আব্দুর রউফ চৌধুরী

  ২৬ জুন, ২০২৬

ধারাবাহিক উপন্যাস, পর্ব ১৫

অনিকেতন

বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন কাজি। পা ফেলার ধরনে ব্যস্ততা থাকলেও অস্বাভাবিক কিছু নেই, কিন্তু তার চোখে-মুখে চিন্তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে তিনি অত্যন্ত বিরক্ত। উইংটন প্রাইমারি স্কুলের পাশে একটি কার ডিজেলের উগ্রগন্ধ ছড়িয়ে কিংসক্রসের দিকে ছুটতে লাগল, আর কাজি তার ট্রাউজারসের পকেট থেকে একটি রুমাল বের করে মুখ মুছতে মুছতে বদরুদ্দিনের বাড়ির দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন।

কাজি তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছনোর আগেই মাসুদ মিয়া অফিসঘরে প্রবেশ করে, চোখে-মুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ফুটিয়ে বদরুদ্দিনকে বললেন, ‘আলহাজ সাহেব এখনো আসেননি বুঝি! ভালোই হয়েছে, আমি বাসা হয়ে একবার ঘুরে আসি!’ বদরুদ্দিন একটা সিগারেট ঠোঁটের মধ্যখানে স্থাপন করে কী যেন বলতে গিয়ে চোখ তুলে তাকাতেই তার চোখ দুটো ধাঁধিয়ে উঠল, দৃষ্টি তার অস্বাভাবিকভাবে ধাক্কা খেল, মাসুদ মিয়াকে নতুন সুটে বেশ স্মার্টই দেখাচ্ছে। বদরুদ্দিনের মুখ থেকে কোনো কথা বেরোনোর আগেই মাসুদ মিয়া যোগ করলেন, ‘যখন দেখব আলহাজ সাহেবের দামি গাড়িটি আপনার বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে তখনই আমি তড়িঘড়ি করে চলে আসব।’

মাসুদ মিয়ার কথায় বদরুদ্দিন নিশ্চুপ থাকতে পারলেন না, ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে নিতেই ধরা পড়ল তার ঠোঁটের মাঝখানের পানের রসের দাগটি- এ-যেন পুকুরের জলতরঙ্গে পশ্চিমাকাশে ঢলে-পড়া সূর্যের কিরণ, কমলারঙের ঝিলিক। বদরুদ্দিন বললেন, ‘আলহাজ সাহেব অনেক আগেই এসে পৌঁছেছেন। পাশের ঘরে নামাজ আদায় করছেন। জোহরের নামাজের সময় যায়-যায়, তাই যেমন- তেমন করে সেরে নিচ্ছেন।’

মাসুদ মিয়ার কণ্ঠ নীরস, নিস্তব্ধ। সমস্ত মুখ একঝলকে তীব্র রাঙা হয়ে উঠল। বদরুদ্দিন আরেকটি পানের খিলি মুখে পুরলেন। মাসুদ মিয়া সেদিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন : বদরুদ্দিনের পান-সিগারেটে বড্ড শখ! জর্দার গন্ধে সবসময় মোহিত থাকেন। বিলাতি শীতে পান ও সিগারেট সুরার মতো কাজ করে বলে হয়তো বদরুদ্দিনের বিশ্বাস, যুক্তি দিয়ে বিশ্বাস কখনো খণ্ডানো যায় না, ধর্মবিশ্বাসের বেলায়ও না। পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে অভ্যাস জন্মে, পরিবেশজাত অভ্যাস ক্রমেই বটবৃক্ষের মতো শিকড় মেলে, ডালপালা ছড়িয়ে আচ্ছাদিত করে পড়শির অঙ্গন, বা বলা যায়- অভ্যাস অজান্তেই অন্তরে দানা বেঁধে একসময় বিশ্বাসাকারে আস্তানা বাঁধে। এই আস্তানায় স্তরের-পর-স্তর সৃষ্টি করে বছরের-পর-বছর পলি জন্মে চর তৈরি করে। সেখানে জ্ঞানচালিত যুক্তির নৌকার চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। আর পান-তামাকের বেলায় তো কথাই নেই। পান-তামাক সেবনের অভ্যাস বঙ্গদেশে সামাজিক প্রথায় পরিণত হয়েছে। চুন-সাদা-জর্দাসহ পান পরিবেশন করা বঙ্গীয় সমাজের এক বিশেষ সামাজিক অঙ্গ। ধূমপান ও পান-চিবানো- এই দুটোয় বদরুদ্দিন খুবই অভ্যস্ত, তাই সভাসমিতিতে এই নিয়ে থাকেন প্রচুর ব্যস্ত।

