নিজস্ব প্রতিবেদক
সম্পর্ক সমুন্নত রাখার উদ্যোগ
মেট্রোরেল টার্মিনাল প্রকল্পে জাপানকেই রাখছে সরকার

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একাধিক প্রকল্প নিয়ে উন্নয়ন সহযোগী দেশ জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, তা দূর করতে চায় বর্তমান বিএনপি সরকার। এ কারণে জাপানি ঋণে মেট্রোরেলের দুটি প্রকল্পের (লাইন-১ ও ৫) প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বও জাপানকে দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীতে নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পে জাপানি কোম্পানিগুলোর উচ্চদর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে টানাপড়েন তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এ দুই প্রকল্পের প্রক্রিয়াগত কাজ স্থগিত রাখে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিএনপি সরকার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। তবে ব্যয় কমানোর বিষয়ে দরকষাকষিও চালিয়ে যাবে। এজন্য ৭ সদস্যের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ বলেন, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে জাপানের অর্থায়নে মেট্রোরেল দুটি নির্মাণ হবে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কমাতে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, বিষয়টি সুরাহা হবে।
জাপান বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী। বিদেশি ঋণ ও সহায়তা বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদন (২০২৪-২৫) বলছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ (স্থিতি) ছিল ৭ হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার। এর ১৮ শতাংশই দিয়েছে জাপান। সহজ শর্তে জাপানি ঋণ পাওয়া যায়। জাপান জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশের মেট্রোরেল, মহেশখালীর মাতারবাড়ীর বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, যমুনা নদীর ওপর নির্মিত রেলওয়ে সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্পে সাম্প্রতিককালে ঋণ দিয়েছে। তবে কোনো কোনো প্রকল্পে উচ্চব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যেমন দর প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকায় নতুন দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির (ডিএমটিসিএল) পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে শুধু প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা।
নতুন দুটি মেট্রোরেল পথের একটি ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর, নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল (এমআরটি লাইন-১) এবং হেমায়েতপুর-ভাটারা (এমআরটি লাইন-৫)। এ দুটি প্রকল্প বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৯ সালে অনুমোদন পায়। তখন দুটি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় যথাক্রমে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ও ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত সমীক্ষা শেষে এমআরটি-১ প্রকল্পের ব্যয় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং এমআরটি-৫ প্রকল্পের ব্যয় ৮৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাইকা। মানে এমআরটি-১ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ৮৪ শতাংশ, এমআরটি-৫ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ১১৩ শতাংশ।
উচ্চহারে দর প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি করেছিল ডিএমটিসিএলের তৎকালীন প্রশাসন। তখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ফারুক আহমেদ। তার অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও হংকং- এ পাঁচটি দেশে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ডিএমটিসিএল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর মেট্রোরেল প্রকল্প ‘অধিক পর্যালোচনার জন্য আপাতত স্থগিত থাকুক’ বলে নির্দেশনা দেয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মেট্রোরেলের খরচ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জাপানের তৈরি হওয়া টানাপড়েন কমাতে সচিবালয় ও সচিবালয়ের বাইরে অন্তত চারটি বৈঠক হয়েছে। বিএনপি সরকার আসার পর ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ফারুক আহমেদের সঙ্গে চুক্তিও বাতিল হয়েছে।
মেট্রোরেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচির একটি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হকের সঙ্গে জাইকার প্রতিনিধিদের একটি এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে জাইকার প্রতিনিধিদলের মধ্যে একটি বৈঠক হয়। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সব দিক বিবেচনা করে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং আলোচনা করে মেট্রোরেল নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় কমানোর চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মেট্রোরেল দুটি প্রকল্পের ব্যয় কেন এত বেশি, সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মূলত এটি নিয়েই চিন্তা। গত ২০ মে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দুটি প্রকল্পের ‘অস্বাভাবিক’ খরচ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ব্যয় কমানোর জন্য দর-কষাকষি অব্যাহত রাখা হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিকমানের পরামর্শকও নিয়োগ করা যেতে পারে। অবশ্য ডিএমটিসিএলের একটি সূত্র জানায়, জাইকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, নতুন দুটি মেট্রোরেলের বড় অংশ যাবে মাটির নিচ দিয়ে। সে কারণে মেট্রোরেল-৬ (মতিঝিল থেকে উত্তরার দিয়াবাড়ী) এর চেয়ে নতুন দুটি মেট্রোরেলের খরচ বেশি পড়ছে। ডলার ও নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিও খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণ।
"






































