ড. মতিউর রহমান
মতামত
জলবায়ুর সামাজিক ব্যয় : দায় কার?

চলতি জুলাই মাসে বাংলাদেশ যেন একযোগে দুইভাবে ডুবছে, আর এই দুই ভিন্ন দৃশ্যপট আসলে একই সংকটের গল্প বলছে। একদিকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল প্রলয়ঙ্করি পাহাড়ি ঢলে ভাসছে, অন্যদিকে খোদ রাজধানী ঢাকা ডুবছে তার নিজস্ব অবহেলা আর মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতার চড়া মাশুল গুনে।
দক্ষিণ-পূর্বে জুলাইয়ের শুরু থেকে চলা অবিরাম বর্ষণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ- এই সাতটি জেলা আজ বিধ্বস্ত। ১০ লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত, জলবন্দি প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার, আর ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ; যাদের অনেকেরই দুবেলা রান্না করার মতো ন্যূনতম জায়গা নেই। তিন দিনে চট্টগ্রামে ৮১৫ মিলিমিটার, ল্যামায় ৫১৮ মিলিমিটার আর কক্সবাজারে ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পরিসংখ্যান স্রেফ সংখ্যা নয়, এক মানবিক হাহাকারের খতিয়ান। হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ২৫টি গ্রাম। অন্যদিকে কক্সবাজারে বন উজাড় হওয়া নড়বড়ে পাহাড়ের ঢালে ভূমিধসে প্রাণ হারিয়েছেন নারী ও শিশুসহ ১৬ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। দেশজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা এরই মধ্যে ৫১ ছাড়িয়েছে, এবং প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি সরকারি সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছেন।
এদিকে, রাজধানীও যেন তার চেনা উপায়ে ডুবছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ভারী বৃষ্টিতে ঢাকা বারবার তলিয়েছে- কখনো এক সকালে ৭৬ মিলিমিটার, কখনো এক বিকেলে ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, উত্তরা, বনানী, গুলশান, বাড্ডা ও পুরান ঢাকার রাস্তাগুলো নদীতে পরিণত হয়েছে। কোথাও হাঁটু-জল, কোথাও কোমর-জল। অফিসযাত্রীরা নিরুপায় হয়ে হেঁটে কর্মস্থলে গেছেন, রিকশাভাড়া বেড়েছে চারগুণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের কক্ষে পানি ঢুকে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সারা দেশে স্কুল-কলেজ এবং চট্টগ্রামে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। পুরান ঢাকার এক যুবক তার অসুস্থ মায়ের জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে তিনগুণ বেশি ভাড়া দিয়েও যখন একটি হাসপাতালমুখী যানবাহন মেলাতে পারছিলেন না, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়- আমাদের মহানগরের নাগরিক নিরাপত্তা আজ কতটা ভঙ্গুর।
ঢাকার জন্য এই দৃশ্যপট নতুন নয়, আর ঠিক এখানেই আমাদের আসল ট্র্যাজেডি। ২০১০ সাল থেকে এই রাজধানী ৩ হাজার ৪০০ একরেরও বেশি প্রাকৃতিক জলাধার, জলাশয় ও বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হারিয়েছে, যা প্রাকৃতিকভাবে শহরের অতিরিক্ত পানি শোষণ করত। একসময় মধ্য ঢাকার এক-পঞ্চমাংশ (২১ শতাংশ) এলাকাজুড়ে জলাশয় ছিল; আজ তা সংকুচিত হতে হতে ৩ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। সবুজ এলাকা ২২ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ শতাংশে। নগর কর্তৃপক্ষ ১৪১টি জলাবদ্ধতার কেন্দ্রস্থল চিহ্নিত করলেও শহরের দক্ষিণে প্রয়োজনীয় ১০টি পাম্পিং স্টেশনের মধ্যে চালু আছে মাত্র ৩টি! এটি প্রকৃতির কোনো দুর্ভাগ্য বা অভিশাপ নয়; এটি আসলে সেই মাটিই কংক্রিটে ভরাট করার অবশম্ভাবী পরিণতি, যা একসময় বৃষ্টির পানিকে স্বাভাবিক পথ করে দিত।
