রোধ করা যায় এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। কিশোর গ্যাং রোধে কী ভাবছেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা? এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সাইফুল মিয়া

‘খেলাধুলা ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা প্রয়োজন’

কিশোর গ্যাং সমস্যা আগেও ছিল, বর্তমানেও আছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে হত্যা, ছিনতাই, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধ। এসব কিশোর গ্যাং রাজনৈতিক ক্যাডারদের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে। তারা নিজেদের প্রভাব, প্রতিপত্তি, আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন নামে গ্যাং তৈরি করে চলেছে। মূলত এসব কিশোর নিজেদের প্রটেক্ট করার জন্য এসব গ্যাং গড়ে তুলছে। এসব গ্যাং তৈরির অল্প কিছুদিন পরেই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হত্যাকান্ডের মতো নৃশংস ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। ২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং সমস্যা প্রকাশ্যে আসে। এসব কিশোর গ্যাং নির্মূলে এগিয়ে আসতে হবে পরিবার ও রাষ্ট্রকে। পরিবার থেকে বিশেষ নজর রাখতে হবে আমদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে। পাশাপাশি অভিভাবক হিসেবে তাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। তাদের খেলাধুলা ও সুস্থ সংস্কৃতির চর্চার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে হবে। এতে করে তারা অহেতুক কোনো বাজে চিন্তার সুযোগ পাবে না। সর্বোপরি এসব কিশোর গ্যাং রুখতে পরিবারিক ও সামাজিকভাবে আমদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।

রায়হান বাদশা রিপন

আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

‘প্রশাসনের তদারকি বাড়াতে হবে’

বিশেষ ধরনের অস্বাভাবিক, সমাজবিরোধী কাজ যা কিশোর-কিশোরীদের দ্বারা সংঘটিত হয়, তা-ই কিশোর অপরাধ। এদের বয়সসীমা ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হয়। এদের নিয়ে গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ ছোট বড় এক একটি দলই কিশোর গ্যাং। কিশোর বয়সে একটা হিরোইজম চিন্তাভাবনা থেকেই দুর্ধর্ষ গ্যাং কালচারটা গড়ে উঠে। কিশোরদের যে সময়ে নিজের জীবন গড়ার কথা, সে বয়সে তারা জড়িয়ে পড়ছে খুনের মতো নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ে। আধুনিক বিশ্বের অসংগঠিত সমাজব্যবস্থায় দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণের নেতিবাচকতা, পরিবার কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন, শহর ও বস্তির ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ এবং জীবনে বিরাজমান নৈরাজ্য ও হতাশা, পারিবারিক সমস্যা, অপসংস্কৃতি কিশোর অপরাধীদের বৃদ্ধির কারণ। যেহেতু তারাই জাতির ভবিষ্যৎ; তাই এদের প্রতি আমাদের বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এই গ্যাং কালচার বিস্তার রোধে সর্বপ্রথম কিশোরদের সুষ্ঠু আবেগীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে যত্নবান হতে হবে। সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশু-কিশোরদের জন্য সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে পিতামাতাকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসন ও আইনের কঠোর প্রয়োগই কিশোর গ্যাং রোধে করণীয়। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সন্তানের ভালো লাগা মন্দ লাগাকে বিচার, পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করা। তৃতীয়ত দেশে পর্যাপ্ত কিশোর অপরাধ সংশোধন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমগুলো শিশুর মানসিক বিকাশের উপযোগী কার্যক্রম, কাউন্সেলিং ও অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে। সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্বচ্ছ, কঠোর হস্তক্ষেপ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

জান্নাতুল নাঈম শাহরিন

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

‘কিশোর গ্যাং রোধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি’

২০১৭ সালের আদনান কবির হত্যার পর ‘গ্যাং কালচারের’ বিষয়টি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। এরপর এসব গ্রুপের ব্যাপ্তি বেড়েছে। ১৫-২০ বছর বয়সি কিশোরদের ১০ থেকে ২০ জন করে গ্রুপ হয় তারা। বিশ্লেষকদের মতে, কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা আগেও ছিল, এখনো আছে। আগে তারা বখাটেপনা বা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এসবেই সীমাবদ্ধ থাকত। এখন হত্যাকা-ের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। যার সবচেয়ে বড় কারণ পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ না থাকা। সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও মৃতপ্রায় বলে যা আরো দ্রুতই বাড়ছে। যাকে উদ্বেগের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা। এসব অপরাধ তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ওয়াটসঅ্যাপ কিংবা অন্যান্য মাধ্যমের ব্যবহার করে সহজে সক্রিয়তা পাচ্ছে। এতে গ্যাং সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বিষয়টি যেমন সহজতর, তেমনি নেই নজরদারির ভয়। আর এর দমন কিংবা সমাধানে চাই সম্মিলিত প্রচেষ্টা। পারিবারিকভাবে অভিভাবকদের শিশু-কিশোরদের নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষায় সন্তানদের শিক্ষিত করতে হবে। রাজনৈতিক বড় ভাই কিংবা দলের উচিত হবে শিশু-কিশোরদের প্রশ্রয় না দেওয়া, ২০ বছরের কম হলে রাজনীতির আশপাশে আসতে না দেওয়া। ছাত্র সংগঠন বা নেতৃত্বের বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুক্ত না থাকা ছেলেদেরও ২৯ বছর না হওয়া পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আনতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকহীন শিশু-কিশোর ও পথশিশুদের প্রশাসনিক ও স্থানীয়ভাবে জনপ্রতিনিধিদের দেখাশোনা করা এবং যথার্থ শিক্ষার আওতায় আনা। এ ছাড়া সামাজিকভাবে একটা শক্ত নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা। শহর, গ্রাম সবখানে আজকাল শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ ও খোলা জায়গা সংকোচিত হচ্ছে। যার প্রভাব এদের গ্যাং কালচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করতে সহায়ক। তাই শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও অবসর সময় কাটানোর মতো খেলার মাঠ ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পারে আজকের শিশু আগামী দিনের সোনার সন্তান ও জাতির সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে।

মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন

শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

‘প্রয়োজন সর্বস্তরের সচেতনতা’

দেশব্যাপী কিশোর অপরাধীদের উৎপাত ও বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধমূলক কর্মকা- দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কীভাবে বাড়ন্ত বয়সের এই তরুণরা এসব আত্মঘাতী গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে? কেনইবা জড়াচ্ছে? আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসন কতটা ভাবছে এদের সংশোধন নিয়ে? এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুধু রাজধানীতেই ভয়ংকর কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৭৮, যেখানে ২ হাজারের বেশি সদস্য সংখ্যা বিদ্যমান। এসব গ্যাংয়ের অনেকেই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবস্থান করে। আবার কেউ কেউ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুচর হিসেবে কাজ করে। বই, খাতা, কলম ছেড়ে হাতে তুলে নিচ্ছে মাদক ও নানা ধরনের দেশি-বিদেশি অস্ত্র। ছোট ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে মারামারি, চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে ডাকাতি, ইভটিজিং, মাদক সেবন, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও খুনের সঙ্গে রয়েছে তাদের নিবিড় সম্পর্ক। এক জরিপে দেখা যায়, হতদরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়ে যারা

নানাভাবে বঞ্চিত তাদের অনেকে উচ্চাকাক্সক্ষা ও হতাশা থেকে বিভিন্ন রকম অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে। বাড়ন্ত বয়সে সঙ্গদোষে অনেকেই বিপৎগামী হয়ে অজান্তেই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে যাচ্ছে। এ বয়সে অধিক কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে কেউ কেউ ডন হয়ে উঠছে। অপসংস্কৃতির চর্চাও এসব গ্যাং তৈরির কারণ হতে পারে। এ ছাড়াও পারিবারিক অশান্তি, একাকিত্ব এসবও গ্যাং হয়ে ওঠার পেছনে কাজ করে। তাই কিশোর গ্যাং রোধে পরিবার, সমাজ এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা ও সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। শিশুদের মানসিক বিকাশের সময়টাতে ধর্মচর্চা ও নীতিনৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। সর্বোপরি প্রতিটি জনগণের সচেতন অবস্থানই কিশোর গ্যাং রোধে ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে।

নাঈমা আক্তার রিতা

শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

‘পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে’

মানুষ জন্মগতভাবে প্রাণী মাত্র। মানুষ হওয়ার জন্য তাকে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয়। একটি শিশু বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার পরিবেশ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে থাকে। উপযুক্ত পরিবেশ শিশুর মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। যখন একটি শিশু তার শৈশব থেকে কৈশোরে পা বাড়ায়, তখন সে আবেগপ্রবণ ও কৌতূহলী থাকে। এই কৌতূহল থেকে সে নতুন কিছু করার চেষ্টা করে এবং সমাজে নিজের একটা অবস্থান সৃষ্টি করতে চায়। সমাজের বেশির ভাগ মানুষই কর্মব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে কিশোর-কিশোরীদের এসব বিষয়ে ধারণা রাখে না এবং গুরুত্বহীন মনে করে। একদিকে নিজের অবস্থান তৈরি করার প্রয়াস, অন্যদিকে সমাজের মানুষের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে থাকা, এই দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বের জয় অর্জনে কিশোরেরা সংঘবদ্ধ হয়ে যেকোনো কিছুই করতে পারে এবং এই পর্যায়েই সৃষ্টি হয় ‘কিশোর গ্যাং’। এ সময়ে যদি উপযুক্ত দিকনির্দেশনা দেওয়া যায়, তাহলে তাদের দ্বারা ‘কিশোর গ্যাং’ সৃষ্টি হতো না। মা-বাবাসহ সমাজের প্রতিটি মানুষের উচিত এই বয়সের ছেলেমেয়েদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা, যাতে তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে।

মুকুল হোসেন

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়