reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

অতি লোভে তাঁতি নষ্ট

লোভের সংস্পর্শ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য ট্রেনিং কম করিনি। সেই শিশুকাল থেকে হাতে-কলমে এ শিক্ষা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয়নি। লোভের মাত্রা বেড়েছে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিপর্যায় পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য এর গতি। সম্ভবত লোভের উচ্চতা এখন হিমালয়ের উচ্চতাকেও হার মানিয়েছে। ছেলেবেলার সেই গল্পের আজ আর কোনো মূল্য নেই। তাই পাঠ্যবই থেকে হারিয়ে গেছে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্প। হারিয়ে গেছে তাঁতির লোভের শেষ পরিণতি এবং নীতিশিক্ষার বিরল দৃষ্টান্ত।

এখন তো করপোরেট কালচার। এখানে নীতিশিক্ষার কোনো মূল্য আছে কি না তা গবেষণার বিষয় হিসেবে ধরা যেতে পারে। কিন্তু সামাজিক জীবনে এর যে কোনো মূল্য নেই, সে কথা স্বীকার করার মতো লোকের অভাব নেই। অন্তত সমাজচিত্র সে কথা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। প্রতারণা নেই কোথায়? আমরা যাকে খুবই স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করি, সেখানেও প্রতারণা। আমরা প্রেম/ভালোবাসার কথা বলছি। সম্ভবত বিশুদ্ধ জরিপ বলবে, সব ক্ষেত্রের চেয়ে প্রেম/ভালোবাসার ক্ষেত্রে প্রতারণার পরিমাণ বহুলাংশে বেশি।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, শক্তি বেশি কার! নৈতিকতা না প্রতারণার? ভোটের ব্যবস্থা করা হলে, প্রতারণার পক্ষেই ভোট পড়বে বেশি। কেননা নৈতিকতা এখন নাকি অনেকটা পদ্মপাতার জল। স্থায়িত্ব নেই। তবে প্রতারণার স্থায়িত্ব আছে। প্রমাণ হিসেবে নগদ হাজির করা যায় এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসানকে। শরিয়তসম্মত সুদবিহীন বিনিয়োগের কথা বলে প্রচারণা চালিয়েছেন। নিজের এমএলএম কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতেন। তবে সুদ ঊহ্য থাকলেও লভ্যাংশের টোপটা ছিল বেশ লোভনীয়। সুদবিহীন এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা ২০১৮-তে। গ্রাহক সংখ্যা ১০ হাজার। মূলধন সংগ্রহ ১১০ কোটি টাকা। এখানে টাকার বিষয়টি মূল বা প্রধান নয়। প্রধান অংশটি হলো সদস্য সংখ্যা। ১০ হাজার। অর্থাৎ, অন্তত ১০ হাজার লোভী মানুষকে একত্র করতে সমর্থ হয়েছেন রাগীব সাহেব। এ ক্ষেত্রে রাগীব সাহেবের গুণকীর্তন করতেই হয়। দশজন মানুষকে একত্র করতে না পারার কারণে কত রাজনৈতিক দল যে শেষ হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই। সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের যোগ্যতাকে কুর্নিশ করতেই হয়।

রাগীব সাহেবের এখন ছোট-বড় ১৭ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। মালিকানায় তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা। তবে কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের আমানত দিয়ে তৈরি হলেও মালিকানায় তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে রাগীব সাহেবের এই প্রতিষ্ঠানে ৯০০ কর্মচারী এবং লক্ষাধিক গ্রাহক। কোম্পানির কর্মচারী এবং গ্রাহকদের লভ্যাংশ- কোনোটাই দিতেন না চেয়ারম্যান রাগীব। এখনো পর্যন্ত কোনো ধরনের বিদ্রোহের মুখোমুখি হতে হয়নি রাগীব সাহেবকে। অবাধে চালিয়েছেন তার ধর্মব্যবসা। আমাদের মতো দেশে যেকোনো সময়ে ধর্ম বিষয়টিকে খুবই সাধারণ মাপের একটি পণ্যে রূপান্তর ঘটানো সম্ভব। যার প্রকৃত উদাহরণ এমএলএম কোম্পানি ও তার চেয়ারম্যান। সুদবিহীন বিনিয়োগের নামে যে প্রতারণার ফাঁদ তিনি পেতেছেন, তাতে এখন আটকে আছে লক্ষাধিক লোভী মানুষ। তারা একসঙ্গে দুদিকের লাভ ঘরে তোলার লোভে ফেঁসেছেন একজনের পেতে রাখা ফাঁদে। এখানেই ফিরে আসে আমাদের শৈশব। ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’র মতো নীতিকথার গল্প।

আমরা মনে করি, এ গল্প কম-বেশি সবাই পড়েছি। কিন্তু গ্রহণ করিনি কিছুই। আর সে কারণেই লাখ লাখ মানুষের নাকে দড়ি লাগিয়ে ঘুরাচ্ছে একজন। মেধা ও মননের দিকে থেকে সে কখনোই এই লক্ষাধিক মানুষের চেয়ে উন্নত নয়। তবু হেরেছি। ব্যক্তির কাছে নয়। নিজের কাছে নিজের পরাজয়। এ যেন লোভের কাছে মানবিক বোধের এক মর্মান্তিক পরাজয়।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close