পাহাড়ি ঢল আর রাজধানীর জলাবদ্ধতাকে আপাতদৃষ্টিতে দুটি পৃথক জরুরি অবস্থা মনে হলেও, এদের উৎস একই : প্রবল বৃষ্টিপাতকে ধারণ করার যে নিজস্ব প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমাদের ছিল, আমরা ক্রমাগত তাকে ধ্বংস করে চলেছি এবং পানি যাওয়ার আর কোনো পথ না পেয়ে শেষমেশ আকাশকে দোষারোপ করছি।
বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ০.৫ শতাংশেরও কম অবদান রেখেও বাংলাদেশ জলবায়ু দুর্যোগে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ‘স্টেট অফ দ্য গ্লোবাল ক্লাইমেট ২০২৫’ প্রতিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে প্রায় ১.৪৩-১.৪৪ক্ক সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে- সর্বোত্তম বৈশ্বিক প্রচেষ্টাও এই ধারাকে দ্রুত পাল্টাতে পারবে না। ২০২৫ সালের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১.১৭ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ২০৫০ সালের মধ্যেই আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৯ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করার হুমকি দিচ্ছে। আইপিসিসি নিশ্চিত করেছে যে, এই উষ্ণায়ন এরই মধ্যে বৃষ্টিপাতের ধরন ও ঝড়ের তীব্রতা আমূল বদলে দিয়েছে। তবে এই বর্ষায় যারা জলমগ্ন হয়ে বেঁচে আছেন, তাদের এই রূঢ় সত্য বোঝার জন্য কোনো বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনের প্রয়োজন নেই।
যে বিষয়টি আরো বেশি মনোযোগের দাবি রাখে তা হলো, এই মহামারি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের বাস্তব পরিণতি কী হয়। ২০১০ সালে পাস হওয়া ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন’-এ জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য জিডিপির ০.৮ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের একটি স্বাধীন পর্যালোচনা দেখাচ্ছে, সেই অর্থের মাত্র ২৪ শতাংশ পৌঁছেছে প্রকৃত ভুক্তভোগী মানুষের কাছে। বাকি ৭৬ শতাংশ অর্থ আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, মধ্যস্বত্বভোগী আর জীবন রক্ষার মতো টেকসই কাজের পরিবর্তে চটকদার ও দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণের মোহে কর্পূরের মতো উড়ে গেছে- যার মধ্যে হয়তো সেইসব নর্দমা ও খালও ছিল যা ঢাকাকে শুকনো রাখতে পারত। আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা পরামর্শক গোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক একটি পর্যালোচনা বলছে, দেশে জলবায়ু সম্পর্কিত ৫৭টি পৃথক নীতি রয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নকারী এগারোটি ভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত, যার জবাবদিহি বা নেতৃত্বের ভার স্পষ্টভাবে কারো কাঁধে নেই।
এই একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা সবচেয়ে বেশি টের পান আমাদের কৃষকরা। দেশের ৪০ শতাংশের বেশি শ্রমশক্তি কৃষির ওপর নির্ভরশীল, যার একটি বড় অংশ বাস করে লবণাক্ততায় আক্রান্ত উপকূলীয় অঞ্চলে। কৃষকরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার জন্য বসে না থেকে নিজেদের মতো করেই খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন- লবণ-সহনশীল বীজ ব্যবহার করছেন, বপনের সময় পরিবর্তন করছেন এবং নিজেদের উদ্যোগে নালা খনন করছেন। কিন্তু গবেষকরা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন : রাষ্ট্রীয় সমর্থন ছাড়া এই ধরনের আত্মনির্ভরশীলতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা অনির্দিষ্টকাল টিকতে পারে না।
২০২৫ সালের শেষের দিকে করা আরেকটি গবেষণায় উঠে এসেছে, বরিশালের মতো বন্যা ও লবণাক্ত এলাকাগুলো খাদ্য নিরাপত্তায় নিরাপদ অঞ্চলগুলোর চেয়ে বহুগুণ পিছিয়ে পড়েছে, যার সর্বোচ্চ মূল্য দিতে হচ্ছে শিশুদের। গঙ্গা ব-দ্বীপ অঞ্চলের গবেষণার মূল উপসংহারটি আমাদের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত : বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে উপেক্ষা করে যখন কোনো অভিযোজন নীতি নেওয়া হয়, তখন তা সংকটের সমাধান না করে বরং সেই বৈষম্যকে আরো দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর করে তোলে।