পানসুপারি ও চুনজর্দার মিশ্রিত কমলারং এখনো শোভা পাচ্ছে তার কালো অধরপ্রান্তে, যেন ষোড়শীর লিপস্টিক; আর ডানহাতের মধ্যমা ও তর্জনীর মাঝখানে সিগারেট নিঃসৃত নিকোটিনমিশ্রিত রসে বাদামি চামড়াকে করে দিয়েছে কৃষ্ণকালো। দুই আঙুলের ফাঁকে ধারণ করা একটি সফেদ কমদামি সিগারেট থেকে বেরিয়ে আসছে ধূসর-কাঁপানো ধোঁয়া। মাসুদ মিয়ার সঙ্গে কথাবলার সময় যে-ফাঁক পড়ল তা পূরণের জন্য ওঠাউঠি কয়েকটি সুখটান দিলেন সিগারেটে। তারপর শেষাংশটুকু অ্যাশট্রের অভাবে কার্পেটশূন্য মেঝেয় জুতোর অগ্রভাগ দিয়ে গুঁড়িয়ে চোখ তুলে তাকালেন মাসুদ মিয়ার দিকে। দেখতে পেলেন মাসুদ মিয়ার চোখে-মুখে ফুটে রয়েছে একরকম অবিশ্বাসের চিহ্ন- শিশুর হাত থেকে যখন বড়রা সুইট নিয়ে পালিয়ে যায় তখন তার মুখের যেমন অবস্থা হয় ঠিক তেমনই। ঠোঁটের কোণে ম্লানহাসি টেনে মাসুদ মিয়া বললেন, ‘আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে, বঙ্গবিখ্যাত ব্যবসায়ী এসেছেন ভোঁ-ভোঁ করে একটি ভাঙা ভ্যানে? আপনার দরজার সামনে একটা ভাঙা ভ্যান ছাড়া আর কিছুই আমার চোখে পড়েনি।’

বাইরের শীতকালীন আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছে বদরুদ্দিনের মুখের ওপর, আর সেই আলো তার অপ্রকাশিত চিন্তারেখাকে টগবগ করে ফুটিয়ে তুলেছে। দস্তাবেজে দ্বীনের ভাঙা ভ্যানের দৃশ্যটি-যে মাসুদ মিয়ার কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাবে বা তিনি এমনি জবাব দেবেন, তা একটু আগেও অনুমান করতে পারেননি বদরুদ্দিন। তিনি যা বললেন তার মানে বোঝাও বদরুদ্দিনের কাছে অসম্ভব নয়, তাই তিনি মাথা নেড়ে সায় দিলেন, ‘হ্যাঁ।’

অবাক হয়ে মাসুদ মিয়া বললেন, ‘রোলসরয়েস তো দূরের কথা, বিএমডব্লিউও না!’

ঠিক তখনই দস্তাবেজে দ্বীন নামাজ সেরে, পর্দা সরিয়ে মাসুদ মিয়ার কাছে এসে উপস্থিত হলেন। বললেন, ‘প্রতিবেশীর ঈর্ষার অভিশাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য এবং নিজেকে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থেকে মুক্ত রাখার মানসে নিজের আরাম-আয়েশের সুখচিন্তা জলাঞ্জলি দিয়েছি। এই কারণেই সদ্যক্রয়কৃত আমার সাধের রোলসরয়েসটি হস্তান্তর করেছি এবং এর পরিবর্তে ধনীপরিত্যক্ত সাধারণ একটি ভ্যান চালানোর চেষ্টা করছি কিছুদিন ধরে, মনের সমস্ত সাহস হাতের মুঠোয় ধারণ করে।’ মাসুদ মিয়ার দম বন্ধ হয়ে গেল, রসালো বিদ্রূপ শোনার জন্য তার মন একেবারেই প্রস্তুত নয়, তার মুখটি স্বল্প ঘামসিক্ত হয়ে উঠেছে। বিষাদসিন্ধুর ভাষায়, পাণ্ডিত্য প্রকাশের জন্য দস্তাবেজে দ্বীন যোগ করলেন, ‘যা বিলিয়ে দেওয়া যায় না, তা ব্যবহার করা সাধারণ সমাজে যে কত বিড়ম্বনা, এই কথা বোঝানো সম্ভব নয়। ঐশ্বর্যের সঙ্গে ঐশীগুণাবলির সমন্বয়ে দৌলতওয়ালার দায়িত্বজ্ঞান সমুন্নত হয়। ধনদৌলত দান করার পূর্বেই আল্লাহ পারিপার্শ্বিকতা অনুযায়ী পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণে বৈশিষ্ট্যদান করে থাকেন, তার মনোনীত মানুষকে।’

