অন্জন কুমার রায়

  ২৩ ঘণ্টা আগে

দৃষ্টিপাত

যাদের অর্থনীতি কাগজে লেখা নয়

আমরা অর্থনীতিকে প্রায়ই ব্যাংকিং ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করি। ফলে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে, যারা ব্যাংকিং সেবার বাইরে, তারা যেন অর্থনীতিরও বাইরে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যাংকিং ব্যবস্থা যাকে অর্থনীতি হিসেবে দেখে, তা অর্থনীতির নথিভুক্ত অংশ মাত্র। তার বাইরে আছে এমন এক জগৎ, যেখানে টাকা আছে কিন্তু তার কোনো স্থায়ী ছাপ নেই। এই ছাপহীন অর্থনীতিতে বাংলাদেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী বাস করে। তারা আর্থিকভাবে বঞ্চিত নয় বরং এক ভিন্ন নিয়মে চলা অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। তাদের কাছে ব্যাংক মানে দূরের একটি প্রতিষ্ঠান; যেখানে যেতে সময় লাগে, কাগজ লাগে, নিয়ম বোঝা লাগে। তাদের কাছে টাকা মানে হাতে থাকা নগদ, আর নিরাপত্তা মানে নিজের চোখের সামনে থাকা অর্থ।

তারা বাঁচে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অর্থনীতিতে। এখানে কারো কাছ থেকে ধার নেওয়া মানে শুধু আর্থিক লেনদেন নয় বরং সামাজিক আস্থা। একজন রিকশাচালক যখন দিনে উপার্জিত টাকা বাসায় এনে ঘরে রাখে- সেটি ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত নয়, সেটি নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত। কারণ তার কাছে ব্যাংক মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয় বরং এমন একটি জায়গা যেখান থেকে সে আলাদা। এই আলাদা হওয়া মানে অন্তর্ভুক্তি নয়, বিচ্ছিন্নতা।

বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স- এর তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশে প্রাপ্ত বয়স্কদের একটি বড় অংশের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই বা থাকলেও সেটি সক্রিয়ভাবে ব্যবহার হয় না। এই তথ্যের ভেতরে যেটা হারিয়ে যায় তা হলো- এই মানুষগুলো প্রতিদিনই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এমন একটি ব্যবস্থায় কাজ করছে যা আনুষ্ঠানিক রেকর্ডের বাইরে কিন্তু অত্যন্ত সক্রিয়। এই মানুষগুলোই কৃষি উৎপাদন করে, শহরের শ্রমবাজার চালু রাখে, ছোট দোকান চালায়, গৃহ কর্ম করে, রিকশা চালায়, বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করে নগদ অর্থের মাধ্যমে প্রতিদিন অর্থনীতিকে সচল রাখে। তাদের লেনদেনের কোনো স্থায়ী নথি তৈরি হয় না। তারা ধার দেয়, ধার নেয়, সঞ্চয় করে, ঝুঁকি ভাগ করে- কিন্তু তাদের লেজার খাতা নেই, তাদের হিসাব সফটওয়্যারে নেই। ফলে তারা অদৃশ্য হয়ে যায় নীতি নির্ধারণের চোখে। কিন্তু অদৃশ্য হলেও তারা কোনোভাবেই প্রান্তিক নয়। তারা অর্থনীতির বড় ভিত্তি, যাদের ছাড়া পুরো ভোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সময় মানে সুদ, কিস্তি, মেয়াদ। কিন্তু ব্যাংকের বাইরে থাকা অর্থনীতিতে সময় মানে সম্পর্ক। আপনি আজ একজনের কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিলেন, কাল বা পরশু ফেরত দেবেন- এটা কোনো চুক্তি নয়, এটা সামাজিক সম্পর্ক বা প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার ওপর ভিত্তি করে লেনদেন পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় ‘খেলাপি’ শুধু আর্থিকভাবে পতন নয়, সামাজিক পতনও। তাই এটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকিংয়ের চেয়ে বেশি কঠোর, আবার কোনো ক্ষেত্রে বেশি নমনীয়ও।

