কে এম মাসুম বিল্লাহ

  ১৭ জানুয়ারি, ২০২১

মুক্তমত

বিসিএস নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা

বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিস সার্ভিসের ২৬টি বিভিন্ন ক্যাডারের জন্য বিসিএসে অংশ নেন দেশের লাখো মেধাবী তরুণ। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অধীনে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ক্যাডারদের সর্বোচ্চ মেধাবী হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বিসিএসের সার্কুলার থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পর্যায়ের জন্য লেগে যায় কয়েক বছর। এতে করে বেকারত্বের সমস্যায় পড়তে হয় অপেক্ষারত মেধাবীদের। পরিসংখ্যান দেখলে বলা যায়, ৩৮তম বিসিএসের সার্কুলার হয় ২০১৭ সালের ২০ জুন, প্রিলি পরীক্ষা হয় ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭। লিখিত পরীক্ষা শুরু হয় ৮ আগস্ট ২০১৮, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ভাইবা শুরু হয় ৩১ জুলাই ২০১৯ তারিখে এবং ভাইবা শেষ হয় ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ৩৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয় ৩০ জুন ২০২০ সালে।

৩৮তম বিসিএসের গেজেট এখনো প্রকাশিত হয়নি, যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে গেজেট প্রকাশ ও জয়েনিং হয়, তার পরও সার্কুলার দেওয়া থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যন্ত প্রায় চার বছর লেগে যাচ্ছে! নিকট অতীতের অন্যান্য বিসিএসের পরিসংখ্যানও প্রায় একই রকমের (বিশেষ বিসিএস ব্যতীত)। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতি বছর স্নাতক পাস করে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু বিসিএসের এই দীর্ঘসূত্রতার দরুন অনেক মধ্যম আয়ের ও নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এত দিন ধৈর্য ধরে থাকার মতো অবস্থা থাকে না।

------
৩৪তম বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে সরকারি কর্ম কমিশনের সময় লেগেছিল তিন বছর চার মাস। ৩৫তম বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয় তুলনামূলক কিছুটা কম সময়ের মধ্যে, যেখানে সময় লেগেছিল প্রায় দুই বছর আট মাস। ২৯ ও ৩০ বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়াও দ্রুত শেষ হয়েছিল, তবে নিকট অতীতের কোনো বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়াই দ্রুত সময়ের শেষ হয়নি। পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক একাধিকবার বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে আনার কথা বলেছিলেন। তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর বিসিএসের আবেদন সংখ্যা বেড়ে চলছে। সর্বশেষ ৪১তম বিসিএসে আবেদন সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ, যা ৪ লাখ ৭৫ হাজারের মতো। ৪০তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৪ লাখ ১২ হাজার প্রার্থী। ৪১তম বিসিএসে পদসংখ্যা ২ হাজার ১৩৫টি; যার বিপরীতে আবেদন ৪ লাখ ৭৫ হাজার! যদিও ভাইবাতে উত্তীর্ণ হলে প্যানেল থেকে নন-ক্যাডার হওয়ারও সুযোগ থাকে, তার পরও পদসংখ্যা টোটাল আবেদন সংখ্যার তুলনায় অতি নগণ্য। এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শুধু মেধার প্রয়োজনই নয়, দরকার ধৈর্য ও আর্থিক সাপোর্ট। কিন্তু অনেকের জন্যই অনার্স পাস করার পর এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা কষ্টকর হয়ে যায়, পরিবারের কথা চিন্তা করে অন্য পেশায় যেতে হয়। এদিকে, পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ সাদিক তার দায়িত্বকালে বলেছিলেন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষা পদ্ধতিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে লিখিত পরীক্ষায় নম্বর কমানো, পরীক্ষা পদ্ধতির মানোন্নয়ন, সিলেবাসের আধুনিকায়ন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এমন কিছুর বাস্তবায়ন লক্ষ করা যাচ্ছে না।

এদিকে ব্যাংকার সিলেকশন কমিটির অধীনে সরকারি ব্যাংকগুলোর সার্কুলার থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ হতে তুলনামূলক সময় কম লাগায় অনেক তরুণ মেধাবীই বিসিএস পরীক্ষার বিকল্প প্রস্তুতি হিসেবে ব্যাংক পরীক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ব্যাংকের সার্কুলার বছরের সব সময়ই হয়ে থাকে, এ ছাড়া পদসংখ্যা বেশি হওয়া ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সময় কম লাগায় ব্যাংক পরীক্ষার প্রস্তুতির দিক ঝুঁকছেন মেধাবীদের অনেকেই। দেখা যায়, বিসিএসের চূড়ান্ত নিয়োগ হতে ৩.৫-৪ বছরের জায়গায় ব্যাংক নিয়োগের প্রিলি থেকে জয়েনিং পর্যন্ত সময় লাগে এক থেকে দেড় বছর, যা তুলনামূলক অনেক কম সময়। এ ছাড়া বিসিএসের ভাইবাতে উত্তীর্ণদের ভেরিফিকেশনেও চলে যায় অনেকটা সময়।

বিসিএসের নিয়োগ প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতা হতাশ করছে স্নাতক পাস করে বেকার অবস্থায় থাকা হাজারো তরুণ মেধাবীকে। যে মেধাগুলোকে আরো ভালো করে কাজে লাগানো যেত দেশের প্রয়োজনে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার এই সময়টা (৩-৪ বছর) একজন তরুণ দেশকে আরো ভালো কিছু দিতে পারতেন। পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের কাছ থেকে এসেছিল আশার বাণী, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অধীনে ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের বিভিন্ন পদে নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে অর্ধেকে নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছিলেন সংস্থাটির সাবেক আরেক চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ। এ ঘোষণা বাস্তবায়ন হলে হয়তো কমে যেত দীর্ঘসূত্রতা, আর নিয়োগ দ্রুত হলে মেধাবীরা আরো বেশি করে দেশ সেবা করার সুযোগ পাবেন।

লেখক : কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক

[email protected]

 

 

"

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close