নিজস্ব প্রতিবেদক
সংস্কারের পর পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরেছে
অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বলেছেন, ব্যাপক সংস্কার, স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং অতীতে সংঘটিত বৃহৎ আকারের বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে দেশের পুঁজিবাজারে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলের সদস্য মো. কামরুল হাসানের (ময়মনসিংহ-৬) এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুনর্গঠিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এরই মধ্যে দৃশ্যমান ফল দিতে শুরু করেছে। গত দুই মাস ধরে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় রয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে গতকাল রবিবার বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শেয়ারবাজার এখন ঊর্ধ্বমুখী এবং সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই মাসে বাজারের পারফরম্যান্স আরো শক্তিশালী হয়েছে। এটি পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থা ফিরে আসারই প্রতিফলন।’
অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার একজন চেয়ারম্যান ও তিনজন কমিশনার নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিএসইসি গঠন করেছে। আরো একজন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, বর্তমান কমিশনের কোনো সদস্যই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাননি। তিনি বলেন, ‘সম্মানিত সদস্যকে জানাতে চাই, কাউকে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমনকি অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবেও তাদের কাউকে আগে চিনতাম না। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে, আমিও তাদের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না।’
নতুন কমিশনের সদস্যদের যোগ্যতার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, তারা সবাই অভিজ্ঞ পেশাজীবী এবং দেশি-বিদেশি পুঁজিবাজার সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তিনি বলেন, ‘তারা সবাই পেশাদার এবং পুঁজিবাজার বিষয়ে শক্তিশালী দক্ষতা রাখেন। তাদের সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।’ পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পুঁজিবাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনিয়ম ও বাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিস্তারিত তথ্য বিএসইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে বাজার কারসাজি, প্রতারণা ও বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিএসইসি আর্থিক জরিমানা আরোপ করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো)-এর শেয়ার লেনদেনে কারসাজির ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, বাজার কারসাজি, দুর্নীতি ও অন্যান্য আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের চিহ্নিত করতে গঠিত তদন্ত ও অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেও কমিশন পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, ‘শুধু স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই নয়, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আস্থাও বাজারে ফিরে আসছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা আবারও বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’ তিনি জানান, হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কসহ বিশ্বের প্রধান আর্থিক কেন্দ্রগুলোর বিনিয়োগ ব্যবস্থাপকরা এরই মধ্যে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই করতে সফর শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, ‘তারা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আস্থার ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি বিশ্বমানের পুঁজিবাজার গড়ে তুলবে।’ তিনি বলেন, বাজারের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাই সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রমাণ।
অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার করব্যবস্থাকে সহজ, ন্যায়সংগত ও করদাতাবান্ধব করার পাশাপাশি করজাল উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন খাতে কার্যরত প্রতিষ্ঠানের বাজার অংশীদারত্ব নির্ধারণ করছে, যাতে তাদের প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থানের ভিত্তিতে আরো ন্যায্য ও আনুপাতিকহারে কর নির্ধারণ করা যায়।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাজার অংশীদারত্ব নির্ধারণ করা হচ্ছে, কারণ করের দায় তাদের বাজারের আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। অতীতে এটি সঠিকভাবে করা হয়নি, তবে এখন আমরা আরো যৌক্তিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলছি।’ অর্থমন্ত্রী জানান, করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার সহজীকৃত ফ্ল্যাট-রেট কর ব্যবস্থা চালু করছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় করদাতার আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্টহারে কর নির্ধারণ করা হবে। এতে জটিল আয়কর রিটার্ন দাখিল বা দীর্ঘ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে না। তিনি বলেন, ‘মানুষ নির্ধারিত ফ্ল্যাট-রেট কর পরিশোধ করে একটি রসিদ গ্রহণ করবে। তাদের আয়কর রিটার্ন পূরণ করতে হবে না কিংবা কর কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানির শিকার হতে হবে না।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন করদাতাদের আনুষ্ঠানিক করব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে এবং স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করতেই এই সহজীকৃত ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো- এই সহজ ফ্ল্যাট-রেট ব্যবস্থার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নতুন করদাতাকে করজালের আওতায় আনা। করভিত্তি পর্যাপ্ত সম্প্রসারিত হলে পরবর্তীতে দেশের বিদ্যমান কর আইন অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিয়মিত করব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।’
"







































