আহসানুর রহমান রাজিব

  ০৭ জুলাই, ২০২৬

সুন্দরবনের কেওড়া

উপকূলের নারীদের হাতে সম্ভাবনার নতুন অর্থনীতি

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের হরিশখালী গ্রামের গৃহিণী ফরিদা বেগম। সংসারের কাজ সামলে এখন তিনি একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। সুন্দরবনের কেওড়া ফল সংগ্রহ করে তা দিয়ে সুস্বাদু আচার তৈরি করেন। পরে সেই আচার বিক্রি করেন সুন্দরবনে বেড়াতে আসা পর্যটক, স্থানীয় ক্রেতা এবং অনলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছে।

একসময় কেওড়া ফল ছিল উপকূলের মানুষের ঘরোয়া খাবার। টক ডাল, খাটা, চাটনি বা আচার তৈরিতে ব্যবহার হতো বাড়ির রান্নাঘরে। কিন্তু ফরিদা বেগমের মতো নারীদের হাতে সেই কেওড়া এখন হয়ে উঠছে আয়ের উৎস। মৌসুমে কেওড়া সংগ্রহ, পরিষ্কার, সিদ্ধ, মসলা মিশিয়ে আচার তৈরি, বোতলজাত করা, বাজারে নেওয়া, সব কাজেই যুক্ত হচ্ছেন উপকূলীয় এলাকার অনেক নারী।

কেওড়ার আচার নিয়ে কথা হয় ফরিদা বেগমের সঙ্গে, তিনি বলেন, ‘কেওড়া ফল দিয়ে তৈরি আচার সুন্দরবনে ঘুরতে আসা পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তারা স্থানীয় স্বাদের কিছু নিতে চান। তাদের কাছে কেওড়ার আচার নতুন ও আকর্ষণীয়। আমার একটি ফেসবুক পেজও আছে। অনেকে অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার করেন। তবে দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষ কেওড়া ফল সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। তাই বড় বাজার এখনো তৈরি হয়নি।’

-ফরিদা বেগম একা নন। পাশের বুড়িগোয়ালীনি ইউনিয়নের শেফালি বেগমও এলাকার বনজীবী পরিবারের নারীদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন। সেখানে অনেকে একত্রে কেওড়ার আচার তৈরি করে সমবায় সমিতির মাধ্যমে বাজারজাত করছেন। তাদের মতোই সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের বহু নারী এখন কেওড়া ফল ঘিরে ছোট ছোট উদ্যোগ নিচ্ছেন। কেউ আচার বানাচ্ছেন, কেউ চাটনি, কেউ জেলি, কেউ শুকনা মসলাদার কেওড়ার রেসিপি তৈরি করছেন। এসব পণ্য স্থানীয় হাটবাজার, পর্যটনকেন্দ্র, মেলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে। এতে পরিবারে বাড়তি আয় আসছে, নারীদের কাজের স্বীকৃতি বাড়ছে এবং সুন্দরবননির্ভর জীবিকায় নতুন পথ তৈরি হচ্ছে।

কেওড়া কোথায় পাওয়া যায়?

কেওড়া সুন্দরবনের অন্যতম পরিচিত ম্যানগ্রোভ গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম সনেরাটিয়া অ্যাপেটালা। সুন্দরবনের নদী-খাল, চর, জোয়ার-ভাটার এলাকা এবং লবণাক্ত কর্দমাক্ত মাটিতে কেওড়া গাছ ভালো জন্মে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলে এ গাছ বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও মিয়ানমারের উপকূলীয় বনাঞ্চলেও কেওড়া জন্মায়।

বিশ্বের সবচেয়ে দামি চা, এক কেজির দাম কোটি টাকা

নদীর নতুন জেগে ওঠা চরভূমি, খালের পাড় এবং লবণাক্ত অনাবাদি জমিতে কেওড়া প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। আবার উপকূলীয় চর বনায়নেও কেওড়া এখন জনপ্রিয় প্রজাতি। কারণ এটি দ্রুত বাড়ে, লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকে এবং অল্প বয়সেই ফল দিতে শুরু করে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সুন্দরবনসংলগ্ন অনেক এলাকায় অন্যান্য ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সঙ্গে কেওড়া চারা লাগানো হচ্ছে।

