রূপালী আক্তার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
স্মৃতির পাতায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

বাংলার শিল্পজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন। তাকে ‘শিল্পাচার্য’ বলা হয় কারণ তিনি শুধু একজন মহান চিত্রশিল্পীই ছিলেন না, বরং বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চার পথিকৃৎ ও শিল্পশিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তার শিল্পকর্মে যেমন বাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে, তেমনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সংগ্রাম ও মানবতার গভীর আবেদনও প্রকাশ পেয়েছে। স্মৃতির পাতায় জয়নুল আবেদিন তাই এক অবিস্মরণীয় নাম, যিনি তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর, কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। নদী, নৌকা, কৃষক, গ্রামীণ মানুষের জীবন- এসবই তার ভাবনার উপাদান হয়ে ওঠে। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসতেন।
জয়নুল আবেদিনের শিল্পীজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের চিত্রকর্ম। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা যায়। এই দুর্ভিক্ষের নির্মম চিত্র তিনি তার রং তুলিতে তুলে ধরেন। তার আঁকা ‘দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা’ শুধু শিল্পকর্ম নয়, বরং ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। ক্ষুধার্ত মানুষের কঙ্কালসার দেহ, মায়ের কোলের মৃত শিশু, খাদ্যের জন্য মানুষের অসহায় ছুটে চলা- এসব দৃশ্য মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তার চিত্রকর্মে প্রতিবাদ, মানবতা ও বাস্তবতার এক চরম ছোঁয়া ছিল।
১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ হিসেবে পরিচিত। তার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্পশিক্ষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দিতেন এবং শিল্পকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার শিক্ষা দিতেন।
জয়নুল আবেদিন শুধু একজন চিত্রশিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংস্কৃতির একজন সংগ্রামী সৈনিক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি দেশপ্রেম ও মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন। পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে তিনি শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেন। তার শিল্পে বাঙালির জাতীয়তাবোধ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে ‘নবান্ন’, ‘মনপুরা-৭০’, ‘সংগ্রাম’, ‘গুণটানা’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব ছবিতে বাংলার মানুষের জীবন, শ্রম ও সংগ্রামের বাস্তব রূপ ফুটে উঠেছে। তিনি সাধারণ মানুষকে তার শিল্পের মূল বিষয়বস্তু বানিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না।
জয়নুল আবেদিনের ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে ও মানবিক। তিনি খ্যাতির মোহে আবদ্ধ ছিলেন না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকতে ভালোবাসতেন। তার ছাত্ররা তাকে শুধু শিক্ষক নয়, অভিভাবক হিসেবেও শ্রদ্ধা করতেন। শিল্পের প্রতি তার নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ তাকে সবার কাছে অনন্য মর্যাদা এনে দিয়েছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জয়নুল আবেদিন সংগ্রশালাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৬ সালে এটি নতুন করে সাজানো হয়। এই সংগ্রহশালায় প্রথমে ৭০টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছিল যার বেশিরভাগই ছিল তৈলচিত্র। সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে তার আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্মের পাশাপাশি ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র যেমন- জুতা, রংতুলি, চিত্রপট ইত্যাদি।
বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিতে তার অবদান চিরস্মরণীয়। তার প্রতিষ্ঠিত চারুকলা আন্দোলন আজও দেশের শিল্পচর্চার কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক হিসেবে পালিত হয়।
১৯৭৬ সালের ২৮ মে জয়নুল আবেদিন মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তার মৃত্যু হলেও তার শিল্পকর্ম ও আদর্শ আজও বেঁচে আছে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, শিল্প শুধু সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, এটি মানুষের দুঃখ, সংগ্রাম ও সত্যকে তুলে ধরার একটি মাধ্যম।
পরিশেষে বলা যায়, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছিলেন বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির এক মহান পথপ্রদর্শক। তার শিল্পে ফুটে উঠেছে বাংলার মাটি ও মানুষের প্রাণের কথা। স্মৃতির পাতায় তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং মানবতার কণ্ঠস্বর, প্রতিবাদের প্রতীক এবং বাঙালি সংস্কৃতির গর্ব। তার অবদান সকলে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবেন এবং স্মৃতির পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
"








































