মুনতাসির মাহমুদ
দিঘির নাম ধর্মসাগর

শোনলে হয় তো অনেকে আঁতকে উঠবেন। এ আবার কেমন দিঘি! তার অবস্থান কিংবা দেখতেই বা কেমন। এমন নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতেই পারে। তবে, তা থেকে লাঘব পেতে এবার শুনুন ধর্মসাগরের কাহিনি। ধর্মসাগর মূলত একটি প্রাচীন দিঘি। ট্যাংক ও ব্যাংকের নগরীখ্যাত কুমিল্লার প্রাণকেন্দ্রে তার অবস্থান। আমরা অনেকেই জানি, কুমিল্লা একটি প্রাচীন জনপদ। এখানে ছিল অনেক রাজ-রাজরাদের রাজত্ব। তাদের অনেকেই ছিল শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। আবার কেউ কেউ গড়েছেন সৌকর্যময় অজস্র প্রাসাদ, মন্দির ও বিহার। আবার কখনো কখনো প্রজাদের জন্য গড়েছেন অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আশ্রয় কেন্দ্র। এমনকি খনন করেছেন বিশাল বিশাল দিঘি। ঠিক ধর্মসাগরও এ রকমই একটি খনন করা দিঘি। আজ থেকে প্রায় পৌনে ৬০০ বছর আগে ত্রিপুরা রাজ্যের অধিপতি মহারাজা প্রথম ধর্মমাণিক্য এই দিঘিটি খনন করেন এবং তারই নামানুসারে দিঘিটির নামকরণ করা হয় ‘ধর্মসাগর’।
ঐতিহাসিক ‘রাজমালা’ গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী মহারাজা ধর্মমাণিক্য ১৪৩১-১৪৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩২ বছর ত্রিপুরার অধিপতি ছিলেন। একজন প্রজাহিতৈষী শাসক হিসেবে তার ছিল যথেষ্ট সুনাম। তার স্থাপিত অনেক কীর্তি সেই সুশাসনের ইঙ্গিত বহন করছে। কুমিল্লা ও তার আশপাশের অনেক অঞ্চল ছিল ধর্মমাণিক্যের রাজত্বের অধীন। ফলে সেখানে রয়েছে তার অনেক স্মৃতি। এর মধ্যে প্রজাদের পানীয় জলের সুবিধার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি দিঘি খনন করেন। অপার সৌন্দর্যের বিশাল ধর্মসাগর সে দিঘিগুলোর একটি। ১৫০০ শ্রমিকের ৭৩০ দিনের শ্রমে গড়া এই দিঘির আয়তন ২৩.১৮ একর। দেশ বিভক্তির পর ১৯৬৪ সালে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিঘিটির পশ্চিম ও উত্তরপাড়টি পাকা করা হয়। শুধু তাই নয়, এর পরও দিঘিটি বেশ কয়েকবারই সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে ধর্মসাগর দেশের মৎস্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
ধর্মসাগরের চারপাশে রয়েছে ব্যাপক সবুজ বৃক্ষের সমাহার। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পাখপাখালির কলতানে সর্বদা মুখর থাকে ধর্মসাগরের শ্যামল আঙিনা। তাই বছর জুড়েই দূরদূরান্ত থেকে এ দিঘি দেখার জন্য আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। দিঘির উত্তর ও পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ৫ একরের ‘নগর উদ্যান’। এটির তদারকির দায়িত্বে রয়েছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন। তাদের উদ্যোগে এখানে স্থাপন করা হয়েছে বিনোদনের নানা উপকরণ ও দর্শনার্থীদের অবকাশের জন্য অসংখ্য বেঞ্চি ও বসার ব্যবস্থা। নানা প্রজাতির মৌসুমি ফুল ও মনোহর বৃক্ষ ধর্মসাগরকে দিয়েছে এক নৈসর্গিক শোভা। তা ছাড়া শীত মৌসুমে ধর্মসাগরে প্রচুর পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। তাদের কলতানে ধর্মসাগরের থইথই জলতরঙ্গে ছন্দায়িত হয় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস।
ধর্মসাগর কুমিল্লা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিধায় যেকোনো স্থান থেকে এখানে সহজে আগমন করা যায়। আর সে কারণে প্রতিদিনই বহু লোকের সমাগম ঘটে। বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে চলাচল করা খুবই মুশকিল হয়ে ওঠে। কারণ, দর্শনার্থীদের এত ভিড় থাকে যে তখন পা ফেলতেই কষ্ট হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসব কিংবা পহেলা বৈশাখে এখানে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। এ ছাড়া ছুটির দিনে অসংখ্য মানুষ স্বজন-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতে চলে আসেন। এদের মধ্যে তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই থাকে বেশি। তরুণরা গিটার নিয়ে গানে গানে মেতে ওঠে আর তরুণীরা সেই সুরে থাকে মত্ত। অন্যদিকে অনবরত চলতে থাকে ফটোপ্রেমীদের ক্যামেরার ক্লিক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মসাগরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ছে। সেই সুবাদে এর আশপাশেরও বেশ উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। সকালের রোদমাখা জাদুকরী আলোয় ভেসে যায় এর সবুজ তরঙ্গ। আর সন্ধ্যায় মায়াবী আলোয় ভরে উঠে এর চারপাশ, যা দর্শনার্থীদের অনুভবে দেয় ভালোলাগার এক অপূর্ব শিহরন।
"









































