হানিফ ওয়াহিদের হাসির গল্প
বাবু

মেসেঞ্জারে একটা কল এসেছে, হ্যালো বাবু, কেমন আছো?
আমি সবেমাত্র দুপুরের ভাত ঘুম দিচ্ছি, ঘুমঘুম গলায় বললাম, আপনি কে? আমাকে বাবু ডাকছেন কেন?
তার কণ্ঠ রহস্যময়, তুমি তো আমার বাবুই...
তার কথা শেষ না করতে দিয়ে বললাম, আমাকে কোন এঙ্গেল থেকে আপনার বাবু মনে হয় খালাম্মা? যদি বাল্যবিয়ে করতাম, এতোদিনে আমার নাতিনের পর্যন্ত অলরেডি বিয়ে হয়ে যেতো। আপনি কে? এমন ওয়াও ওয়াও শব্দ করছেন কেন?
ওয়াও ওয়াও শব্দ আমি করছি না, আমার নাতি বাবুটা কাঁদছে। দেখেন না খুবই বিরক্ত করছে।
আপনার বাবুর বয়স কত?
আমার না, আমার মেয়ের বাচ্চা, এই তো বারো মাস...
বাবু কি এখনো বিছানায় মুতে?
কী বল এসব? ছোট বাচ্চা মুতবে না!
ও খালাম্মা, আমার বয়স কিন্তু বারো মাস না, আমি বিছানায় মুতি না। আমি ওয়াও ওয়াও করে কাঁদিও না। আপনি কে?
বল তো আমি কে?
আমি খুবই বিনয়ী গলায় বললাম, খালাম্মা আমার বুদ্ধি খুবই কম। অনুমান করতে পারছি না।
হতাশ হয়ে বলল, আমাকে বারবার খালাম্মা বলছো কেন? অল্প বয়সে বিয়ে হইছে বলে এই বয়সেই নাতির মুখ দেখে ফেলেছি, নইলে... আমি নাদিয়া। এইবার চিনতে পারছো?
জি না আপা, আমার পরিচিত জগতে নাদিয়া পাদিয়া নামের কেউ নাই। কলেজ জীবনে অবশ্য অসভ্য, পাজি, অভদ্র একটা মেয়ের সাথে আমার প্রেম হয়েছিল, ওর নাম ছিল নাদিয়া।
মেয়েটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, আমিই সেই নাদিয়া!
আমি লাফিয়ে উঠে বললাম, হায় আল্লাহ! শয়তান আমার উপর পূনরায় আছর করলো কেমনে? তুমি আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আগে থেকে ছিলে নাকি!
না। ফলোয়ার হয়ে থাকতে পারি না?
তা অবশ্যই পারো। আমার মনে হয় ফেসবুক থেকে ফলোয়ার অপশনটা বাদ দেওয়া উচিত, তাহলে আজেবাজে মানুষকে ফেইস করতে হবে না। তা এতোদিন পর কী মনে করে? হঠাৎ পুরোনো প্রেম লাফিয়ে উঠার কারণটা জানতে পারি? আমার ভবিষ্যৎ পাতিলের কালির মতো কালো, সেজন্য না আমাকে ছেড়ে গেলে?
নাদিয়া গম্ভীর কণ্ঠে বলল, আমি কি তোমার খোঁজ খবর রাখতে পারি না? আমাকে এতোটাই পর মনে করো?
আমি সন্দেহ নিয়ে বললাম, উঁহু, নিশ্চয় কাহিনি আছে। কুছ কুছ হোতা হায়। শয়তান শুধু শুধু আমার মাথায় আছর করে নাই। ডাল মে কুছ কালা হায়।
আরে নাহ! অনেকদিন পরে হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়লো। ভাবলাম খোঁজ খবর নেই।
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, এতোদিন পর প্রেম একেবারে লাফিয়ে মাথায় উঠলো? ভালো কথা। চলো পরকীয়া করি। করবা? আমার খুব শখ একটা পরকীয়া করার...
নাদিয়া খিলখিল করে হেঁসে উঠলো, তুমি ভালোই মজার মানুষ। তোমার লেখা ফেসবুকে পড়ি তো। ভালো লাগে। একটা পোস্ট দেখলাম, তুমি গল্প সংকলন বের করতেছো।
হা, একটা প্রকাশনীর সাথে আলাপ হয়েছে। ওরা শর্ত দিয়েছে, লেখা অবশ্যই মানসম্মত হতে হবে। আজেবাজে লেখা চলবে না।
এই শোনো, আমিও কিন্তু আজকাল টুকটাক লিখি। ফেসবুকে আমার পোস্ট দেখো না?