উপকূল রক্ষায় কেওড়ার ভূমিকা

কেওড়া শুধু ফলদ গাছ নয়, উপকূলের প্রাকৃতিক ঢালও বটে। নদীর পাড়ে, চরভূমিতে বা উপকূলীয় এলাকায় কেওড়া গাছ মাটি ধরে রাখতে সহায়তা করে। এতে ভাঙন কমে, চরভূমি স্থিতিশীল হয় এবং বনায়নের পরিবেশ তৈরি হয়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন মানুষের বসতি ও কৃষিজমির জন্য প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

কেওড়া ফল সংগ্রহ কীভাবে হয়

কেওড়া ফল সাধারণত বর্ষা মৌসুমে বেশি পাওয়া যায়। ফাগুনের শেষ দিকে গাছে ফুল আসে। চৈত্র-বৈশাখে ফল ধরতে শুরু করে। আষাঢ়-শ্রাবণ থেকে ভাদ্র-আশ্বিন পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় কেওড়া ফল সংগ্রহ করা হয়। গাছে ফল পাকলে স্থানীয় মানুষ তা সংগ্রহ করেন। কেউ সরাসরি গাছ থেকে পাড়েন, কেউ আবার গাছের নিচে পড়ে থাকা পরিণত ফল কুড়িয়ে নেন। সুন্দরবনের ভেতর থেকে বনজীবীরা ফল সংগ্রহ করে আনেন। সে ক্ষেত্রে বনবিভাগকে রাজস্ব প্রদান করতে হয়। কেওড়া ফল বন্যপ্রাণীর খাদ্যও। সুন্দরবনের হরিণ, বানরসহ অনেক প্রাণী কেওড়া ফল ও পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে।

খাদ্য হিসেবে কেওড়া

কেওড়া ফলের সবচেয়ে বড় পরিচয় এর টক স্বাদ। ফলটি দেখতে অনেকটা ডুমুর বা আমলকীর মতো। সবুজ রঙের ফলের বাইরের মাংসল অংশ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভেতরে থাকে বীজ। কাঁচা অবস্থায় লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া যায়। তবে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার বহু পরিবার কেওড়া ফল দিয়ে মসুর ডাল রান্না করেন। স্থানীয়ভাবে এটিকে অনেকে টক ডাল বা খাটা বলেন। ছোট চিংড়ি মাছের সঙ্গে কেওড়া ফল দিয়ে রান্না করা পদ উপকূলীয় অঞ্চলে খুবই জনপ্রিয়।

পুষ্টিগুণ ও ঔষধি ধারণা

স্থানীয় মানুষের কাছে কেওড়া ফল শুধু খাবার নয়, উপকারী ফল হিসেবেও পরিচিত। বদহজম, ক্ষুধামন্দা, বমিভাব, আমাশয় বা পেটের সমস্যায় কেওড়া ফল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। অনেক বনজীবী একে মহৌষধি বলেও মনে করেন। বিভিন্ন গবেষণায় কেওড়া ফলে শর্করা, আমিষ, সামান্য ফ্যাট, ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও কিছু উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিডের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। এসব উপাদান মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হজমশক্তি ও পুষ্টিতে সহায়ক হতে পারে। তবে চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের আগে বৈজ্ঞানিকভাবে আরো বিস্তৃত গবেষণা ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

অর্থনীতিতে সম্ভাবনার হিসাব

স্থানীয় নারী উদ্যোক্তারা যদি প্রশিক্ষণ ও বাজার সহায়তা পান, তাহলে মৌসুমভিত্তিক আয়ের পাশাপাশি বছরজুড়ে পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে। সংরক্ষণযোগ্য পণ্য হওয়ায় এটি শুধু মৌসুমে নয়, সারাবছর বাজারে রাখা সম্ভব। অনলাইন বিক্রি, মেলা, পর্যটনকেন্দ্র, সুপারশপ ও আঞ্চলিক পণ্যের দোকানের মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে কেওড়া পণ্য একটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্পে পরিণত হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে কেওড়ার গুরুত্ব

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, মিঠা পানির সংকট এবং কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবিকায় পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কেওড়া একসঙ্গে তিনটি কাজে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কেওড়াকে শুধু বনের একটি গাছ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জলবায়ু সহনশীল উপকূলীয় অর্থনীতির অংশ হতে পারে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়