মেহেদী হাসান

  ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

রান্নার উপাদান সরবরাহ করে সফল নাদিরা

‘রান্না করতে আমার খুব ভালো লাগে। এর প্রতি আমার যে পরিমাণ আগ্রহ ও ভালোবাসা রয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। রান্নার জন্য মসলা ও বিভিন্ন উপাদান খুঁজতে বিভিন্ন সময়ে বাজারে ঘুরতে হতো। চোখে পড়ত বাজারের খোলা অপরিচ্ছন্ন ও ভেজাল মসলা। খুবই মন খারাপ হতো। ভাবতাম, কীভাবে একটা ভালো খাবার রান্না করব এই মসলা দিয়ে? তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিই, আমি খাঁটি মসলা ও রান্নার উপাদান তৈরি করব। আর এটা নিয়ে আমি আমার স্বপ্নের জ্বাল বুনতে থাকি।’

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন সফল নারী উদ্যোক্তা নাদিরা পারভীন। সংসার সামলানোর পাশাপাশি ঘরে বসে নিজের পণ্যগুলো গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। তিনি গড়ে প্রতি মাসে ৭০-৮০ হাজার টাকা আয় করেন।

রান্নার প্রতি এত আগ্রহ থাকা এই নাদিরা কিন্তু একসময় রান্নাই পারতেন না। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে হওয়ায় তাকে কেউ কখনো চুলার পাশে যেতে দেননি। কিন্তু বিয়ের পর স্বামী চাইতেন তিনি যেন রান্না করেন। তখন বিভিন্ন বই কিনে রান্না শেখা শুরু করেন তিনি। কোনো রেসিপি সম্পর্কে ধারণা পেলেই তিনি বাসায় সেটা তৈরি করতেন। এভাবেই রান্নার প্রতি তার অসম্ভব ভালো লাগা তৈরি হয়। হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর রাঁধুনি। রান্না শুধু নিজেই শেখেননি, শিখিয়েছেন অনেককেও। প্রশিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও টেলিভিশন চ্যানেলেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

উদ্যোক্তা নাদিরার রান্না করা খাবার নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে থাকলেও তা হয়ে ওঠেনি নানা কারণে। পরে কাজ শুরু করেন রান্নার উপাদান নিয়ে। অন্তত ১১৯ রকমের মসলা ও রান্নার উপাদান আছে তার। রসনা নামে একটি ফেসুবক পেজের মাধ্যমে তিনি অর্ডার নিয়ে এসব পণ্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। গ্রাহকদের মধ্যে অনেক তার পরিচিতজনও রয়েছেন। তিনি বলেন, আমার পেজে প্রায় ১১৯ রকম মসলা ও রান্নার উপাদান আছে। এর মধ্যে রেগুলার মসলা, স্পেশাল মসলা, রেডিমিক্স পেস্ট মসলা, পেঁয়াজু মিক্স, বেসন মিক্স, হালিম মিক্স, পেঁয়াজ বেরেস্তা, টক দই, মাওয়া, সরের ঘি, হোম মেইড বাটার, সরিষার তেল ইত্যাদি।

বর্তমানে তার প্রায় ৪ হাজারের বেশি গ্রাহক রয়েছে। যারা নিয়মিত রসনার মাধ্যমে তার পণ্যগুলো ক্রয় করেন। তিনি বলেন, আমার সবাই রিপিট কাস্টমার। পণ্যের মানসহ বিভিন্ন কারণে গ্রাহকরা আমাকে বিশ্বাস করেছেন। প্রায় চার থেকে সাড়ে চার হাজার গ্রাহক রয়েছেন। একা সামলাতে পারি না। তিনজন কর্মী রাখা আছে। তারা আমাকে মসলা তৈরি, পরিচ্ছন্নতা, বোতলজাত, প্যাকেজিং ইত্যাদি কাজে সাহায্য করেন। তা ছাড়া দুজন পার্সোনাল ডেলিভারি ম্যানও আছেন।

নাদিরা বলেন, রমজান উপলক্ষে পণ্য সরবরাহের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে। অনেক অর্ডার হয়ে গেছে। এ মাসে আরো একজন কর্মী নিয়েছি। আমার পণ্যগুলো প্রতিদিনে রান্নায় ব্যবহার করে থাকে। এজন্য সারা বছরই ব্যস্ততা থাকে। তবে রমজান উপলক্ষে কিছু পণ্যের অর্ডার অনেক বেশি এসেছে। তার এই সফলতার যাত্রা অল্প কয়েক দিনের নয়। শুরুটা হয়েছিল গত ২০১৪ সালের দিকে রান্না করা বিভিন্ন খাবার, জন্মদিনের কেক ইত্যাদি সরবরাহের মাধ্যেমে। পরে করোনার সময়ে ব্যবসার বেশ ভাটা পড়ে। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল পরিবারের।

