আহমেদ রেজওয়ান, ফেনী
ইউএনওর স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ৫১ লাখ টাকা আত্মসাৎ, ৩ কর্মচারী গ্রেপ্তার

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পের ২৬টি চেকের টাকার অঙ্ক ও বানান পরিবর্তন করে প্রায় ৫১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তিন কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকালে তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—উপজেলা পরিষদের সাবেক সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পার্থ সারথী পাল (বর্তমানে ছাগলনাইয়া উপজেলা পরিষদে কর্মরত), বর্তমান অফিস সহায়ক মো. ফিরোজ এবং নূর ইসলাম। তাদের মধ্যে পার্থ সারথী পালের বাড়ি ফুলগাজীর মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামে, নূর ইসলামের বাড়ি ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের উত্তর বরইয়া গ্রামে এবং মো. ফিরোজের বাড়ি পরশুরাম উপজেলার গুথুমা গ্রামে।
যেভাবে ধরা পড়ল জালিয়াতি
পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বদলিজনিত কারণে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতিকালে ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক ফাহরিয়া ইসলাম উন্নয়ন প্রকল্পের হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা করেন। এ সময় চেকবইয়ের কাউন্টারফয়েল (মুড়ি) এবং ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ২৬টি চেকে টাকার অঙ্ক ও বানান পরিবর্তন করে মোট ৫১ লাখ টাকার সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিনব জালিয়াতির কৌশল
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চক্রটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে গত প্রায় এক বছর ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছিল। সাধারণত ইউএনওর নিখুঁত স্বাক্ষর নেওয়ার পর মূল অঙ্কের আগে অতিরিক্ত সংখ্যা যুক্ত করে চেকের টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হতো। একই সাথে টাকার বানানের অংশেও কাটছাঁট করে পরিবর্তন করা হতো। তবে চেকবইয়ের কাউন্টারফয়েলে এসব পরিবর্তনের কোনো উল্লেখ না থাকায় সাধারণ চোখে তা ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হলেও চূড়ান্ত হিসাব পর্যালোচনার সময় জালিয়াতিটি প্রকাশ পেয়ে যায়। নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ সর্বশেষ এমন চেকে টাকা তোলার তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর মার্চ মাসেই মূল হোতা পার্থ সারথী পাল ছাগলনাইয়া উপজেলায় বদলি হয়ে যাওয়ার পর এই ধরনের জালিয়াতি বন্ধ ছিল।
আইনি পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা
প্রশাসন সূত্রে আরও জানা যায়, গত সোমবার (৬ জুলাই) জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ইউএনও ফাহরিয়া ইসলাম অভিযুক্ত পার্থ সারথী পাল, মো. ফিরোজ ও নূর ইসলামকে তার কার্যালয়ে ডেকে আনেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ফুলগাজী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের স্টেনোটাইপিস্ট-কাম-কম্পিউটার অপারেটর আবদুল হালিম চৌধুরী সুজন বাদী হয়ে ফুলগাজী থানায় একটি জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় আজ মঙ্গলবার তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "চেক জালিয়াতির অভিযোগে মামলা দায়েরের পর অভিযুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা অপরাধের কথা স্বীকার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। বর্তমানে হিসাব-সংক্রান্ত নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট চেক ও ব্যাংকের তথ্যসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে দ্রুত আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।"
এদিকে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ফেনীর স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. দিদারুল আলম এবং বিদায়ী ইউএনও ফাহরিয়া ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পিডিএস/এমএইউ









































