সাঈদুর রহমান লিটনের হাসির গল্প
শরীফ মিয়ার পরীর খোঁজ

এক এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শরীফ মিয়া। টাকা-পয়সার অভাব নেই, ধান-চাল-গরু-ছাগল সবই আছে, শুধু একটা জিনিসেরই ঘাটতি,পরীর মতো সুন্দর বউ।
শরীফ মিয়ার বিয়ের বয়স বহু আগেই পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, মেয়ে হতে হবে পরীর মতো সুন্দর! গ্রামের লোকেরা ভাবে, এ বুঝি নতুন কোনো জাতের গরুর কথা বলছে!
প্রথমে দেখা হলো নাছিমার সাথে। নাছিমা এমন সুন্দর যে তাকে দেখলে পুকুরের পানি পর্যন্ত থমকে দাঁড়ায়। চাঁদ নাকি একদিন লজ্জায় মেঘের আড়ালে লুকিয়েছিল। সবাই বলল, এইবার বুঝি শরীফের মন ভরবে।
মেয়ে দেখেই শরীফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
- মেয়ে সুন্দর, কিন্তু পরীর মতো না।
ঘটক সাহেব তখনো আশাবাদী। কিছুদিন পর খবর এলো, দশ গ্রাম পরে হেলেনা নামের এক সুন্দরী আছে। দশ গ্রামে তার মতো রূপবতী আর নেই। শরীফ মিয়া গম্ভীর মুখে ঘটককে নিয়ে হাজির।
হেলেনা এসে বসতেই ঘরের বাতাস বদলে গেল। এমন হাসি যে, পাশে বসা নারকেল গাছও যেন একটু নুইয়ে পড়ল। শরীফ চা খেতে খেতে বেশ সন্তুষ্ট দেখাল।
সবাই ভাবল, এবার বুঝি বিয়ে পাকা।
হঠাৎ শরীফ বলল,
- এই মেয়েকে বিয়ে করা সম্ভব না।
ঘটক হতভম্ব।
- কেন?
- কারণ মেয়েটি পরীর মতো সুন্দর।
ঘরে নীরবতা। কেউ বুঝল না, পরীর মতো সুন্দর হওয়াই তো তার শর্ত ছিল! পরে জানা গেল, তার যুক্তি, মেয়েটি সুন্দর কিন্তু পরীর মতো না।
ঘটক কপাল চাপড়াল।
এরপর রাজবাড়িতে রূপবতী রহিমার খবর এলো। যে দেখে সেই পাগল। রহিমা নাকি আয়নায় তাকালে আয়নাই লজ্জায় ফেটে যায়। শরীফ গেলেন দেখতে।
রহিমাকে দেখে শরীফের চোখ বড় বড়। চা খেতে গিয়ে চামচ উল্টো ধরে ফেললেন। মনে হলো পছন্দ হয়েছে।
কিন্তু শেষমেশ ঘোষণা করলেন-
- এই মেয়ে পরীর মতো সুন্দর না। আমি বিয়ে করতে পারবো না।
ঘটক এবার মহা বিরক্ত।
- আপনি আসলে চানটা কী?
শরীফ গম্ভীর,
- আমি পরীর মতো সুন্দরী মেয়ে চাই। একদম নিখুঁত।
এভাবে প্রায় একশ মেয়ে দেখা হলো। কেউ বেশি সুন্দর, কেউ কম সুন্দর, কেউ বেশি মানুষ সুলভ, কেউ কম। কিন্তু কারো মধ্যে শরীফ তার কল্পনার ‘পরী’ খুঁজে পেল না।
শেষে পাশের রাজ্যে খবর এলো- অনিন্দিতা নামের এক মেয়ে আছে। রূপে-গুণে সেরা। তার মতো সুন্দরী পৃথিবীতে আর নেই। লোকজন বলল, এবার না পছন্দ করলে শরীফের চোখে সমস্যা আছে।
শরীফ নিজে গিয়ে দেখলেন। অনিন্দিতা সত্যিই অসাধারণ। কথা বলে বোঝা গেল বুদ্ধিমতী, হাসলে মনে হয় ফুল ফুটছে।
সবাই চুপচাপ শরীফের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
- না। হবে না।
এবার গ্রামের লোকজন আর সহ্য করতে পারল না।
- কেন হবে না?
- এই মেয়ে পরীর মতো সুন্দর না।
ঘটক হাত তুলে বলল,
- আপনার আর বিয়ে করার দরকার নাই। এরচেয়ে সুন্দরী মেয়ে পাওয়া যাবে না। আপনি না বিয়ে করেই থাকেন।
শরীফ দৃঢ় স্বরে বললেন,
- আমি পরীর মতো সুন্দরী না পেলে বিয়ে করবো না। সারাজীবন একা থাকবো।
একদিন গ্রামের এক বুদ্ধিমান লোক তাকে প্রশ্ন করল,
- আপনি যে পরীর মতো মেয়ে চান, পরী দেখতে কেমন? তার রূপের বর্ণনা দেন। সেই রকম মেয়ে খুঁজে আনি।
শরীফ একটু থামলেন। দাড়ি চুলকালেন। তারপর বললেন,
- আমি তো কখনো পরী দেখিনি। পরী কেমন, কী তার রূপ- আমার জানা নাই। তবে শুনেছি, পরীরা খুব সুন্দরী হয়।
লোকটা হেসে বলল,
- মানে আপনি যে জিনিস দেখেননি, তার মতো মেয়ে খুঁজছেন?
শরীফ গর্বভরে বললেন,
- হ্যাঁ। আমি আদর্শ চাই।
লোকটা মাথা নেড়ে বলল,
- আপনি আদর্শ না, ধারণা বিয়ে করতে চান। সমস্যা মেয়েদের মধ্যে না, আপনার কল্পনায়।
তারপর থেকে গ্রামের মানুষ যখনই কোনো অসম্ভব দাবি করে, সবাই বলে-
এই বুঝি আবার শরীফ মিয়ার পরীর খোঁজ!
শরীফ মিয়া এখনো অবিবাহিত। মাঝে মাঝে চাঁদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। মনে মনে ভাবেন, কোথায় আমার পরী?
"









































