সুপ্রিয় চাকমা শুভ, রাঙামাটি
বাংলাদেশে চলে ভারতীয় মোবাইল নেটওয়ার্ক

তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক। অথচ জরুরি প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজন কিংবা বাইরে পড়তে যাওয়া সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তাঁদের ভরসা করতে হয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর। দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা উঁচু গাছের মাথায় উঠে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভারতীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হচ্ছে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের প্রায় ১১ হাজার মানুষকে।
১৯৮৪ সালে ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের পর দীর্ঘ ৪২ বছর পার হলেও এই অঞ্চলের বাসিন্দারা নানা মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ২৮টি গ্রাম ও ৯টি ওয়ার্ডে বিভক্ত এই ইউনিয়নে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি মিলে প্রায় ১১ হাজার মানুষের বসবাস। ২০০৯ সাল থেকে দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের ব্যাপক সম্প্রসারণ হলেও দীর্ঘ ১৭ বছরেও এই দুর্গম এলাকায় বাংলাদেশের কোনো মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্ক পৌঁছায়নি। ফলে স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে ভারতীয় সিম ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব চলে যাচ্ছে ভারতের খাতে। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যেন এখন এক 'আকাশ-কুসুম' কল্পনা।
বিলাইছড়ির সাইচল এলাকার পাশেই জুরাছড়ি উপজেলার দুমদুম ইউনিয়ন। এই সীমান্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধার আশায় দিন গুনছেন। নিজস্ব নেটওয়ার্ক না থাকায় এখানকার মানুষ প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ও রাষ্ট্রীয় তথ্যপ্রাপ্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। পাশাপাশি রাঙামাটি, চট্টগ্রাম বা ঢাকায় পড়ুয়া সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাঁদের।
রাজস্থলী পার হলেই নেটওয়ার্ক 'অচল'
রাঙামাটি সদর থেকে বাঙ্গালহালিয়ার পথ ধরে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে রাজস্থলী উপজেলা। রাজস্থলী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও ফারুয়া রাস্তার সীমান্ত পার হওয়ার পরপরই বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বছরের পর বছর স্থানীয়রা দাবি জানিয়ে আসলেও এখানে কোনো টাওয়ার বসানো হয়নি। ফলে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের কোনো উপায় থাকে না। বাসিন্দাদের তখন বাধ্য হয়ে সাইচল পাহাড়ের চূড়ায় অথবা রাজস্থলী উপজেলা সদরে গিয়ে ফোনে কথা বলতে হয়।
অবহেলিত ফারুয়া ইউনিয়ন
ফারুয়া ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। এছাড়া চাকমা, মারমা, রাখাইন ও অল্পসংখ্যক বাঙালিও এখানে রয়েছেন। স্থানীয় ফারুয়া বাজারে সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিয়মিত মেলবন্ধন ঘটলেও এলাকাটির অবান্তর চিত্র বদলায়নি। যাতায়াতের জন্য ভালো রাস্তাঘাট কিংবা সুপেয় পানির যেমন সংকট রয়েছে, তেমনি সবার প্রধান ও অভিন্ন দাবি— দ্রুত এখানে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু করা হোক।
পাহাড়ের চূড়ায় মেলে ভারতীয় নেটওয়ার্ক
ফারুয়ার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাইচল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তরুণ-তরুণীরা পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় বা গাছে উঠে ভারতীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন। বসতবাড়ির ভেতরে বা সমতলে এই নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলেও ফারুয়া ইউনিয়নের বাকি এলাকার মানুষ এই সুবিধাটুকু থেকেও বঞ্চিত।
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও দাবি
দেশের প্রায় সব ইউনিয়ন ও দুর্গম এলাকায় মোবাইল টাওয়ার বসানো হলেও ফারুয়ায় কেন হয়নি— এই প্রশ্ন স্থানীয়দের। বছরের পর বছর সরকার পরিবর্তন হলেও জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া আশ্বাস আজও আলোর মুখ দেখেনি।
ফারুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা উত্তম কুমার তঞ্চঙ্গ্যা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার সন্তান রাঙামাটির বাইরে পড়াশোনা করে। কোনো জরুরি প্রয়োজনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি না। রাজস্থলী সদরে গিয়ে ফোন করতে হয়। এই নেটওয়ার্ক না থাকায় পুরো ১১ হাজার মানুষ এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করছে। ভোটের সময় সব দলের প্রার্থীরাই টাওয়ার বসানোর প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু পরে আর কেউ খোঁজ নেন না।"
একই এলাকার বাসিন্দা রাসনা চাকমা বলেন, "বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও আমরা দেশের নেটওয়ার্ক পাই না। সীমান্তের ভারতীয় সিমের মাধ্যমে কষ্ট করে যোগাযোগ বজায় রাখতে হয়। এখানে বাংলাদেশের সিম কোম্পানির টাওয়ার হলে আমাদের এই দুর্ভোগ কাটত।"
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের বক্তব্য
যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট মাধ্যম না থাকায় ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে রাঙামাটি শহরে অবস্থানকালে ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনন্দ তঞ্চঙ্গ্যা জানান, দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই মোবাইল সেবা পৌঁছে গেছে। ফারুয়ায় ১১ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস হওয়া সত্ত্বেও কেন এখনো নেটওয়ার্কের ব্যবস্থা করা হলো না, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এ বিষয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন বলেন, "আমি এই উপজেলায় সদ্য যোগদান করেছি। ফারুয়া ইউনিয়নের এই সমস্যার কথা আমি শুনেছি। যেহেতু আমি এখানে নতুন, তাই অনেক বিষয় এখনো বিস্তারিত জানার বাকি আছে। তবে বিষয়টি আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং আগামী উন্নয়ন সমন্বয় সভায় এটি উত্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।"
পিডিএস/এমএইউ









































