মহাদেবপুর (নওগাঁ) প্রতিনিধি
নওগাঁর মহাদেবপুরে কিশোর গ্যাং ও মাদক সাম্রাজ্য

কখনো দামি মোটরসাইকেল। কখনো প্রাইভেট কার। আবার কখনো কখনো ট্রাক-ট্রাক্টরযোগে নওগাঁর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ও জেলা-উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা এবং শহরের অলি-গলিতে সংবাদমাধ্যমের কথিত স্টিকার লাগিয়ে অস্বাভাবিক গতিতে ছুটে চলেন। করেন বিলাসী জীবনযাপন। পরিচয় দেন ধান-চাল ব্যবসায়ী ও কথিত সংবাদকর্মীর। রয়েছে কিশোর গ্যাংও। সম্প্রতি জেলার মহাদেবপুর থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় আটক হয়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে উপজেলার চকগোবিন্দ পূর্বপাড়া গ্রামের আলমের ছেলে রাজন আলী (৩২)। তার আটকের খবরে এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান গ্রামবাসী। রাজনের মাদকসেবনকারী থেকে সরবরাহকারী ব্যবসায়ী হয়ে উঠার কাহিনি ফাঁস হচ্ছে। এছাড়াও তাদের নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীরা প্রতিকারের আশায় সাংবাদিকদের ঘটনাগুলো অবহিত করছেন। এত দিন যারা মুখ খুলতে সাহস পাননি; এখন তারাও সেসব অন্যায়ের বিচার দাবি করছেন।
মহাদেবপুর থানার তথ্যমতে, জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার মহাদেবপুর উপজেলা প্রতিনিধি জুলহাজ খাঁন রাজনের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমের কথিত পরিচয়ে মাদকব্যবসার সংবাদ প্রকাশ করেন। এরই জেরে গত ৭ জুলাই বিকেল ৩টার দিকে উপজেলা সদরের বকচত্বর এলাকার চেয়ারম্যান মার্কেটের ভেতরে প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থানকালে রাজন ও তার সঙ্গে থাকা অজ্ঞাত ৩-৪ জন সেখানে এসে সাংবাদিকের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে জুলহাজকে গলা চেপে ধরে শঁ¦সরোধের মাধ্যমে হত্যাচেষ্টা করে রাজন ও তার সহযোগীরা। তিনি কোনোরকমে নিজেকে রক্ষা করলে অভিযুক্তরা এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। তার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাদের সহায়তায় রাজনকে আটক করা হলেও তার সঙ্গে থাকা অজ্ঞাত অন্যরা পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রাজনকে আটক করে। পরে আহত সাংবাদিক মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা গ্রহণ করে থানায় এজাহার করেন। মামলা রেকর্ড করে ৮ জুলাই দুপুরে নওগাঁর আদালতে তাকে সোপর্দ করে থানা পুলিশ। এরপর আদালতের নির্দেশে রাজনকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এদিকে চেয়ারম্যান মার্কেটে আটকের সময় রাজনের কাছ থেকে পাওয়া যায় বগুড়া থেকে প্রকাশিত একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার মেয়াদউত্তীর্ণ পরিচয়পত্র। ওই পত্রিকা অফিসে যোগাযোগ করলে সহ-সম্পাদক জানান, পত্রিকাটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ওই পত্রিকার কর্তৃপক্ষ তাদের ফেসবুক পেজে রাজনের ছবিসহ বিশেষ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে প্রশাসনকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জানানো হয়।
রাজনের প্রতিবেশী চকগোবিন্দ পূর্বপাড়া গ্রামের ইয়াসিন আলী, মোতালেব হোসেন, আরিফ ও তপুসহ ৪০-৪৫ জন জানান, রাজন ও তার পরিবার ফেনসিডিল (এসকাপ), ইয়াবা এবং গাঁজা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা জেলার পত্নীতলা, ধামইরহাট উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা থেকে ফেনসিডিলের চালান মহাদেবপুর, মান্দা, নওগাঁ সদর উপজেলার খুচরা মাদকব্যবসায়ীদের কছে পৌঁছে দেয়। এছাড়াও কিছু প্রভাবশালী, রাজনৈতিক ব্যক্তি, বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও কথিত সংবাদকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মাদকসেবনকারীদের নিকট বাইক, প্রাইভেট কারযোগে অধিক দামে হোমডেলেভারি করে। কথিত ধান-চাল ব্যবসার আড়ালে ট্রাক-ট্রাক্টরযোগে ফেনসিডিলের চালান দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করে তারা। এ চক্রের সদস্য সংখ্যা ২০-২৫ জন। এর মধ্যে মহিলা ও তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য ৩-৫ জন। তারা এলাকায় ভূমিদস্যুতা, গ্রামবাসীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি এবং সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ওই গ্রামের বাসিন্দারা। মাদকব্যবসা ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে স্থানীয়দের কিশোর গ্যাং দিয়ে হামলা চালানো হয়। এ কারণে ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস করে না। এছাড়াও হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে ব্ল্যাকমেইল ও মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে রাজন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। মাদক সরবরাহ, চাঁদাবাজি ও হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে তারা কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। সেই টাকায় তাদের বিলাসী জীবন।
গ্রামবাসীর এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে। মাদকসেবী থেকে ব্যবসায়ী হয়ে উঠে রাজন। চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মী ও মহাদেবপুর সদরের ঘোষপাড়া, কুঞ্জবন, মধ্যবাজার এবং আপেলের মোড়ের কয়েকজন কথিত সাংবাদিক তাদের ছাড়িয়ে নিতে ব্যাপক তৎপর হয়ে উঠেন। এ কারণে তারা সবসময় থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। চক্রটির সব সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের। অভিযুক্ত রাজন জেলা কারাগারে থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মহাদেবপুর থানার ওসি ওমর ফারুক জানান, রাজন নামের একজনকে আটক করে নিয়মিত মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। অন্যদের আটকে তৎপর রয়েছে পুলিশ।
"








