জলবায়ু নীতির এই অস্বস্তিকর দিকটি নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকরা প্রকাশ্যে আলোচনা করতে চান না। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ নিকোলাস স্টার্ন একবার জলবায়ু পরিবর্তনকে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘বাজার ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং যুক্তি দিয়েছিলেন, বিলম্বের মূল্য সবসময়ই বেশি; ফলে আগাম পদক্ষেপের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই। বৈশ্বিক ফোরামে ধনী দেশগুলোর কাছে তহবিল চাওয়ার সময় বাংলাদেশ দক্ষতার সঙ্গে এই যুক্তিটি ব্যবহার করে। কিন্তু একই লজিক যখন দেশের অভ্যন্তরে প্রয়োগ করার কথা আসে, তখন আমরা রহস্যজনকভাবে নীরব থাকি। ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সহনশীল কৃষি কিংবা বাস্তুচ্যুত প্রান্তিক পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ- আমাদের ভেতরের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতারই প্রমাণ, যার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এই চলতি জুলাই মাসে।
ভবিষ্যতের বিপদ আরো ভয়াবহ। বিশ্বব্যাংকের নভেম্বর ২০২৫-এর একটি প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চরম তাপপ্রবাহের এবং এক-চতুর্থাংশ মানুষ ভয়ংকর বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে। ২৫০টি উপকূলীয় গ্রামের ওপর পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোই (যেমন মজবুত বাঁধ ও ড্রেন) মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন, অথচ এই চাহিদাই সবচেয়ে কম পূরণ হচ্ছে। কারণ আমাদের জলবায়ু অর্থায়ন সাতক্ষীরার জেলে পরিবার, জামালপুরের চরের কৃষক, হবিগঞ্জের বাঁধভাঙা গ্রামবাসী কিংবা প্রতিবার বৃষ্টি হলেই নর্দমার নোংরা জলে হেঁটে চলা শেওড়াপাড়ার বাসিন্দাদের দিকে না গিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বড় বড় বাণিজ্যিক ও চটকদার প্রকল্পের দিকে।
আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্যায়টি খুব ভালো করেই লক্ষ্য করছে। ২০২৫ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের যুবসমাজ তীব্রভাবে সচেতন যে তারা এমন একটি পঙ্গু সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাচ্ছে, যা তৈরিতে তাদের কোনো হাত ছিল না। তাদের এই ক্ষোভ কোনো বিমূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক নয়, বরং এটি তাদের ফসলের মাঠ হারানো, অসময়ের বন্যা আর শরণার্থী শিবিরের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের ভবিষ্যতের এক ন্যায্য দাবি।
দার্শনিক হেনরি শু যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এক প্রজন্মের সৃষ্ট দূষণ তার নেতাদের ওপর পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষা করার একটি অনস্বীকার্য নৈতিক দায়িত্ব অর্পণ করে। বাংলাদেশের জন্য এই ধারণাটি দ্বিমুখী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি আমাদের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ দাবির যৌক্তিকতা দেয়, আর দেশের অভ্যন্তরে এটি আমাদের নিজেদের সন্তানদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার নামান্তর; বিশেষ করে সেই শিশুদের প্রতি, যারা এই সপ্তাহে তাদের শ্রেণিকক্ষ জলমগ্ন হওয়ায় স্কুলে যেতে পারছে না।
