মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)
চলনবিলে নতুন পানিতে দেশি মাছের জোয়ার, সংকট বাড়াচ্ছে চায়না দুয়ারি

কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিল অঞ্চলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে বর্ষার নতুন পানি। নতুন পানির প্রভাবে বিলের জলাশয়গুলো দেশি প্রজাতির মাছে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশের বিভিন্ন হাট-বাজারে এখন দেশি মাছের জমজমাট বেচাকেনা চলছে। দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে জেলে পরিবারগুলোতে ফিরে এসেছে স্বস্তি।
হাট-বাজারে উপচে পড়া ভিড়, জমে উঠেছে বেচাকেনা স্থানীয় জেলেরা জানান, গত কয়েক দিন ধরে তাঁদের জালে প্রচুর পরিমাণে দেশি প্রজাতির ছোট ও মাঝারি মাছ ধরা পড়ছে। সকালে তাড়াশ বাজারের স্থানীয় চিত্র ঘুরে দেখা যায়, প্রায় দুই শতাধিক পেশাদার ও মৌসুমি জেলে টেংরা, পুঁটি, কৈ, শোল, শিং, গুচিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন।
তাড়াশ পৌরসভার পূর্বপাড়ার জেলে ফণী দাস বলেন, "কয়েক দিন ধরে বিলে বেশ ভালো মাছ পাওয়া যাচ্ছে। নতুন পানি আসায় মাছের চলাচল বেড়েছে। তবে জাল ফেললেই মাছের সঙ্গে ডিমওয়ালা ছোট মাছও উঠে আসছে।"
শুধু তাড়াশের মূল বাজারই নয়, চলনবিল অধ্যুষিত নওগাঁ, বিনসাড়া, মঙ্গলবাড়িয়া, ঘরগ্রামসহ বিভিন্ন সাপ্তাহিক হাটেও মাছের সরবরাহ লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। অস্থায়ী বাজারে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত চলে বিপুল পরিমাণ মাছের কেনাবেচা। স্থানীয় বিক্রেতাদের মতে, এসব বাজারে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে, যা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে।
বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ, তবুও চড়া দাম বাজারে মাছের আকর্ষিক সরবরাহ বাড়লেও দামে তার খুব একটা প্রভাব পড়েনি, যা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাড়াশ বাজারে মাছ কিনতে আসা লুৎফর রহমান বলেন, "মাছের সরবরাহ অনেক বেশি হলেও দাম কমেনি। তবে নতুন পানির দেশি মাছের স্বাদই আলাদা, তাই দাম একটু বেশি হলেও কিনতে হচ্ছে।"
বর্তমান বাজারের দরদাম (প্রতি কেজি):
- চিংড়ি (মাঝারি): ৬০০ টাকা
- গুচি (ছোট/মাঝারি): ৫০০ – ৮০০ টাকা
- টেংরা: ৫০০ – ৬০০ টাকা
- পুঁটি (ছোট/মাঝারি): ১০০ – ২০০ টাকা
- কৈ: ৩০০ – ৪০০ টাকা
- শোল: ৫০০ – ৭০০ টাকা
- বোয়াল (মাঝারি): ৫০০ – ৮০০ টাকা
- নিষিদ্ধ 'চায়না দুয়ারি' জালে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হুমকি
মাছের প্রাচুর্যে একদি ক যেমন আনন্দের বার্তা এনেছে, অন্যদিকে অসাধু পন্থায় মাছ শিকারের ফলে বিলের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
পরিবেশবাদী লেখক সনাতন দাশ এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "বর্তমানে বিলে একশ্রেণির অসাধু লোক নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ব্যবহার করছেন। এই জালে বোয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনাসহ ডিমওয়ালা মাছ নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মাছের বংশবৃদ্ধি ও চরম প্রাকৃতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।"
বিষয়টি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম.ম জরজির্য়াস মিলন রুবেল বলেন, "বর্ষার নতুন পানিতে চলনবিল যখন অথৈ জলরাশিতে রূপ নেয়, তখন দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো বিল। কিন্তু প্রকৃতির এই অনন্য উপহার আজ এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি। অবৈধ রিং জাল বা চায়না দুয়ারির মরণফাঁদ আমাদের জলজ পরিবেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ রক্ষায় এই ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের আরও কঠোর ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।"
পিডিএস/এমএইউ









