একে-একে সৈয়দ সঞ্জব আলি, তাজিদউল্লা, হাজি শামসুল হক ও আখলাক মিয়ার আগমনে আলাপ জমে উঠল পুরোদমে, ছেলেমানুষি আলাপই বটে। কাজি আবুল ফজলও এসে উপস্থিত হলেন ঠিক তখনই। সর্বশেষে প্রবেশ করলেন সফিকুল ইসলাম আর তার সঙ্গে কয়েকজন সদস্য, সমভিব্যাহারে শোরগোল করতে-করতে; কাজির কানে ভেসে এলো তাদের আলাপের কিছু অংশ- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষে মিলিটারি শাসক এরশাদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত- এটি নিয়ে তর্কবিতর্ক...

অফিসঘরে ঢুকে ওভারকোট খুলে নিলেন একে-একে সকলেই। বৃষ্টিভেজা শিরশির শীতে পা-টিপে, বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে দীর্ঘপথ অতিক্রম করা সহজ কথা নয়, বরং জুতোর ভেতর পাদুটো আড়ষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়, একই সঙ্গে আঙুলগুলোও অবশ হয়ে যায়, তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। আবহাওয়া পরিবর্তনের অস্বাভাবিক আকস্মিকতায় সৃষ্ট জড়তা দূরীকরণার্থে ধূমপান করার নাকি নেহাত প্রয়োজন- এই কথা ভেবেই হয়তো-বা কাজি ছাড়া একে-একে সকলেই সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলেন। বেণির আকারে কুণ্ডলী পাকিয়ে বঙ্গসন্তানদের মুখনিঃসৃত ধূম্রজাল ঘরের বাতাসকে আর্দ্র করে তোলে, গন্ধময়ও বটে। শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলা কষ্টকর বুঝে দক্ষিণের জানালা খুলে দিলেন আখলাক মিয়া। খোলা জানালাপথে অপূর্ব শুভ্রসুন্দর বিস্তীর্ণ প্রান্তর অবলোকনে মৃন্ময় দেহাভ্যন্তরে জাগরূক হলো প্রশান্ত চিন্ময়- শান্তির প্রতীক, বৃষ্টি-আবৃত ব্রিটেন, শ্বেতবেশে জৈন সন্ন্যাসীর তপস্যারত অবস্থা। বাইরের প্রকৃতির বেশ-পরিবর্তনের অপরূপ সমারোহ চলছে আর ভেতরে দরজা-বন্ধ-রাখা ঘরে বন্দি কয়েকটি প্রাণী কথার মাতম তুলছেন।

মাতম চলতে লাগল ইলশাগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যদিয়েই।

মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর ইলশাগুঁড়ি বৃষ্টি রুবেলের মনকে বিরক্তিতে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অবশ্য এই বাড়িতে আশ্রয় পাওয়ার পর থেকেই সে সর্বপ্রকার প্রশ্রয় পেয়ে আসছে তবু এই বৃষ্টিভেজা দিনটি তার মনকে বিরক্তের গহন অতলে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য এই প্রশ্রয়ের কারণে মাঝেমধ্যে তার মনের বাসনার বেগ হয়ে ওঠে উচ্ছৃঙ্খল। তখন পরের আকাঙ্ক্ষার চাপ সে কোনোমতেই সহ্য করতে পারে না। নিজের প্রতিজ্ঞা বা পরের অনুরোধ তাকে একান্ত বাধ্য করে তোলে বলেই হয়তো-বা কেউ যখন বিয়ের প্রস্তাব দেয়, তখন সে অকারণেই অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ওঠে এবং বিমুখ হয়ে বসে থাকে বিলাতি ইলশাগুঁড়ি বৃষ্টির আকাশের মতো। কিন্তু রান্নাঘরে যখন রোকসানা তাকে স্টিমবোটের পশ্চাতে বাঁধা ডিঙি নৌকার মতো মমতা করে বললেন, ‘বাবা রুবেল, লোকে যে আমাকে নিন্দা করে’; তখন সে বলল, ‘কেন?’