না। তুমি লেখালেখি কর, আমি জানতাম না। কংগ্রেচুলেশনস। কিন্তু তুমি তো স্কুল কলেজ জীবনে গাধা মার্কা ছাত্রী ছিলে, আমাকে প্রেমপত্র লিখতে গিয়ে সাধারণ বানান লিখতেও ভুল করতে...
এই শোনো, তোমার সংকলনে কিন্তু আমার একটা গল্প দিও। আমি কালকেই পাঠিয়ে দিবো। আমার গল্প অবশ্যই রাখবে কিন্তু।
মনে মনে বললাম, শালি সারাজীবনে একবার খবর নেয় নাই, এখন তাহলে এই কারণে খাতির জমাতে এসেছে?
কী হলো? রাখবে তো?
নিশ্চয়, নিশ্চয়। তুমি আমার আপনজন বলে কথা!
এই শোনো, আমার মেয়েও ফেসবুকে লেখালেখি করে, ওরও একটা গল্প দিও।
আচ্ছা, তোমার জামাইরে আর বাকী রাখলা কেন? ওনারও একটা লেখা পাঠিয়ে দিও। ইচ্ছে করলে তোমার নাতিরটাও দিতে পারো...
বিকেলে আমার এক বন্ধুর ফোন। এই শহরেই থাকে, আমাকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে থাকলেও জীবনে একটা রিয়েক্ট করে দেখে না, কিন্তু মেয়েদের পোস্ট পেলে ধুমাইয়া লাভ রিয়েক্ট করে, মজার মজার কমেন্ট লিখে।
কী রে আছিস কেমন?
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, এখনো মরি নাই, মনে হয় বেঁচে আছি।
ভাবি কেমন আছে?
মাশাল্লাহ।
আর ছেলেমেয়েরা?
বিরক্ত গলায় বললাম, আমি, আমার বউ ছেলেমেয়ে, পাড়া প্রতিবেশী, আমার প্রাক্তন, আমার পাড়ার মুদির দোকানদার, মাছ তরকারি ওয়ালা সবাই ভালো আছে। হঠাৎ কী মনে করে?
আরে শালা, আমি তোর খোঁজ খবর নিবো না? তুই আমার ল্যাংটা বেলার বন্ধু না? আমি তলে তলে সব খবর রাখি, আমি তোর মতো এতো হারামি না।
আমি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। কী বলবো ওকে?
এই শোন, কালকে আমার অফিসে চলে আয় একসাথে আড্ডা দেই। কতদিন হয় তোর দেখা পাই না। চলে আয়।
দেখি...
নো দেখাদেখি। তুই আমার দোস্ত, তোর জন্য আমার প্রাণ কাঁদে রে... নতুন যার সাথেই দেখা হয় আমি তাকে বলি, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে তুই হচ্ছিস সবচেয়ে ভালো মানুষ। তোর ভাবি বলছিল, ওয়াহিদ ভাইকে অনেকদিন হয় দেখি না...
আমি আবারও ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। আমি যে এতো ভালোমানুষ নিজেও জানতাম না।
কী রে, আসছিস তো কালকে?
না রে, মনে হয় সময় বের করতে পারবো না। সময় নিয়ে আসবো একদিন। ফোন করেছিস কেন বল। তুই তো বেহুদা সময় নষ্ট করার মানুষ না।
বন্ধু কাঁচুমাচু মুখে বলল, এই শোন, তুই নাকি একটা গল্প সংকলন বের করছিস? তোর ভাবি আমাকে এইমাত্র ফোন দিয়ে বলল। সে ফেসবুকে তোর পোস্ট দেখেছে।
আমি বিরস মুখে বললাম, হা।
তোর ভাবি টুকটাক ফেসবুকে লেখালেখি করে। আমাকে বলল, সে একটা লেখা দিতে চায়। আমি বললাম, ওয়াহিদ আমার ল্যাংটা কালের বন্ধু। ও তোমার লেখা না নিয়ে যাবে কই? ঠিক বলেছি না দোস্ত?
আমি চিঁহি চিঁহি গলায় বললাম, অবশ্যই ঠিক। অবশ্যই।
আমি আস্তে আস্তে মোবাইলটা হাতে নিলাম। প্রকাশককে ফোন দিয়ে বললাম, ভাইজান, আগামী কয়েকমাস আমি খুবই ব্যস্ত থাকবো, সেজন্য আপনার গল্প সংকলন নিয়ে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আমাকে মাফ করে দেন।
"









































