মো. জাহিদুল ইসলাম
বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬
মেসিদের মিশর পরীক্ষা

ফুটবল বিশ্বে লাতিন আমেরিকার ছন্দ বনাম আফ্রিকান শক্তির লড়াই সবসময়ই এক আলাদা রোমাঞ্চের জন্ম দেয়। আর্জেন্টিনা এবং মিশরের মতো দুটি ঐতিহ্যবাহী দল যখন একে-অপরের মুখোমুখি হয়, তখন গ্যালারি থেকে শুরু করে টেলিভিশন পর্দার সামনে বসে থাকা কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। শক্তির বিচারে আর্জেন্টিনা অনেকটা এগিয়ে থাকলেও, মিশরের লড়াকু মানসিকতা এবং চমকে দেওয়ার ক্ষমতা ম্যাচটিকে একটি হাইভোল্টেজ ড্রামায় রূপান্তর করার সব রসদ জোগায়।
ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আজ মঙ্গলবার ১০টায় মুখোমুখি হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও আফ্রিকার প্রতিনিধি মিশর। শেষ ষোলোর এ ম্যাচে একদিকে রয়েছে শিরোপাধারীদের অভিজ্ঞতা; অন্যদিকে ইতিহাস গড়া মিশরের আত্মবিশ্বাস। ফলে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে জমজমাট এক ম্যাচের অপেক্ষায় ফুটবলপ্রেমীরা। ৩২ দলের পর্বে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক ও শারীরিক ফুটবল লিওনেল স্কালোনির দলকে বেশ চাপে ফেলেছিল। ম্যাচটি বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে নকআউট পর্বে সামান্য অসতর্কতাও বড় মূল্য চোকাতে হতে পারে।
তবে এবার আর্জেন্টিনার সামনে ভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষ। মিশর বলের দখল নিয়ে খেলতে আগ্রহী নয়; বরং সুসংগঠিত রক্ষণ, শৃঙ্খলাপূর্ণ কৌশল এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের ওপর নির্ভর করেই তারা সাফল্য পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ পেনাল্টি শুটআউটে জয় তুলে নিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ জিতেছে উত্তর আফ্রিকার দলটি। ম্যাচজুড়ে তারা রক্ষণভাগকে শক্তিশালী রেখে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল এবং আক্রমণে মোহামেদ সালাহ ও ওমর মারমুশের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর ভরসা করেছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মিশরের এ কৌশল আর্জেন্টিনার জন্য তুলনামূলকভাবে পরিচিত। প্রতিপক্ষ যদি উচ্চ প্রেসিং না করে, তাহলে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড নিজেদের ছন্দে খেলার সুযোগ পাবে। এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো দে পলের সমন্বয়ে গড়া মাঝমাঠ ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। এছাড়া লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ফর্ম আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তার সঙ্গে জুলিয়ান আলভারেজ ও নিকোলাস গঞ্জালেসের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার জন্য একাধিক বিকল্প তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে মিশরও সহজে হার মানার দল নয়। শক্তিশালী রক্ষণ, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক এবং সালাহ-মারমুশের মতো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য থাকা খেলোয়াড়দের কারণে তারা যেকোনো সময় বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই শুরু থেকেই সতর্ক থাকতে হবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। দলগত প্রস্তুতির দিক থেকে আর্জেন্টিনা কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও চোটের কারণে ডিফেন্ডার লিওনার্দো বালের্দিকে পাচ্ছে না। তবে দলের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। সম্ভাব্য একাদশে গোলপোস্টে থাকবেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। রক্ষণে নাহুয়েল মলিনা, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও ফাকুন্দো মেদিনা। মাঝমাঠে থাকবেন রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। আক্রমণে দেখা যেতে পারে লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজ ও নিকোলাস গঞ্জালেসকে।
মিশর অবশ্য একাধিক চোট সমস্যায় ভুগছে। আহমেদ ফাতুহ ও মোহাম্মদ আবদেল মোনেম নিশ্চিতভাবেই মাঠের বাইরে থাকবেন। করিম হাফেজের খেলাও অনিশ্চিত। তবে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দলে ফিরছেন মোহানাদ লাশিন, যা কোচের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর। সম্ভাব্য একাদশে গোলরক্ষক হিসেবে থাকবেন শোবেইর। রক্ষণে মোহাম্মদ হানি, আবদেলমাগিদ, রাবিয়া ও এল দেবেস। মাঝমাঠে দায়িত্ব পালন করবেন আতেয়া ও মোহানাদ লাশিন। আক্রমণভাগে ত্রেজেগেটকে সহায়তা করবেন মোহামেদ সালাহ, আশুর এবং ওমর মারমুশ। আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই বল পজেশন বা বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেলার চেষ্টা করবে। তারা ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ফাটল ধরাতে চাইবে। হাইপ্রেসিং ফুটবল খেলে মিশরের খেলোয়াড়দের নিজেদের ডি-বক্সে চেপে ধরাই হবে আলবিসেলেস্তেদের মূল লক্ষ্য।
মিশর সম্ভবত ‘লো-ব্লক’ বা রক্ষণাত্মক কৌশল বেছে নেবে। তারা নিজেদের ডিফেন্স জমাট রেখে আর্জেন্টিনাকে আক্রমণ করার আমন্ত্রণ জানাবে এবং আর্জেন্টিনা ভুল করলেই কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার চেষ্টা করবে। সালাহর গতিকে ব্যবহার করে আর্জেন্টিনার হাইলাইন ডিফেন্সের পেছনে ফাঁকা জায়গার সুবিধা নেওয়াই হবে তাদের প্রধান অস্ত্র। কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনাই এ ম্যাচে এগিয়ে। তবে নকআউট পর্বে ছোট ভুলও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। মিশরের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ভাঙতে ধৈর্য, পরিকল্পনা এবং মেসির সৃজনশীলতাই হতে পারে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অন্যদিকে আফ্রিকার দলটি চাইবে শক্ত রক্ষণ গড়ে তুলে সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চমকে দিতে। ফলে ৭ জুলাইয়ের এ লড়াইয়ে উত্তেজনার কমতি থাকার সম্ভাবনা নেই।
"






































