reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ০৪ মে, ২০২১

সাহসের স্মারক

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে লাখো মায়ের বুক খালি হলেও শহীদ জননী খ্যাতিতে ভূষিত হয়েছিলেন বাঙালির অকুতোভয় নারীর অন্যতম প্রতিভূ জাহানারা ইমাম। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে জাহানারা ইমামের নাম ছড়িয়ে পড়ে তার সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য। অতীতে তিনি রাজনীতিসচেতন হলেও রাজনীতিবিদ ছিলেন না, স্বাধীনতার পর ভবিতব্যই তাকে রাজনীতির অঙ্গনে নিয়ে আসে। একাত্তরে তার প্রথম ছেলে রুমী ছাত্রত্ব ত্যাগ করে দেশের মুক্তি-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন এবং কয়েকটি সফল গেরিলা অপারেশনের পর পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে নিহত হন। বিজয় লাভের পর রুমীর বন্ধুরা রুমীর মা জাহানারা ইমামকে সব মুক্তিযোদ্ধার মা হিসেবে বরণ করে নেন। তখন থেকেই তিনি ‘শহীদ জননী’র মর্যাদায় ভূষিত।

জাহানারা ইমাম কর্মজীবনের পাশাপাশি ষাটের দশকে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। মূলত তিনি শিশুসাহিত্যিক হিসেবে লেখালেখি শুরু করেন। ছোটদের জন্য কয়েকটি প্রয়োজনীয় বই তিনি অনুবাদ করেন। বইগুলো বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। আশির দশক থেকে তিনি গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বহু গ্রন্থ রচনা করেন। নিজের সন্তান শহীদ রুমীকে ঘিরে তিনি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ রচনা করেন। তার এ গ্রন্থ হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় দলিল।

৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচন এসব তিনি নীরবে প্রত্যক্ষ করেছেন। ১৯৭১ সালের ১৪ মার্চে লেখক কমিটির ডাকে মিছিলে যোগ দেন। এই মিছিলে যোগ দেওয়া তার জীবনের নতুন অধ্যায় সূচনা করে। অন্তরের তাগিদেই তিনি প্রতিরোধের আগুনে নিজেকে রাঙিয়ে নেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের সব ধরনের সাহায্য করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন অসংখ্য তরুণ মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনীতে নাম লিখিয়েছিলেন। জাহানারা ইমামের বড় ছেলে রুমীও গেরিলা বাহিনীতে নাম লেখান। ধানম-িতে এক বীরত্বপূর্ণ সফল দুঃসাহসিক অভিযানের পর রুমী নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী রুমীসহ বাবা শরীফ ইমাম ও ছোট ভাই জামীকেও ধরে নিয়ে যায়। অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন সবাই। দুদিন পর পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের চিহ্ন শরীরে ও হৃদয়ে বহন করে শরীফ ইমাম ও জামী ফিরে এলেও রুমী আর কখনো মায়ের কোলে ফিরে আসেননি। রুমীর শোকে শরীফ ইমাম স্বাধীনতার মাত্র দুদিন আগে অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর হৃদযন্ত্রের বৈকল্যে হঠাৎ মারা যান। স্বাধীনতার পর জামায়াতের চিহ্নিত নেতাদের ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় এবং গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। কিন্তু ‘দালাল আইন’-এ চিহ্নিত অপরাধী ব্যতীত অন্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করায় গণধিক্কৃত এই অপশক্তি বিভিন্ন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পুনরায় জনগণের মাঝে নিজেদের জায়গা করে নিতে থাকে। যার ফল স্বাধীনতার দুই দশক পরে আমরা দেখতে পেয়েছি এবং এখনো পাচ্ছি।

১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গণধিক্কৃত গোলাম আযমকে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলের আমির ঘোষণা করে। এতে বাংলাদেশে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভের অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১০১ সদস্যের একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। তিনি এই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। আন্দোলনকে বিস্তৃত করার স্বার্থে ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। এই কমিটিরও আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ এই কমিটি ‘গণ-আদালত’-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করে। গণ-আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত গণ-আদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদ-যোগ্য বলে ঘোষণা করেন।

গণ-আদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। গণ-আদালত অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তৎকালীন সরকার ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে জামিন অযোগ্য মামলা করে। পরে হাইকোর্ট ২৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির জামিন মঞ্জুর করেন। ১০০ জন সংসদ সদস্য গণ-আদালতের রায়ের পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করেন।

জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ১৯৯৩ সালের ২৮ মার্চ ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সমাবেশে পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন জাহানারা ইমাম। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, এমনকি বিদেশেও নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন।

আশির দশকের শুরুতে ১৯৮২ সালেই তিনি মুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হন। ১৯৯৪ সালের ২২ জুনের পর থেকে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করে। ২৬ জুন মিশিগানের ডেট্রয়ট নগরীর সাইনাই হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সে জাহানারা ইমাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি দেশবাসীর কাছে শেষ আহ্বান রেখে যান ‘মরণব্যাধি ক্যানসার আমাকে শেষ মরণ কামড় দিয়েছে। আমি আমার অঙ্গীকার রেখেছি। রাজপথ ছেড়ে যাইনি। মৃত্যুর পথে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। তাই আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই। আপনারা আপনাদের অঙ্গীকার ও ওয়াদা পূরণ করবেন। আন্দোলনের শেষপর্যায় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে থাকবেন। আমি না থাকলেও আপনারা, আমার সন্তান-সন্ততিরা আপনাদের উত্তরসূরিরা সোনার বাংলায় থাকবে।’

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close