এই অদৃশ্য অর্থনীতির আরেকটি স্তর হলো নগদ নির্ভরতা। নগদ টাকা এখানে শুধু বিনিময়ের মাধ্যম নয়, এটি নিয়ন্ত্রণেরও প্রতীক। এই নগদ নির্ভরতার পেছনে শুধু আর্থিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক কারণও কাজ করে। তাই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই নগদ রাখতে পছন্দ করে। ফলে তারা কর ব্যবস্থার বাইরে যেমন থাকে, তেমনি থাকে ক্রেডিট সিস্টেমেরও প্রান্তে। অথচ তাদের সমষ্টিগত ক্রয় ক্ষমতা শহরের অনেক বড় খুচরা বাজারকে টিকিয়ে রাখে। অর্থাৎ তারা অর্থনীতির কেন্দ্রের বাইরে নয় বরং কেন্দ্রের নিচে চাপা থাকা ভিত্তি। এখানেই বৈপরীত্য দেখা যায়। রাষ্ট্র এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতিকে দেখে ওপর থেকে নিচে। কিন্তু এই মানুষগুলো অর্থনীতি চালায় নিচ থেকে উপরে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোনো সরাসরি সংযোগ না থাকায় তৈরি হয় একটি দ্বৈত অর্থনীতি। একটি হলো নথিভুক্ত, অন্যটি নথির বাইরে বা অনানুষ্ঠানিক। এক্ষেত্রে, ডিজিটাল ফাইন্যান্স নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসগুলো আর্থিক লেনদেনকে সহজ করেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ঋণ। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ে ঋণ একটি হিসাব ভিত্তিক প্রক্রিয়া। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে ঋণ একটি সামাজিক চুক্তি। এখানে সুদের হার বেশি হলেও প্রবেশাধিকার সহজ। এই পার্থক্যই অনেক মানুষকে ব্যাংকের বাইরে ঠেলে রাখে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এই অনানুষ্ঠানিক আর্থিক কাঠামো অর্থনীতির মোট লেনদেনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু, যেহেতু এটি রেকর্ডবিহীন, তাই এটি নীতি নির্ধারণে অদৃশ্য থাকে। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ হারায়।

তাই, ব্যাংকের বাইরে থাকা মানুষদের অর্থনীতি মূল ব্যবস্থার সংস্করণ, যা ভিন্ন নিয়মে চলে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারা অন্তর্ভুক্তির বাইরে। কিন্তু বাস্তবে তারা প্রতিদিন অর্থনীতিকে চালু রাখে। এই ব্যবস্থার আরেকটি বড় দিক হলো সঞ্চয়ের ধরন। ব্যাংকে সঞ্চয় না থাকলেও মানুষ সঞ্চয় করে। কেউ ঘরে টাকা রাখে, কেউ স্বর্ণ কিনে রাখে, কেউ আবার স্থানীয় সমিতিতে টাকা জমা দেয়। যদিও এখানে কোনো রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা তেমন নেই। তবু মানুষ এটাকেই বেছে নেয়, কারণ এখানে সহজলভ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মূলকথা, অর্থনীতি কোনো কাগজে আঁকা মানচিত্র নয় বরং মানুষের জীবনযাত্রার প্রবাহ। এই প্রবাহকে বুঝতে না পারলে উন্নয়ন নীতি যতই শক্তিশালী হোক, তা বাস্তব মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। যাদের অর্থনীতি কাগজে লেখা নয়, তারা কোন বিচ্ছিন্ন শ্রেণি নয় বরং অর্থনীতির বৃহৎ ও সক্রিয় অংশ। তাদের অর্থনীতি শুধু রেকর্ডবিহীন। আধুনিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই রেকর্ডবিহীন জীবনকে ধীরে ধীরে এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যেখানে আস্থা, সহজতা এবং প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে। তাই অন্তর্ভুক্তির প্রকৃত অর্থ মানুষকে বদলে ফেলা নয় বরং ব্যবস্থাকে মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। যদিও এই ব্যবধান কমাতে ব্যাংকগুলো প্রযুক্তি নির্ভর সমাধানের পাশাপাশি মানুষের আস্থা অর্জনে সচেষ্ট রয়েছে। তাছাড়াও, ব্যাংকিং ব্যবস্থা মানুষের ভাষা, সময়, সামর্থ্য ও আস্থাকে সবসময়ই গুরুত্ব দিচ্ছে। এই আস্থা যত বাড়বে, ততই আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যবধান তত কমবে। তখন অর্থনীতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু কাগজে নয়, বাস্তব জীবনেও আরো সুদৃঢ় হবে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলাম লেখক

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়