‘তুমি বিয়ে করলে পাছে পর হয়ে যাও, এই ভয়ে তোমার বিয়ে নাকি আমরা দিচ্ছি না।’

‘ভয় তো হওয়াই স্বাভাবিক। আমি মা হলে আমার ছেলেকে বিয়েই দিতাম না। লোকের নিন্দা মাথা পেতে গ্রহণ করতাম।’

‘শোনো, পাগল ছেলে কী বলে! এটি তোমার বাড়াবাড়ি। যখন যা তখন তাই শোভা পায়। যা হোক, তোমার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। মেয়েটি দেখতে খুবই সুন্দরী, পড়াশোনাও জানে। তোমার পছন্দের সঙ্গে মিলবে বেশ।’

রুবেল বলল, ‘বিলাতে আমার মতো ছেলে তো ঢের রয়েছে।’

‘এই তোমার দোষ, বিয়ের কথা পাড়ার জো নেই।’

‘বিয়ের কথা ছাড়াও কথাবলার অভাব নেই। অতএব এটি মারাত্মক দোষ নয়।’ তবে সে জানে, রোকসানার সাহায্য ব্যতীত তার আহার-বিহার, আরাম-বিরাম কিছুই সম্পন্ন করার জো নেই। তাই যোগ করল, ‘ঠিক আছে, কন্যাকে একবার দেখে আসা যায়।’ পরক্ষণে কী যেন কী ভেবে বলল, ‘না-না, দেখে আর কী হবে। আপনাকে খুশি করার জন্যই তো বিয়ে করব। তাই ভালোমন্দ বিচার আপনিই তো করবেন। তাই না!’

কথাটির মধ্যে একটু উত্তাপ ছিল, কিন্তু রোকসানা নিশ্চিন্তচিত্তে ভাবতে লাগলেন, শুভদৃষ্টির সময় নিজের পছন্দের সঙ্গে যখন রুবেলের পছন্দের মিল হবে তখন তার কড়িসুর কোমল হয়ে যাবে।

রুবেল নিশ্চয় জানে, রোকসানা তাকে যা বলছেন, তার মধ্যে স্নেহ ছাড়া আর কিছুই নেই। তা ছাড়া এও তার অজানা নয় যে, লাভলীকে কোনো সূত্রে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে সুখী দেখতে চান তিনি। রোকসানার এই মনোগত ইচ্ছে তার কাছে স্বাভাবিক এবং অত্যন্ত করুণাবহ বলে মনে হলো। তবু সে ভাবতে পারল না, কন্যাদায়গ্রস্ত মা সরাসরি তাকে পাকড়াও করলেন কেন? এই কথা মনে আসতেই তার প্রাণে বিষম যন্ত্রণা শুরু হলো। বুকে বিষম মোচড় দিল।

রুবেল খাবারঘরযুক্ত রান্নাঘর ছেড়ে আবার তার শোবারঘরে এসে পড়াশোনায় মন বসাল। পড়তে-পড়তে ক্লান্তও হল। তবু তার মন থেকে রোকসানার কথাগুলো একেবারের জন্যও সরাতে পারল না।

শুরু হলো আনুষ্ঠানিকভাবে সভা। সভাপতির নির্দিষ্ট আসনে বসে কাজি গত সভার আলোচ্যবিষয় সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে কি না তা দেখে নিলেন, তার চোখের ট্রুভিশনের মাধ্যমে। তারপর মসজিদ-নির্মাণের প্রস্তুতি-প্রস্তাব কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সে নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন। ব্যাপক তর্কবিতর্কের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সমীচীন বলেই শুরু হয় আলোচনা।

প্রথমে দস্তাবেজে দ্বীন দীর্ঘ বক্তৃতার মাধ্যমে তার বদান্যতা ও ধর্মানুরাগের বিভিন্ন দিক উদ্ঘাটন করে স্বীয় প্রতিভার বহুমুখী স্বরূপ প্রকাশ প্রসঙ্গে কারাপালকে ইসলামধর্মে দীক্ষিতকরণ, বাংলার নারীপ্রগতির অন্যতম অগ্রদূতী বেগম রোকেয়ার আদর্শে আপ্লুত হয়ে নিজের সেক্রেটারি একজন ইংরেজ যুবতিকে অনুপ্রাণিতকরণ, ইত্যাদি ইত্যাদি। একসময় সকলের উদ্দেশে উদাত্ত ভাষায় দস্তাবেজে দ্বীন আহ্বান জানালেন, ‘বিশ্ব মুসলিম সংস্থা নামক আমেরিকাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে যোগদান করেছি ইসলামধর্মের সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে।’ তিনি আরো জানালেন, ‘ইসলামধর্ম ভৌগোলিক সীমারেখা অস্বীকার করে; শান্তি-সমৃদ্ধির জন্য বিশ্ববাসীর উচিত ইসলামধর্মকে একমাত্র ধর্ম বলে গ্রহণ করা; কারণ, অন্যসব ধর্মের ভিত্তি মিথ্যা। এইসব মিথ্যাকে ভেঙে দিতে পারে একমাত্র শক্তি- ইসলামধর্ম, যার প্রমাণ রয়েছে আল্লাহর প্রেরিত সত্যগ্রন্থ কুরআনে। চৌদ্দশত বছরেরও বেশি সময় ধরে অবিকৃত অবস্থায় চলে আসছে এই সত্যগ্রন্থ। রোজ-কেয়ামত পর্যন্ত স্রষ্টার এই নেয়ামত অবশ্যই বিদ্যমান থাকবে। অপরিবর্তিত আল্লাহপ্রণীত এই কুরআনের হুকুম-আহকাম মুসলমানদের জীবনে বাস্তবায়ন করার দ্বারা এই নশ্বরদেহ ত্যাগের পরবর্তী জীবনাধ্যায়ে অমরাবতীর অমৃতসুধা পানে চিরসুখের অধিকারী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন সম্ভব।’

