মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
আলোর পথযাত্রী আশরাফুন নাহার

প্রতিবন্ধী মানুষ। একা চলাফেরা করতে পারে না। এমন মানুষদের নিয়ে সমাজে তুচ্ছ তাচ্ছিল্যই বেশি। শারীরিক অক্ষমতাকে সহজভাবে সবাই নেয় না। হুইল চেয়ারে চলা মানেই থেমে যাওয়া জীবনের গল্প নয়। মনের জোর থাকা চাই। তাহলে হুইল চেয়ারে বসেই অনেক কিছু করা সম্ভব। অনেক কিছু অর্জন করা যায়। যশোরের মেয়ে আশরাফুন নাহার মিষ্টি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি নির্বাহী পরিচালক প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ) দায়িত্ব পালন করছেন ২০০৭ সাল থেকে। প্রতিবন্ধীদের নারীদের নিয়ে কাজ করছেন ১৯ বছর। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অস্ট্রিয়া, আয়ারল্যান্ড, জাপান, পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। বাংলাদেশে উইমেন্স ফোরাম পুরস্কার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে সম্মাননা এবং অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কারও রয়েছে তার ঝুলিতে।
প্রতিবন্ধী মানুষ হয়ে এত কিছু কিভাবে সম্ভব? মিষ্টি বলেন, ইচ্ছাশক্তি ও একাগ্রতা থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই বাধা হতে পারে না। প্রতিবন্ধিতা নিয়েও মানুষ এভারেস্ট জয় করতে পারে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে এক দুর্ঘটনার তাকে প্রতিবন্ধিতা বরণ করে নেন। মিষ্টি জানালেন, ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ছাদে কাপড় আনতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যান। স্পাইনাল কডে আঘাতজনিত কারণে বুকের কাছ থেকে নিচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন মিষ্টিকে বাকি জীবন হয় বিছানায় শুয়ে নয়তো হুইল চেয়ার ব্যবহার করে কাটাতে হবে। মিষ্টির বাবা ডা. আজহারুল ইসলাম, মা আমিরুন নেছা। এই দম্পতির ১১ সন্তানের মধ্যে মিষ্টি ১০ম।
প্রতিবন্ধীতা মিষ্টির জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন সফলতার সঙ্গে। অনার্সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলেও ভর্তি হতে পরেননি। এ প্রসঙ্গে মিষ্টি বলেন, ভাইবার সময় আমাকে শিক্ষকরা বললেন, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। বিশেষ করে হুইল চেয়ারে করে ক্লাস করা সম্ভব নয়। পরে যশোরে এসে বিকমে ভর্তি হন। বিকম পাস করার পর মোহাম্মদপুর সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কলেজে অ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হলেন। মাস্টার্সে জাতীয় মেধা তালিকায় প্রথম হন তিনি। কাজের জন্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, কোরিয়া, ব্রাজিলসহ ১২টি দেশে গিয়েছেন। আর দেশের জেলা-উপজেলায় প্রতিবন্ধী নারীদের সহায়তা দিতে হুইল চেয়ারে ভর করেই বিচরণ করেন তিনি।
নিজে প্রতিবন্ধী মানুষ। প্রতিবন্ধী মানুষদের দুঃখ, কষ্ট, সীমাবদ্বতাগুলো তাকে খুব নাড়া দেয়। তাই নানা জায়গায় লোভনীয় অফার সত্ত্বেও কোথাও যাননি। প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নে রাত দিন পরিশ্রম করেন। নিজের আরামদায়ক জীবন নয়। তার কাছে মূখ্য প্রতিবন্ধী মানুষদের কল্যাণে কাজ করা। সঙ্গীদের নিয়ে ২০০৭ সালে গড়ে তিনি তুললেন প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ)। মিষ্টি বলেন, এই সংগঠন থেকে আমরা প্রতিবন্ধী নারীদের আইনগত সহায়তা দেওয়া থেকে শুরু করে, আদালতে প্রতিবন্ধীদের প্রবেশ নিশ্চিত করাসহ যেখানে তাদের অধিকারগুলো ক্ষুন্ন হচ্ছে সেই জায়গাগুলোতে কাজ করছি। তৃণমূল নারীদের সচেতনতা বাড়াতে এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে কাজ করে থাকি। প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুদের আত্নবিশ্বাস কম থাকে, কাউন্সেলিং করে আমরা তাদের ট্রেনিং দিয়ে থাকি। প্রতিবন্ধী মেয়েশিশুরা যাতে স্কুলে যেতে পারে সে বিষয়ে সবধরনের সাপোর্ট দিয়ে থাকি। নারী নির্যাতিত হলে সঠিকভাবে বিচার পায় না, সে জন্য বিভাগীয় বার সমিতিতে আমরা জানাই। সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করতে সহায়তা করে থাকি। পাঁচ বিভাগে নির্যাতিত নারীদের শেল্টার দেওয়ার কাজ করছি। সরকারের যে আইনি সহায়তা কেন্দ্র আছে সেখানে আমরা প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রবেশগম্যতা বিষয়ে কাজ করেছি।
নিজের জীবন থেকে মিষ্টি শিক্ষা নেন। তিনি মনে করেন, প্রতিবন্ধী মানুষদের সহজভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা সমাজে এখনো তৈরি হয়নি। অবকাঠামো, রাস্তাঘাট কিংবা যানবাহন- এসব ক্ষেত্র এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব করে গড়ে তোলা হয়নি। ফলে প্রতি পদে পদেই আমাদের বাধা পেতে হয়। এ জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার। তিনি প্রতিবন্ধী বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে গণমাধ্যমকে আরো প্রো-এক্টিভ রোল পালন করার আহবান জানান।
"









































