শাহ মো. জিয়াউদ্দিন
দৃষ্টিপাত
প্রসঙ্গ, ঋণ অবলোপন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খারাপ সংস্কৃতি হলো ঋণ অবলোপন করা। এই নিয়মটার কারণে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে ধস নেমেছে। যদি ঋণ অবলোপন দায়মুক্তি নয়, তবে এটা অনেকটা দায় মুক্তির কাছাকাছি। ঋণ অবলোপন (Loan Write-off) হলো একটি খারাপ প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় কোনো খেলাপি বা আদায় অযোগ্য ঋণকে ব্যাংকের আর্থিক হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়। ব্যাংকের মতে, এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা বাড়ে। তবে এই ক্ষেত্রেও ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকে। অবলোপনে ১০০ শতাংশ প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক, এটা খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে সাহায্য করে কিতাবে অর্থাৎ খাতা-কলমে কিন্তু বাস্তবে না। এটি একটি অপকৌশল যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো আদায় করা কঠিন এমন ঋণগুলোকে হিসাবের খাতা থেকে মুছে ফেলে। তবে এর মানে এই নয় যে ঋণগ্রহীতার দেনা শেষ হয়ে যায়। ব্যাংক চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে, তবে হিসাবের খাতায় তা আর খেলাপি হিসেবে দেখায় না। এই প্রক্রিয়ায় কারণে ব্যাংকাররা দুর্নীতির সুযোগ পায়। কারণ ব্যাংক ঋণ বিতরণে গ্রাহক নির্বাচনে যে ভুল করেছিল, তা অবলোপন করার মাধ্যমে দায়মুক্ত হয়ে যায়।
খেলাপি ঋণ যখন কোনো ঋণগ্রহীতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। তখন ঋণটি খেলাপি (Non-Performing Loan) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অবলোপনের আগে ব্যাংকগুলোকে সেই ঋণের সম্পূর্ণ অর্থের সমপরিমাণ টাকা সঞ্চিতি (Provision) হিসেবে রাখার নিয়ম। যা একটি আর্থিক ক্ষতি হিসেবে গণ্য হয়। প্রভিশন রাখার পর, ব্যাংকগুলো আদায়ের সম্ভাবনা কম এমন ঋণগুলোকে তাদের ব্যালান্স শিট বা স্থিতিপত্র থেকে বাদ দিয়ে দেয়। খেলাপি ঋণ যেভাবে অবলোপন করা হয় তা হলো- ১. খেলাপি হওয়ার দুই বছর পর ঋণ অবলোপন করা যায়। ২. পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি বা অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়ে অবলোপনের কাজটি করা হয়। ঋণ অবলোপন (Loan Writeoff) নীতিমালা হলো খেলাপি ঋণকে ব্যাংকের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া। এটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা হলো, কোনো ঋণ টানা দুই বছর ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক মানের খেলাপি’ থাকলে, তা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে অবলোপন করা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ অবলোপনের শর্ত শিথিল করে নতুন নীতিমালা জারি করেছে, যার ফলে আগের চেয়ে সহজে ঋণ অবলোপন করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকারা ঋণ আদায়ের বিষয়ে একটু উদাসীন হয়ে যাচ্ছে , ফলে বাড়ছে খেলাপি ঋণ, এক পর্যায়ে খেলাপি এসে হয়ে যায় অবলোপন। বাংলাদেশে ২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ এগার হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের জুন নাগাদ খেলাপি ঋণ গিয়ে ঠেকেছে পাঁচ লাখ ত্রিশ হাজার কোটি টাকায়। অর্থাৎ একবছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণে, যার পরিমাণ তিন লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। দৈনিক প্রথম আলো সংবাদ থেকে জানা যায়, দেশে সর্বশেষ জুন মাসের শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। যা বিতরণ করা মোট ঋণের ২৭.০৯ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় চার ভাগের এক ভাগের বেশি এরই মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে। গত মার্চের শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। তখন খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪.১৩ শতাংশ। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি, যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৮১ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সাল অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায় দেখা যায়, খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা। আর অবলোপন করা ঋণ অর্ধ লাখ কোটি টাকারও বেশি, যা এ খাতের একটি বড় সমস্যা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাহলো ঢাকা মেইল ও যুগান্তরের এপ্রিল ২০২৫ ও জুলাই ২০২৫-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণ ৮১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে ছিল। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২০২১-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সাল শেষে অবলোপন করা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। দৈনিক আমাদের সময় (ডিসেম্বর ২০২৪) এর তথ্য অনুযায়ী, মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। দৈনিক বণিক বার্তা (ডিসেম্বর ২০২৫) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের পাশাপাশি অর্ধ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ অবলোপন করা হয়েছে। তবে অবস্থা দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, অবলোপন করা ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা নাই। কারণ দেশের বেশিরভাগ কথিত বিগ বিগ সাইজের ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিরা ব্যাংকের টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে। সুতরাং অবলোপন বা খেলাপি কোনো ঋণের আদায়ের সম্ভাবনা খুবই কমে। প্রশ্ন হচ্ছে যখন ঋণ দেওয়া হয়েছিল, তখন ঋণের বন্ধকিয় সম্পত্তির হিসাবটা কীভাবে করেছেন ব্যাংকারা? এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেন বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। কারণ একজন প্রান্তিক কৃষক তার ফসলি জমি এক একরের দলিল জমা দিয়ে পান মাত্র এক লাখ টাকা শস্য ঋণ। এই ঋণের বিপরিতে কৃষককে সম্পদ বন্ধক রাখতে হয়েছে একর জমি দলিল, যার মুল্য পঞ্চাশ লাখ টাকা। একজন কৃষককে পঞ্চাশ লাখ টাকার জমির দলিলে এক লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। অথচ বড় বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদেরকে এমন নিয়মে আনছে সরকার। এই কৃষক কিন্তু টাকা পাচার করে না বা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় না। ক্ষুদ্র ও কৃষি ঋণের অবলোপনের (Loan Write-off) পরিমাণ নেই বললে চলে। বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষি ঋণ বিতরণে জোর দিচ্ছেন। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের ঋণ খেলাপির তুলনায় কৃষকদের ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপি খুবই কম হয়ে থাকে। তবে কোনো ব্যাংককে কখনোই কৃষকের ঋণ অবলোপন করতে দেখা যায় না, কিন্তু কৃষককে ঋণ পেতে পোহাতে হয় নানা ধরনের দুর্ভোগ। ঋণ গ্রহিতাকে ঋণ গ্রহিতা হিসাবে দেখা উচিত, কে বড় কে প্রান্তিক এই অনুপাতে বিভাজন করা ঠিক না।
তবে ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষক দেশের শ্রেষ্ঠ ঋণ গ্রহিতা কারণ তারা খেলাপিও না বা তাদের গ্রহণ করা ঋণের অর্থ অবলোপন করা হয় না। তাই ঋণ গ্রহিতা হিসাবে কৃষকদেরকে বিশেষ সম্মান দেওয়া উচিত।
লেখক : কলাম লেখক
"






