তিনি বলেন, নিজে কিছু করার ইচ্ছা অনেক আগে থেকেই ছিল। রান্নার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ও ভালোবাসা ছিল। রান্না নিয়ে দিনরাত রিচার্স শুরু করি। বাসায় বাবুর্চি এনে রান্না প্রশিক্ষণ নিয়েছি। আবার বেকারি থেকে লোক নিয়ে এসে বেকারি পণ্যেরও প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বাসায় না জানিয়ে বেশ গোপনে খাবার ও কেক সরবরাহ করতাম। বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েও পরিবারের নানা রকম বাধা ও অসহযোগিতার কারণে বারবার ব্যর্থ হই। পণ্য সোর্সিং, মূলধন ও পার্সেল ডেলিভারি নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অনুপ্রেরণা ও সাহস দেওয়ার মতো কেউই পাশে ছিল না। পরে মন খারাপ দেখে বড় মেয়ে আবারও শুরু করতে বলে।

কিন্তু করোনা শুরু হলে সবার মতো নাদিরাও গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। থেমে যায় তার সব স্বপ্ন। তার ভাষায়, ২০২০ সালে করনোকালে যখন গৃহবন্দি হয়ে পড়ি, তখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। সৌভাগ্যক্রমে উইর দেখা মেলে। আবারও পূর্ণ উদ্যমে আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন শুরু করি। এবারও আসে শত বাধা। পাগলি উপাধিও পাই।

তিনি বলেন, পারিবারিক সাপোর্ট না থাকায় সবাই ঘুমিয়ে গেলে রাত জেগে অনলাইনে অ্যাকটিভ থাকতাম। উই আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে সমস্ত বাধাকে জয় করে নিজের উদ্যোগ সফলতার পথে নিয়ে যেতে হয়। অনুপ্রেরণা, আত্মবিশ্বাস, টিকে থাকার যুদ্ধ- এসবই উই থেকে। সেখান থেকে মাস্টার ক্লাস সফট স্কিলসহ বিভিন্ন ট্রেনিং নিয়েছি। এখন রান্নায় ব্যবহৃত পণ্য নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে সহনশীল হলেও পরিবার থেকে খাবার সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে চরম আকারে। এজন্য এখন আর খাবার সরবরাহ করি না।

পণ্যগুলো তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, সব পণ্য আমি সম্পূর্ণ নিজে তৈরি করি। সরিষার তেল, ঘি, মরিচ, হলুদ ইত্যাদি মাগুরা থেকে আমার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে নিয়ে আসি। তবে বিদেশি মসলাগুলো বাজার থেকে নিজে সংগ্রহ করি। প্রতিটি মসলা ধুয়ে রোদে শুকিয়ে বাসায় বেলেন্ডার করি। আবার পরিমাণে বেশি হলে নিজে বসে থেকে মিল থেকে পিষে নিয়ে আসি।

পর্যাপ্ত মূলধন না থাকায় পণ্য বিক্রি বেশি হলেও তেমন লাভ থাকে না জানিয়ে নাদিরা বলেন, মূলধনের কারণে বেশি পরিমাণে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে পারি না। আবার সব পণ্যে লাভ সমান আসে না। এজন্য আমার লাভের পরিমাণ খুবই কম। বস্তা ধরে একবারে বেশি পরিমাণ পণ্য সংগ্রহ করতে পারলে হয়তো ভালো একটি লাভ থাকত। তারপরও যেটুকু হয়, আলহামদুলিল্লাহ।

পণ্যগুলো সরবরাহের ব্যাপারে তিনি বলেন, ফেসবুক পেজ ‘রসনা’র মাধ্যমেই আমার পরিচিতি হয়েছে। বর্তমানে সেটা অনেক বেড়েছে। আমার পেজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এবং বিদেশ থেকে অর্ডার করেন গ্রাহকরা। বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পণ্যগুলো নিয়মিত পাঠিয়ে দিচ্ছি খুব সহজেই।

নতুন কেউ যদি উদ্যোক্তা হতে চায়, তাহলে কীভাবে শুরু করা উচিত- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি একসময় রান্নাই করতে পারতাম না। রান্না শেখার জন্য বিভিন্ন বই পড়তাম, প্রশিক্ষণ নিতাম। তখন অবশ্য উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টা মাথায় ছিল না। পরে প্রশিক্ষণ নিতে নিতে রান্না নেশায় পরিণত হয়ে যায়। অসংখ্য কোর্স করেছি। বিভিন্ন ইনস্টিটিউটে একই কোর্স বারবারও করেছি। এখনো সুযোগ পেলেই নানা ধরনের কোর্স করছি। আবার অনলাইনেও বিভিন্ন ট্রেনিং করার সুযোগ পাচ্ছি এবং করছি। কারণ একটা ব্যবসাকে সফল করার জন্য প্রশিক্ষণ খুবই প্রয়োজন। কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে তাকে পরিকল্পনা অনুযায়ী অবশ্যই প্রশিক্ষণ নিতে হবে। অন্যত্থায় ব্যর্থতা নিশ্চিত।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানাতে গিয়ে নাদিরা বলেন, ‘আমার তৈরি পণ্যগুলো নিয়ে বড় একটি শপ দেওয়া ইচ্ছে আছে। যেখানে থাকবে কেমিক্যাল মুক্ত, রংবিহীন স্বাস্থ্যসম্মত হোম মেইড পণ্য। যাতে গ্রাহকদের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারি।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close