reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ০৫ জুলাই, ২০২৬

শিবরাম চক্রবর্তীর হাসির গল্প

হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন এবং চাওয়ালার অদ্ভুত আচরণ

শিবরাম চক্রবর্তীর হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধনের সঙ্গে সেদিন দেখা হয়ে গেল। হর্ষবর্ধন ধনী মানুষ, কলকাতায় তার কাঠের ব্যবসা। শিব্রাম চক্রবর্তীর গল্পে তাকে মাঝেমধ্যেই চেঞ্জে যেতে দেখা যায়। চেঞ্জেই বোধহয় এসেছিলেন বাংলাদেশে। সঙ্গে শ্রীমান গোবরা ভায়া।

স্টেশনে তাদের দেখেই আমি চিনতে পারলাম এবং অতিশয় পুলকিত হয়ে কাছে গিয়ে বললাম, আপনি হর্ষবর্ধন দাদা না?

হর্ষবর্ধন মনে হলো খানিকটা চমকে উঠলেন। আমাকে আপাদমস্তক নীরিক্ষণ করে বললেন, আপনি প্রফুল্ল না? ওই যে কলকাতায় আমার কাছ থেকে তিন শ টাকা বাগিয়ে কেটে পড়েছিলেন?

এহেন কথা শুনে আমার অন্তরাত্মা লাফিয়ে উঠল! আমি হঠাৎ হঠাৎ বন্ধু-বান্ধবদের টাকা হাতিয়ে সরে পড়তে পারি কিন্তু নিতান্ত অপরিচিতদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা আমার চিন্তাভাবনার কয়েক আলোকবর্ষ দূরে। তার ওপর আমি কলকাতায় যাইওনি।

হর্ষবর্ধনের কথার উত্তরে বললাম, আমি সচরাচর উতফুল্ল থাকি, তবে আমার নাম প্রফুল্ল না। আমি অমূল্য।

গোবর্ধন এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তিনি বলে উঠলেন, আরে ভাই আপনার মূল্য নির্ধারণ করছে কে? আপনাকে বিনামূল্যে পেলেও আমরা নেব না। কি বল দাদা?

এহেন অপমানজনক কথা শুনেও আমি দমে গেলাম না। হাজার হোক এরা আমাদের অতিথি।

গোবারার মুখপানে চেয়ে প্রশ্ন করলাম, আপনারা কি শিব্রাম নামে কাউকে চেনেন?

হর্ষবর্ধন পুলকিত হয়ে বললেন, তিনি তো আমাদের বন্ধু ছিলেন। আমাদের কথা তিনিই তো প্রথম প্রকাশ করেন। লোকটা বড় ভালো ছিল। আহা! আহা! তবে তার কাছে এখনো আমি পাঁচ শ টাকা পাই। ওই যে তিনি ধার নিয়েছিলেন একবার তারপর গোবরার কাছ থেকে ধার করে এনে শনিবারে আমাকে দিয়েছিলেন।

তারপর আমার কাছ থেকে ধার করে নিয়ে পরের শনিবারে গোবরাকে দিয়েছিলেন। এখনো রোজ শনিবার গোবরা আমাকে পাঁচ শ টাকা দেয়। পরের শনিবারে আমি গোবরাকে দিই। লোকটার বুদ্ধি ছিল।

আমি কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বললাম, আমি উনার লেখার একজন ভক্ত। এখানে তো তিনি আপনাদের সঙ্গে নেই। তাই আপনাদের কথাগুলো আমাকেই লিখতে হবে।

হর্ষবর্ধন দারুণ খুশি হলেন বলে মনে হলো। আমাকে বললেন, তাহলে চল যাওয়া যাক। আমরা যাচ্ছিলাম স্টেশনের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে।

যেতে যেতে হঠাৎ উদাস গলায় গোবরা ভায়া বলে উঠলেন, আচ্ছা অমূল্য তোমাদের এখানে এখন আমের মূল্য কেমন?

আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। এটা তো আমের সিজন না। বুদ্ধি করে শিব্রাম বাবুর মতো করে বললাম, আমের আশা বাদ দেন গোবরা ভাই। দেশে আমাশার খুব প্রকোপ। শেষে আম খেয়ে আপনি হতাশায় ডুববেন।

হর্ষবর্ধন হাসি হাসি মুখে বললেন, তুমি তো খুব শিব্রাম বাবুর মতো কথা শিখেছো হে। চালিয়ে যাও। আচ্ছা তোমাদের দেশে নাকি কি সব সমস্যা হচ্ছে?

আমি বলি, দাদা অমাবস্যার দিনে সমস্যা কিছু তো হবেই। আমি তার সঙ্গে জড়িত হয়ে পীড়িত হবেন না আশা করছি। এখন পাশের চায়ের দোকানে চা খান অথবা আমাকে একটু চাখান।

গোবরা ভায়া বললেন, চমৎকার কথা শিখেছো অমূল্য। তোমার মূল্য যে এখন অমূল্য তা বলাবাহুল্য।

চা খাওয়ার জন্য পাশের চায়ের দোকানে বসলাম। চা খাচ্ছি। উনাদের নিজের পয়সা খরচ করে বিস্কুট চাখাচ্ছি। চায়ের দোকানদার মোতালেব মিয়া ছোট একটি চৌকিতে বসে অতি উৎসাহে আমাদের চা সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। তার চোখে-মুখে যেন আনন্দ ছিটকে পড়ছে, খানিকটা ঝরে পড়ছে বললে অত্যুক্তি হবে না। মনে মনে সন্দেহ হলো সে ও হর্ষবর্ধনদের চিনে নাকি। চিনার কথা না, চীন দেশে থাকলে ও নয়। কিন্তু চাওয়ালার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি সে প্রচণ্ড শক্তিতে ও প্রচুর ভক্তিতে পায়ে পড়ে যাবে। সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমিও হতাশ ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ লক্ষ করলাম লোকটা আমার গাড়ের দিকে তাকাচ্ছে, তার মানে আমার পেছনে কাউকে দেখছে। আমার পাশের, পাশের, অর্থাৎ পাশের দুজন গোবরা এবং হর্ষবর্ধন মহানন্দে চা খেয়ে যাচ্ছেন। তাদের সানন্দে চা খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের রং চা খাওয়াতেই জগতের সব আনন্দ। আমি কৌতূহলবশত একটু পেছনে থাকাতেই দেখি এক হলুদ পাঞ্জাবি পরা লোক আসছে। লোকটা কাছেই এসে পড়েছিল, আসতেই চাওয়ালা আমাদের ফেলে হুমড়ি খেয়ে লোকটার পায়ে পড়ে কদমবুসি করে গদগদ কণ্ঠে বলল, হিমু ভাই, আপনে কেমন আছেন?ধর্ষবর্ধন গোবর্ধন তখনো চা খেয়ে যাচ্ছেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়