সুজিত দেব, বিশ্বনাথ (সিলেট)

  ১ ঘণ্টা আগে

বিধবা ও বয়স্ক ভাতার আবেদন

পৌরসভা-ইউনিয়নের গোলকধাঁধায় বন্দী ৫ হাজার হতদরিদ্রের ভাগ্য

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

বিশ্বনাথ, সিলেট: একমুঠো ভাতের নিশ্চয়তা আর শেষ বয়সের একটুখানি স্বস্তির আশায় বছরের পর বছর সরকারি দপ্তরের বারান্দায় ঘুরছেন সিলেটের বিশ্বনাথের অসহায় বিধবা ও দরিদ্র বয়োবৃদ্ধরা। কিন্তু পৌরসভা আর ইউনিয়ন পরিষদের আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় পড়ে আলোর মুখ দেখছে না তাঁদের ভাগ্য। আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় কয়েক হাজার বিধবা ও বয়স্ক ভাতার আবেদন বছরের পর বছর ধরে সমাজসেবা অফিসের ডাটাবেইজে ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে রয়েছে।

প্রশাসনিক ফাঁদে অবরুদ্ধ অধিকার

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৯ সালে বিশ্বনাথ পৌরসভা গঠিত হওয়ার পর ২০২২ সালে এখানে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ২০২৩ সালেও এই পৌরসভায় বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কোনো সরকারি বরাদ্দ ছিল না। নিরুপায় হয়ে পৌরসভার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা ভাতার আশায় তৎকালীন বিশ্বনাথ সদর ইউনিয়নসহ নিজ নিজ পুরোনো ইউনিয়নে আবেদন করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিগত তিন বছর আগে করা সেসব জীবন বাঁচানোর আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি, আবার বাতিলও হয়নি। ডিজিটাল সিস্টেমে আবেদনগুলো 'পেন্ডিং' বা প্রক্রিয়াধীন অবস্থায় ঝুলে থাকায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ।

উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত সমাজসেবার ডাটাবেইজে ৩ হাজার ৪৭টি বিধবা ভাতা, ২ হাজার ৯৬টি বয়স্ক ভাতা এবং ৪৯টি অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর ভাতার আবেদন পেন্ডিং রয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি অসহায় মানুষের ফাইল আটকে আছে লাল ফিতার দূরত্বে। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বিশ্বনাথ পৌরসভা সমাজসেবার মূল ডাটাবেইজেই অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৫ সালের মে মাসে এটি ডাটাবেইজে স্থান পায় এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ৩১ জন দরিদ্র বাসিন্দা ভাতার আওতায় আসেন, যা চাহিদার তুলনায় সমুদ্রের মাঝে একবিন্দু জলমাত্র।

ভুক্তভোগীদের বুকফাটা আর্তনাদ

পৌর এলাকার বাসিন্দা প্রান্ত বৈদ্য ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "আমি ২০২৩ সালে আমার বৃদ্ধা মায়ের জন্য বিধবা ভাতার আবেদন করেছিলাম। আজ তিন বছর পার হয়ে গেল, কোনো খবর নেই। ইউনিয়ন অফিসে গেলে বলে পৌরসভায় যেতে, আর পৌরসভায় গেলে নতুন আবেদন নেয় না। কারণ আগের আবেদনটি নাকি সিস্টেমে পেন্ডিং দেখাচ্ছে। এই গোলকধাঁধায় আমাদের মতো গরিবের কান্না শোনার কেউ নেই।"

খাজাঞ্চী ইউনিয়নের ছোট দিগলী গ্রামের রিনা বেগম অবশ চরণে ঘরের কোণে বসে দিন কাটান। কাঁপানো কণ্ঠে তিনি বলেন, "আমি বৃদ্ধ মানুষ, ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। ২-৩ বছর আগে বয়স্ক ভাতার আবেদন করেছিলাম। আজ পর্যন্ত কার্ড পাইনি। বহুবার ইউনিয়ন অফিসে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এখন নিরুপায় হয়ে ঘরে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনছি।"

দায় এড়ানোর চাদরে জনপ্রতিনিধিরা

এই দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বনাথ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দয়াল উদ্দিন তালুকদার সরাসরি দায় এড়িয়ে বলেন, "পৌরসভা এলাকার আবেদনের দায়-দায়িত্ব ইউনিয়ন পরিষদের নয়। চলমান ভাতাভোগীদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তবেই আমরা নতুন কাউকে সুযোগ দিতে পারি। তাছাড়া এবার আমি পুরো ইউনিয়নের জন্য মাত্র ১৮টি বিধবা ভাতার বরাদ্দ পেয়েছি, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।"

আশ্বাসেই বন্দী সমাজসেবা দপ্তর

যোগাযোগ করা হলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, "বিশ্বনাথ পৌরসভা আগে আমাদের ডাটাবেইজে ছিল না। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ঊর্ধ্বতনের সঙ্গে কথা বলে ২০২৫ সালের মে মাসে পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ড ফিল্টার করে ডাটাবেইজে অন্তর্ভুক্ত করেছি। ক্রমান্বয়ে নতুন বরাদ্দের ভিত্তিতে এই পেন্ডিং আবেদনগুলো অনুমোদন দেওয়া হবে।"

তবে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আমলাতান্ত্রিক ও কারিগরি জটিলতার দোহাই দিয়ে আর কতদিন এই অসহায় মানুষদের ভাতার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হবে? দ্রুত বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে এই ৫ হাজারের বেশি ঝুলন্ত আবেদন নিষ্পত্তি করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

পিডিএস/এমএইউ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়