বাবুল আহমেদ, মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
মানিকগঞ্জে প্রতিদিন ভাঙছে ৬ সংসার: ম্লান হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন

মানিকগঞ্জ জেলাজুড়ে তীব্র উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা। প্রতিদিনের সাধারণ দাম্পত্য জীবনে পারিবারিক অস্থিরতা, পরকীয়া, বাল্যবিবাহ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বোঝাপড়ার সংকট এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করছে। ছোটখাটো কোন্দল থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত গড়াচ্ছে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত বিচারে। জেলায় পরিবার কেন্দ্রিক এমন সামাজিক ধস নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সমাজবিজ্ঞানী, আইনি পরামর্শক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
বিবাহবিচ্ছেদের উদ্বেগজনক তথ্য
জেলা রেজিস্টার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত গত দুই বছরের বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে জেলায় মোট ৪,৯৬৭টি বিবাহ নিবন্ধিত হয়, যার বিপরীতে তালাকের সংখ্যা ছিল ১,৮৬০টি। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫টি পরিবার ভেঙে গেছে।
পরের বছর ২০২৫ সালে বিবাহের নিবন্ধন বেড়ে দাঁড়ায় ৫,২০৩টিতে; তবে এর পাশাপাশি বিচ্ছেদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ২,০৫৮টিতে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেলায় বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬টি করে সংসার ভেঙে যাচ্ছে। গত এক বছরে শুধু আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনের মাধ্যমেই বিচ্ছেদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার খতিয়ান নয়—এর পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের করুণ গল্প।
কেন ভাঙছে দাম্পত্য: স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গবেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাম্পত্য জীবন ভেঙে পড়ার নেপথ্যে বহুমাত্রিক সামাজিক ও প্রযুক্তিগত কারণ সক্রিয় রয়েছে-
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার ও পরকীয়া: অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন আসক্তি ও ভার্চুয়াল যোগাযোগ অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্মৃতির সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি ঘটাচ্ছে।
মাদকাসক্তি ও অর্থনৈতিক চাপ: যুবসমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে মাদকাসক্তি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ পারিবারিক কলহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সহনশীলতার অভাব ও মানসিক দূরত্ব: দ্রুত সিদ্ধান্তের ঝোঁক এবং ক্ষমা ও ধৈর্যের অভাবের কারণে সামান্য পারিবারিক বিবাদেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে পা বাড়াচ্ছেন দম্পতিরা।
অল্প বয়সে বিয়ে: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বা মানসিকভাবে পরিপক্ক হওয়ার পূর্বে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া পরবর্তীতে গভীর ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্টদের মন্তব্য
হরিরামপুর উপজেলার চালা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আব্দুল বাছেদ বলেন, "মানুষের মধ্যে আগের তুলনায় ধৈর্য ও সহনশীলতা অনেকটাই কমে গেছে। অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা পারিবারিক জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে তুচ্ছ সমস্যাতেও অনেকে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কেবল আমাদের ইউনিয়ন পরিষদেই প্রতি মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি তালাকের আবেদন জমা পড়ছে।"
মানিকগঞ্জ জেলা কাজী সমিতির সভাপতি মো. ফজলুর রহমান বলেন, "সরকারি জেলা রেজিস্টার কার্যালয়ের তথ্যের চেয়ে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। জেলার সব বিয়ে ও তালাকের তথ্য সরকারি খাতায় সময়মতো জমা পড়ে না এবং অনেক কাজি বিকল্প নিবন্ধন বই ব্যবহার করেন। প্রকৃত বিচ্ছেদের সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হতে পারে। বর্তমানে সিংহভাগ ক্ষেত্রে নারীরাই তালাকের উদ্যোগ নিচ্ছেন, যার অন্যতম প্রধান কারণ স্বামীদের মাদকাসক্তি ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন।"
মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহিনুর রহমান বলেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ বিস্তার যেমন নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি করেছে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসের অভাব ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিচ্ছেদকে ত্বরান্বিত করছে। এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে পারিবারিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। একই সাথে পরিবারগুলোতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।"
সংকট নিরসনে করণীয়
পারিবারিক কাউন্সেলিং: বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন চূড়ান্ত করার আগে ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় পর্যায় থেকে কার্যকর কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সচেতনতা বৃদ্ধি: মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুস্থ ব্যবহার নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো।
ধর্মীয় ও পারিবারিক শিক্ষা: খুদে বয়স থেকেই সন্তানদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও সহনশীলতার শিক্ষা দেওয়া।
পিডিএস/এমএইউ









































