গ্রামের অসচ্ছল পরিবারে সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি দেবে সরকার
উদ্যোগ বাস্তবায়নে রূপরেখা তৈরিতে ব্যস্ত জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ

দেশের প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকার অসচ্ছল পরিবারগুলোর রান্নাঘরে সাশ্রয়ী মূল্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এ সংক্রান্ত একটি নীতিগত প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।
বর্তমানে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এই জনকল্যাণমুখী উদ্যোগটির মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন রূপরেখা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
দেশে গত সাত বছরে এলপিজির ব্যবহার ১৫ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে, যার সিংহভাগই (৮০ শতাংশ) গৃহস্থালির রান্নায় ব্যবহৃত হয়। তবে এই বিশাল চাহিদার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক চরম বৈষম্য।
সরকারি বনাম বেসরকারি সরবরাহ: দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি অপারেটরদের দখলে। সরকারি কোম্পানির অবদান মাত্র ২ শতাংশ।
মূল্যের আকাশ-পাতাল ব্যবধান: সরকারি সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য মাত্র ৮২৫ টাকা হলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে তা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে, বেসরকারি সিলিন্ডারের দাম প্রতি মাসে বাংলাদেশ এনার্জী রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারণ করে দিলেও, খুচরা বাজারে তা কখনোই কার্যকর হয় না। সুযোগ পেলেই বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেয়।
সীমিত সামর্থ্য: গ্রামে যারা সামর্থ্যবান, তারা এলপিজি ব্যবহার করলেও বাজারমূল্যের অস্থিরতার কারণে তা নিয়মিত ধরে রাখতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয়ে তাদের আবার প্রথাগত জ্বালানিতেই ফিরে যেতে হচ্ছে।
পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি: ত্রিমুখী সংকটের সমাধান সরকারের এই নতুন উদ্যোগটি কেবল একটি সুলভ জ্বালানি দেওয়ার প্রকল্প নয়, এটি বহুমুখী সংকট সমাধানের একটি চাবিকাঠি।
ফুসফুস ও চোখের রোগ হ্রাস ও জলবায়ু রক্ষা: দীর্ঘদিন ধরে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী রান্নার কাজে কাঠ, খড়কুটো ও ঘুঁটের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে একদিকে যেমন নির্বিচারে বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে চুলার বিষাক্ত ধোঁয়া নারীদের ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি এবং শিশুদের ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করছে। ঘরে ঘরে এলপিজি পৌঁছালে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে রক্ষা পাবে গ্রামীণ জনপদ।
বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ: যেকোনো ভালো উদ্যোগেরই প্রধান পরীক্ষা থাকে তার মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে। বিশেষজ্ঞরা এই প্রকল্পকে ঘিরে প্রধানত দুটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন।
‘ভুতুড়ে’ সুবিধাভোগী ও ডাটাবেজ সংকট: প্রকল্পের সুফল যাতে প্রকৃত অসচ্ছল পরিবারগুলোই পায়, তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অতীতে দেখা গেছে, যথাযথ তালিকার অভাবে অনেক সরকারি সাহায্য বিত্তবান বা প্রভাবশালী মহলের হাতে চলে গেছে। তাই একটি নিখুঁত, ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ ডাটাবেজ তৈরি করা সবার আগে জরুরি।
কালোবাজারি ও বাণিজ্যিক পাচার: ভর্তুকি মূল্যের সিলিন্ডারগুলো যাতে অসৎ চক্রের মাধ্যমে স্থানীয় চায়ের দোকান, রেস্তোরাঁ, ইটভাটা বা বাণিজ্যিক খাতে পাচার না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সাধারণ মানুষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে এবং সরকারের বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি জলে যাবে।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত তাদের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জ্বালানি সংকট দূর করতে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। ভারতের ‘প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা’ এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সফল প্রকল্প।
সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ভর্তুকি (DBT): ভারতের এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো এর স্বচ্ছতা। সেখানে দরিদ্র গ্রাহকরা সরাসরি বাজারমূল্যেই এলপিজি সিলিন্ডার কেনেন। কিন্তু সিলিন্ডার ক্রয়ের সাথে সাথেই সরকার নির্ধারিত ভর্তুকির টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা কালোবাজারির সুযোগ থাকে না এবং সিলিন্ডার বাণিজ্যিক কাজে পাচার হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, পাকিস্তান কেবল শীতকালে বা বিশেষ সময়ে অস্থায়ী কোটা ঘোষণা করে, যা দীর্ঘমেয়াদে তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। বাংলাদেশ ভারতের এই ‘ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ (DBT) মডেলটি অনুসরণ করে একটি টেকসই কাঠামো দাঁড় করাতে পারে।
আগামীর প্রত্যাশা: সরকারের এই কল্যাণমুখী উদ্যোগটি গ্রামীণ বাংলার অর্থনীতি ও সমাজ সংস্কারে একটি মাইলফলক হতে পারে। তবে এর সফলতার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে কঠোর তদারকি, ডিজিটাল স্বচ্ছতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত বিতরণের ওপর। জ্বালানি নিরাপত্তা যদি দেশের প্রান্তিক মানুষের দোড়গোড়ায় সুলভে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে তা কেবল তাদের রান্নার কষ্টই লাঘব করবে না, বরং উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে গ্রামীণ নারীদের আরও বেশি কর্মক্ষম করে তুলবে।









































