আসাফুর রহমান কাজল, মহানগর (খুলনা)
ঔষধিগুণের ঘাটকোল চাষাবাদে আগ্রহী হচ্ছেন ডুমুরিয়ার কৃষক

পতিত জমি বা বন-বাদাড়ে অনাদরে বেড়ে ওঠা গাছ ঘাটকোল। ঔষুধি গুণসম্পন্ন সবজি হিসেবে বয়োজেষ্ঠ্যোদের কাছে এর কদর আছে। ব্যাথা উপশমের পাশাপাশি সুস্বাদু তরকারি হিসেবে রান্না হয় বাড়িতে। এতে ঘাটকোল চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষকরা।
ঘাটকোল, খারকোল, ঘাটকঁচু, ঘেটকঁচু, খারকোন, ঢাটকোল ইত্যাদি বিভিন্ন নামে পরিচিত একটি সবজি। যা বনে-বাগানে জন্মায়। এর অনেক পুষ্টিগুণ আছে। উপরোন্ত এটি সুস্বাদু। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, গরম ভাতে ঘাটকোল ভাজি হলে মাছ-মাংসও লাগে না। ভুনা, ভর্তা হিসেবেও খাওয়া যায়। দুধ-ঘাটকোলও হয়।
এদিকে স্বাস্থ্যর জন্য খুবই ভাল, বিশেষ করে ত্বকের জন্য। ত্বককে প্রাকৃতিকভাবে উজ্জ্বল করে। প্রচুর ভিটামিন, আয়রণ, ক্যালসিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ ও পুষ্টি উপাদান রেয়েছে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য ‘চিরঞ্জীব বনৌষধি’ গ্রন্থে ঘাটকোল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এটি অতিশয় উত্তেজক, উদরশুলনাশক, রক্ত¯্রাব নিবারক ও বিরোচোক। বিষাক্ত সাপের কামড়ে মূল বেটে দংশিত স্থানে প্রলেপ ও কিছুটা খেতে দেওয়ার প্রচলন আছে। মৌমাছি, বোলতা, ভীমরুল বা বিছায় কামড়ালে যন্ত্রণা উপশমে এর মূল বেটে দেওয়া হয়। ঘাটকোল খেলে পায়খানা পরিষ্কার হয়। পেটের ব্যথা কমে।’
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, দক্ষিণ ভারতে চাষাবাদ হয় ঘাটকোলের। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, উত্তর আফ্রিকা, সিংহলে ঘাটকোল গাছ আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার বনজঙ্গলে প্রচুর ঘাটকোল গাছ জন্মায়। ঘাটকোলের পাতা গাঢ় সবুজ। ডাটা ১০-১৫ ইঞ্চি লম্বা হয়। দেখতে অনেকটা কচুর মতো। এই ডাঁটা সবাই খায়। পাতা বেটে খাওয়ারও প্রচলন আছে। সুস্বাদু বলে এই সবজিটি এ অঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে।
খুলনার ডুমুরিয়া অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘাটকোলের চাহিদা থাকায় বর্ষায় অনেক মানুষেরই আয়-রোজগারের উৎস হয় এই ঘাটকোল। গ্রাম বা শহরে প্রতি আঁটি ঘাটকোল বাজারে ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়। বর্তমানে কিছু এলাকায় ঘাটকোলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ করছেন আগ্রহী কিছু কৃষক।
তেমনি এক কৃষক ডুমুরিয়া উপজেলার খর্ণিয়া গ্রামের মো. আবু হানিফ মোড়ল। পতিত এবং ছাঁয়াযুক্ত জমিতে তিনি চাষ করেছেন ঘাটকোলের। যে জমিতে ঘাস ছাড়া কিছুই হয়নি এতোদিন। সেই জমিতে এখন ঘাটকোলে ভরে গেছে। ১ শতক জমিতে সবমিলিয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। ফলন দেখে তিনি আশা করছেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার ঘাটকোল বিক্রি হবে। সেই সাথে আগামী বছরের জন্য ঘাটকোলের বীজও হবে বেশ। যা নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে আগ্রহী চাষীদের মাঝে দিবেন তিনি। দেশের শ্রেষ্ঠ সবজি চাষীর পদক পাওয়া আবু হানিফ মোড়ল জানান, হাটবারে ১০০ আঁটি ঘাটকোল নিয়ে বসার আগেই বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি আঁটি বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকায়।
উপজেলার মধুগ্রাম এলাকার সাবিনা ইয়াসমিন জানান, আমরা প্রায়ই ঘাটকোল ভাজি করে খাই। ভাত দিয়েও খাওয়া যায়, রুটি দিয়েও খারাপ লাগে না। ঘাটকোলের তরকারি হলে মাছ-মাংস লাগে না।
তালা উপজেলা এলাকার বাসিন্দা উন্নয়নকর্মী ভবতোষ মন্ডল জানান, ঘাটকোল খুবই উপকারী। ভর্তা, ছাড়াও এর ডাঁটা সিদ্ধ করে আমাদের বাড়িতে কাঁঠালের বিচি দিয়ে ভুনা করা হয়। আমরা এই ব্যঞ্জন দিয়েই এক থালা ভাত খেয়ে ফেলি। ঘাটকোল গায়ের ব্যথা কমায়। হজমেও সাহায্য করে। এর অনেক গুণ রয়েছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মোসাদ্দেক হোসেন। জানতে চাইলে প্রতিদিনের সংবাদকে তিনি জানান, ঘাটকল বা ঘেটকল একটি অত্যন্ত পুষ্টি ও ঔষধিগুণ সম্পন্ন উচ্চ মূল্যের সবজি। এটি ছায়াযুক্ত পতিত জমিতেও চাষ করা যায়। এটি বন-বাদারে অনাদর অবহেলায় হয়ে থাকে। কিন্তু বাজারে চাহিদার প্রেক্ষিতে আমরা কৃষককে প্রশিক্ষন ও পরামর্শ প্রদানের জন্য বাণিজ্যিক ভাবে চাষের দিকে নিয়ে যাচ্ছি। প্রতি শতক জমিতে হাজার টাকা খরচ করে প্রায় ২৫ হাজার টাকা লাভ করা যায়। এটি সম্প্রসারণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
"





