মাসুদ মিয়া সভাপতির অনুমতি নিয়ে বললেন, ‘আমি অবশ্য আপনাদের কমিটি-সমিতির সভ্যটভ্য নই। আমার কথায় আপনাদের প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি হবে না বিবেচনায় এবং সত্যপ্রকাশের আগ্রহে কয়েকটি কথা বলতে চাই। অবশ্য তা কারো অনবিদিত নয়, দেশবিভাগের পর ১৯৪৮ সালে, চৌধুরি খালেকউজ্জামান মুসলিমবিশ্বের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনায় এক আদর্শপ্রণোদিত একক সংস্থা স্থাপনের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ব্যথাক্ষুব্ধ অন্তরে পাকিস্তান মুসলিম লীগের সভাপতির পদটি ত্যাগ করেছিলেন।’ হঠাৎ মাসুদ মিয়ার মনের মধ্যে তোলপাড় করতে লাগল পাকিস্তান আমলের একটি দৃশ্য; তাই বললেন, ‘পাকিস্তানের মুসলিম ভাইরা বাঙালির সঙ্গে লুকোচুরি দৌড় প্রতিযোগিতায় ইসলামিক হোলি খেলা খেলতে চেয়েছিল; পাকিস্তানকে দ্রুত ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনায়, অভিজাত করার বাসনায়, বিশেষ করে হিংসুককাঙাল পাঞ্জাবি মুসলিম ভাইরা উঠেপড়ে লেগেছিল। আর এই সংকটের সময় বাঙালি ঘানি টানছিল জীবনের তাগিদে, সম্পদের সৌন্দর্যে নয়, বরং কাঙাল পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অপমান সহ্য করতে। হায় ইসলামধর্ম! হায় ইসলামিক ভ্রাতৃত্ব!’ পাকিস্তান আমলের বাঙালির দৃশ্য প্রকাশ করতে-করতে মাসুদ মিয়া ডানে-বাঁয়ে তাকালেন, দেখলেন তাজিদউল্লার মতো লোকদের মুখে চুন পড়েছে। যোগ করলেন, ‘আর সেদিন, একাত্তরে, বাঙালি মুসলমানরা নিধনযজ্ঞে পাঠান ও পাঞ্জাবি মুসলমানের বর্বরতার চরম পরাকাষ্ঠা হয়নি কি? চেয়ে দেখুন মধ্য-এশিয়ার চিত্রটি- ইরান ও ইরাকের যুদ্ধের কারণে ১৯৭৯ সাল থেকে নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতার ধিক্কৃত দৃষ্টান্তটিকে। ভৌগোলিক সীমারেখা রক্ষার জন্য লাখ লাখ মানুষের এ কী লক্ষ্যহীন আত্মাহুতি!’ মাসুদ মিয়া তার মন্তব্যের পক্ষে বক্তব্য খুঁজতে চারদিকে দৃঢ়ভাবে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন। তাজিদউল্লা জড়সড়ো হয়ে চেয়ারে বসে রইল, বদরুদ্দিন খুব ঘনিষ্ঠমনে সিগারেট টেনে চললেন, দস্তাবেজে দ্বীন অন্যদিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে রইলেন; একই সঙ্গে দরজার পর্দা কাঁপতে কাঁপতে নীরব হয়ে গেল। মাসুদ মিয়া একটু থেমে আবার গম্ভীরকণ্ঠে শুরু করলেন, ‘এইসব পর্যবেক্ষণের পর সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা করলে একটিমাত্র সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়- আদর্শ যত মহৎ হোক-না কেন, বাস্তবের মাপকাঠিতে যদি তা না-মিলে, তাহলে একে অকেজো বলে পরিত্যাগ করা উচিত; মরিচাধরা লোহা দিয়ে সেতু তৈরি করার পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রয়োজনে পরিহার্য।’

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়