জুনাইদ কবির, ঠাকুরগাঁও

  ২ ঘণ্টা আগে

অনলাইন জুয়ার ভয়াল থাবায় ঠাকুরগাঁও: বাড়ছে আত্মহত্যা

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

একটি স্মার্টফোন, কয়েকটি ক্লিক আর রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন পরিণত হচ্ছে মৃত্যুর ফাঁদে। প্রথমে সামান্য লাভ দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন, এরপর বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগের প্রলোভন। সব হারিয়ে ঋণের পাহাড়, সংসারে অশান্তি, জমিজমা বিক্রি ও মানসিক অবসাদের চূড়ান্ত পরিণতি হয়ে দাঁড়াচ্ছে আত্মহত্যা। দেশের উত্তর সীমান্তের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে এভাবেই নীরবে বিস্তার ঘটিয়েছে অনলাইন জুয়ার ভয়াল সাম্রাজ্য।

মৃত্যুর ফাঁদে তরুণেরা: শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন অনলাইন বেটিং অ্যাপ ও ক্যাসিনো। সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় তরুণ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সীরাও জড়িয়ে পড়ছেন এই ভয়ংকর নেশায়।

সর্বশেষ এর শিকার হয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পশ্চিম বেগুনবাড়ি ভূজারীপাড়া গ্রামের ২০ বছর বয়সী তরুণ নাহিদ রানা। প্রথমদিকে কয়েকবার জেতার পর বেশি টাকা বিনিয়োগ করে সব হারান তিনি। ঋণের চাপে ভেঙে পড়ে দুই মাস আগে বিষাক্ত গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেন পরিবারের একমাত্র এই ছেলে সন্তানটি। নাহিদের মা নাজি বেগম বুকফাটা আর্তনাদে বলেন, "আমার ছেলেকে অনলাইন জুয়াই মেরে ফেলেছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, এই জুয়া বন্ধ করুন, যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।"

দুই বছরে আত্মহত্যার দীর্ঘ মিছিল: গত দুই বছরে জেলায় অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সদর উপজেলার হরিহরপুর নয়াপাড়ার ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৩০) 'বেট জিলি' নামের সাইটে টাকা হারিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর আগে জানুয়ারি মাসে পৌর শহরের পূর্ব হাজীপাড়ার সাদেকুল ইসলাম (৫০) ভিটেমাটি বিক্রির টাকা জুয়ায় হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে প্রাণ দেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিশমারী গ্রামের আকরাম আলী এবং ২০২৪ সালের মে মাসে একই উপজেলার রাজিউর রহমান রাজু (৩৫) ছয় মাসে ২০ লাখ টাকার বেশি হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

ঘরে বসেই সর্বনাশের ফাঁদ: স্থানীয়রা জানান, আগে মাদক নিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও এখন তার চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে অনলাইন জুয়া। কারণ, ঘরের ভেতরে মোবাইলের মাধ্যমে এটি চলায় পরিবার অনেক সময় টেরও পায় না।

অভিভাবক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, "সন্তান ঘরে বসে মোবাইল চালালে সে পড়াশোনা করছে নাকি জুয়া খেলছে, তা বোঝা কঠিন। অধিকাংশ পরিবার এখন চরম আতঙ্কে আছে।"

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কোটি টাকার লেনদেন: অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের গোপন গ্রুপের মাধ্যমে স্থানীয় এজেন্টরা খেলোয়াড় সংগ্রহ করে। বিকাশ, নগদ, রকেট এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ থেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। বিদেশি সার্ভারে অ্যাপগুলো চলায় মূল হোতাদের শনাক্ত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনি পদক্ষেপ ও পুলিশের বক্তব্য: জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে অনলাইন জুয়া আইনে দুটি মামলায় তিনজনকে এবং সাধারণ জুয়ার সাতটি মামলায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন জানান, "অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে শুধু পুলিশ দিয়ে এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবারগুলোকে সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারের ওপর নজর রাখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে।"

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়