মারুফ আহমেদ, কুমিল্লা
আড়ালেই রয়ে গেছে হুমায়ুনের কীর্তি

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পাকিস্তান জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, খেলেছেন ঢাকা মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে। দলটির সেরা সময়ের অন্যতম কা-ারিও ছিলেন তিনি। দূরপাল্লার শটে তার দর্শনীয় গোলগুলো দেখার পর বন্দনায় মেতে উঠতেন মাঠে উপস্থিত হাজারো দর্শক, ক্রীড়া ও আলোকচিত্র সাংবাদিকরা। এত কিছুর পরও আড়ালেই রয়ে গেছে হুমায়ুন কবীরের কীর্তি।
দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ নানা রোগের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন হুমায়ুন। শেষ পর্যন্ত সে লড়াইয়ে আর পেরে উঠেননি। গত ২৭ নভেম্বর কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতির নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে এই কীর্তিমান ফুটবলারের বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। বার্ধক্য অবস্থায় তিনি প্রায়ই পরিবারের সদস্যদের কাছে অপ্রাপ্তি নিয়ে আক্ষেপ করতেন। ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার কত অখ্যাত লোকদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, বাৎসরিক পেনশন বা ভাতা দিলেও তার কপালে জোটেনি কোনো পুরস্কার, স্বীকৃতি কিংবা ভাতা। ফুটবলে তার অবদানগুলোও রয়ে গেছে আড়ালে। তাই হতাশা আর দুঃখকে সঙ্গী করেই চলে যেতে হয়েছে হুমায়ুন কবীরকে।
১৯৩৪ সালের ৫ নভেম্বর কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জনপদ ময়নামতির সিন্ধুরিয়াপাড়া গ্রামে জন্ম হুমায়ুনের। কৈশোরেই ফুটবল আঙিনায় পা পড়ে তার। কুমিল্লা ইউনিয়ন ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবলে অভিষেক তার। স্কুলের গ-ি পেরোনোর পর আরো পরিণত ফুটবলার হয়ে উঠেন হুমায়ুন। তার ফুটবলশৈলীতে মুগ্ধ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ কর্তৃপক্ষ তার কাঁধেই নেতৃত্বভার তুলে দেয়।
১৯৫৫ সালে বিখ্যাত ফুটবলার শাহজাহানের অনুরোধে ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগদান করেন হুমায়ুন। পরের বছর লিগে মোহামেডান রানার্সআপ হয়। তবে ১৯৫৭ সালে ঠিকই চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় পরে হুমায়ুনের মোহামেডান। ১৯৫৬ আসরে ফায়ার সার্ভিসের বিরুদ্ধে হুমায়ুনের মনোমুগ্ধকর পারফরম্যান্স নিয়ে আজও চর্চা হয়। ম্যাচজুড়ে মোহামেডান প্রচ- চাপ সৃষ্টি করে খেললেও গোল পাচ্ছিল না কিছুতেই। খেলা শেষ হওয়ার ৩ মিনিট আগে মোহামেডান একটি কর্নার আদায় করে নেয়। লেফট আউট শাহ আলম বল বসায় কিক নিতে। পরে শাহজাহানের অনুরোধে হুমায়ুনকে দিয়ে কর্নার কিক করানো হয়। শাহজাহান হুমায়ুনকে রেইনবো কিক নিতে বলেছিলেন। হুমায়ুন তাই করলেন। ফায়ার সার্ভিসের ডিফেন্ডার চাঁদ আপ্রাণ চেষ্টা করেও মাথায় লাগাতে পারেননি বল। ফলে সরাসরি বল জড়িয়ে যায় ফায়ার সার্ভিসের জালে। গোল ... !!! হুমায়ুনের ওই ‘অতিমানবীয়’ গোলেই সে দিন বিজয়ীর বেশে মাঠ ছাড়ে মোহামেডান।
হুমায়ুন কবীরের এরকম অনেক ফুটবলশৈলী দেখেছে এদেশের ফুটবল পাগল দর্শক। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে এসেও সেসব দর্শকের হৃদয়ে আজও হুমায়ুনের গোলগুলোর স্মৃতি তরতাজা। অথচ এমন একজন ফুটবলারকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে পারেনি ফুটবল ফেডারেশন, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তথা বাংলাদেশ সরকার। জীবন্ত হুমায়ুনকে আর কখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে মৃত্যুর পর তার আত্মাটাকে তো শান্তিতে রাখা যায়। ফুটবলে অসামান্য অবদানের জন্য হুমায়ুনকে কোনো মরণোত্তর সম্মানে ভূষিত করা হোক, এটাই এখন তার পরিবার, ফুটবল সংগঠক ও কুমিল্লাবাসীর চাওয়া।
"









