এখানে অর্থের অভাবের চেয়ে সদিচ্ছার অভাবই প্রকট। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের বছরে প্রায় ১২.৫ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ। অথচ ২০২৩ সালে দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করেছে মাত্র ৩৩৩.৮৯ মিলিয়ন ডলার, যা ২০৪১ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বড্ড সামান্য। গ্রিন বন্ড এবং ক্লাইমেট ফান্ডের কাগজি পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো ভঙ্গুর।
যৌথ সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য নোবেলজয়ী এলিনর অস্ট্রম দেখিয়েছিলেন যে, যেকোনো সম্মিলিত উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করে সুস্পষ্ট দায়িত্ব, প্রকৃত অংশগ্রহণ এবং সৎ জবাবদিহিতার ওপর। আমাদের জলবায়ু ও নগর প্রশাসনে এর প্রায় কোনোটিই নেই। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা এবং অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় নেই বললেই চলে- যা খোদ ঢাকার প্রকৌশলীরাও অকপটে স্বীকার করেন। ঠিক এই ধরনের ব্যবস্থারই ব্যর্থতার ব্যাপারে অস্ট্রম সতর্ক করেছিলেন। এর সমাধানের জন্য কোনো নতুন তত্ত্বের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু যা শুরু হয়েছে তা শেষ করার সদিচ্ছা: বহু বছর আগে চিহ্নিত খালগুলো উদ্ধার ও পরিষ্কার করা, পাম্পিং স্টেশনগুলোতে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করা এবং একাধিক সংস্থার ওপর দোষ চাপানোর সংস্কৃতি বন্ধ করে একটি সংস্থাকে সুস্পষ্ট কর্তৃত্ব ও জবাবদিহিতা দেওয়া।
প্রয়াত জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. সলিমুল হক তার কর্মজীবনজুড়ে এই সত্যটিই বলে গেছেন যে, জলবায়ু অভিযোজন কোনো স্রেফ প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক বিষয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্তর্ভুক্ত করা; তা কক্সবাজারের পাহাড়ি শিবিরেই হোক বা পুরান ঢাকার জলমগ্ন গলিতেই হোক।
বাংলাদেশের সক্ষমতার কোনো কমতি নেই। আমাদের বিশ্বমানের জলবায়ু বিজ্ঞানী আছেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করা এক সক্রিয় সুশীল সমাজ আছে এবং এমন এক তরুণ প্রজন্ম রয়েছে যারা নিজেদের অস্তিত্বের ঝুঁকিটি বোঝে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমাদের অতীত সাফল্য প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারি। যা অনুপস্থিত তা হলো সেই একই শৃঙ্খলার প্রয়োগ, যা কম নাটকীয় কিন্তু আরো কঠিন সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে দরকার- যেগুলো আমাদের নিজেদের রাস্তা এবং নদীর পাড়ের নিচে লুকিয়ে আছে।
অবশেষে বৃষ্টি কমবে, ঢাকার রাস্তাঘাটের পানি নেমে যাবে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামও বদলে যাবে অন্য কোনো নতুন বিষয়ে। হবিগঞ্জের গ্রামবাসীরা হয়তো আবারও নিজ হাতে তাদের ভেঙে যাওয়া বাঁধ পুনর্নির্মাণ শুরু করবে। কিন্তু বাংলাদেশের নিজের বিবেকের কাছে যে দায়বদ্ধতা বা দেনা রয়েছে, তা এই বন্যার পানির সাথে নেমে যায় না। আমাদের জলবায়ু যুদ্ধের জয়-পরাজয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বা ফসলের ক্ষতির পরিমাণ দিয়ে মাপা হবে না; বরং মাপা হবে পরবর্তী বর্ষণের আগে আমাদের নর্দমাগুলো মেরামত করা হয় কি না, প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিই সমন্বয় করে কি না এবং রাষ্ট্র মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর পরিবর্তে তার সবচেয়ে অরক্ষিত নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারে কি না- তার ওপর। সেই সুযোগের সময় প্রতি বছরই সংকুচিত হচ্ছে। নিজেদের সন্তানদের কাছে রাষ্ট্রের এই দীর্ঘদিনের ঋণ শোধ করার সময় এখনই।
লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী
"





































