শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ
স্মরণ
নূর হোসেন : গণতন্ত্রের প্রজ্বলিত মশাল

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এক হয়ে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের লক্ষ্যে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা করে। এরশাদ ১৯৮২ সালে একটি ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো তার এই নির্বাচনকে জালিয়াতি বলে অভিযুক্ত করে। তাদের একমাত্র দাবি ছিল, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা।
অবরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকায় একটি মিছিলে নূর হোসেন অংশ নেন এবং প্রতিবাদ হিসেবে বুকে-পিঠে সাদা কালিতে লেখা ছিল-‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। মিছিলটি ঢাকা জিপিওর সামনে জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এলে স্বৈরশাসকের মদদপুষ্ট পুলিশ বাহিনীর গুলিতে নূর হোসেনসহ তিনজন আন্দোলনকারী নিহত হন। এ সময় বহু আন্দোলনকারী আহত হন। নিহত অপর দুই ব্যক্তি হলেন যুবলীগ নেতা নুরুল হুদা বাবুল এবং কৃষক নেতা আমিনুল হুদা টিটু।
নূর হোসেন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সবচেয়ে স্মরণীয় নাম। হাজার হাজার মানুষের মাঝে যেন একটি মুখ, একটি বুক, একটি পিঠ-সবার নজর কেড়েছে। ২৫ বছরের টগবগে যুবক নূর হোসেনের পরনে সেদিন ছিল জিন্সের ট্রাউজার। খালি পা, শার্টটা কোমরে প্যাঁচানো। শরীরের বুকে-পিঠে সাদা রঙে লেখা সেøাগান-‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। ছুটছিল সে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। সমবেত জনতার চোখ বারবার আটকে গেছে ওর বুকে। ওর পিঠে। এ রকম জীবন্ত পোস্টার এর আগে কেউ কখনো দেখেননি। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সেই জীবন্ত পোস্টার পৃথিবীর সব পোস্টার-ব্যানারকে হার মানিয়ে ছিল।
‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ বুকে-পিঠে লিখে জীবন্ত পোস্টার হয়ে তিনি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছেন। চোখে-মুখে স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ নিয়ে ছুটে যাওয়া একটি মানব অগ্নিকুন্ড উপস্থিত জনতার ঘোর কাটার আগেই স্বৈরশাসকের তপ্ত বুলেটে লুটিয়ে পড়ে রাজধানীর রাজপথে। নূর হোসেনের রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। শহীদ হন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এক আবেগী তরুণ ‘নূর হোসেন’। তখন থেকেই নূর হোসেনের বুকে-পিঠে লেখা ছবিটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। এখন অনেকেই (বিশেষত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ) নূর হোসেনকে নিয়ে পৃথক পৃথক বাণী দেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখনো তার হত্যার বিচার হয়নি বা করা যায়নি। যেমনটি যায়নি স্বৈরাচার এরশাদের সঙ্গ ত্যাগ।
একজন নূর হোসেনকে হত্যার পর সারা দেশে জেগে উঠেছিল হাজার হাজার নূর হোসেন। গণতন্ত্রকে স্বৈরাচারের বুটের তলা থেকে মুক্ত করতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নূর হোসেনকে হত্যার ঠিক তিন বছর পরই ১৯৯০ সালে মুক্তি পেয়েছে গণতন্ত্র। নিপাত গেছে স্বৈরতন্ত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলে সত্য যে, গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেন তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিন দশক পার হয়ে এসেও আমরা (বিশেষ করে রাজনীতিকরা) সেই গণতন্ত্রকে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিতে পারিনি।
নূর হোসেনের জন্ম ১৯৬১ সালে। ঢাকার নারিন্দায়। স্বাধীনতাযুদ্ধের পর থেকেই নূর হোসেন ও তার পরিবার ৭৯/১নং বনগ্রাম রোডের এই বাড়িতে থাকতেন। তাদের পৈতৃকবাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার ঝটিবুনিয়া গ্রামে। বনগ্রাম রোডের রাধা সুন্দরী প্রাথমিক বিদ্যালয় পাস করার পর নূর হোসেনের পড়ালেখা ছিল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। স্কুলের নাম গ্র্যাজুয়েট হাইস্কুল। পড়াশোনা বন্ধ করে নূর হোসেন মোটর মেকানিকের কাজ শেখা শুরু করেছিলেন। বাবা মুজিবর রহমান। পেশায় স্কুটার চালক। ঘটনার দিন নূর হোসেনের পরিবার কিছুই জানতে পারেনি। পরদিন পত্রিকায় ছবি দেখে সবাই জানতে পারলেন কী ঘটেছে তাদের ছেলে নূর হোসেনের। পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বারবার অনুরোধ করেও বাবাকে ছেলের খোঁজ দিতে পারেনি পুলিশ। এমনকি নূর হোসেনের লাশও একবারের জন্য দেখতে দেওয়া হয়নি পরিবারের কাউকে।
নূর হোসেনের আত্মত্যাগ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। তাই গণতন্ত্রের লক্ষ্যে নূর হোসেনের রক্তের দাগ মুছে যায় না। জীবন্ত নূর হোসেনকে স্বৈরাচারী ও তার দোসররা যতটা ভয় পেয়েছিল, তারচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল তার লাশকে। আর সে কারণেই গুম করতে চেয়েছিল তারা নূর হোসেনকে। একই কারণে রাতের আঁধারে মাটিচাপা দিয়েছিল তারা নূর হোসেনকে ‘সঙ্গোপনে’।
নূর হোসেনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি যে স্থানে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন, তার নামানুসারে সেই জিরো পয়েন্টের নামকরণ করা হয়েছে নূর হোসেন স্কয়ার। ১০ নভেম্বর তার মৃত্যুর কিছু সময় আগে তোলা তার গায়ে লেখাযুক্ত আন্দোলনরত ছবিটি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের ঐতিহাসিক পতনের দিন ‘গণতন্ত্র মুক্তি দিবস’। ১৯৯০ সালের এই দিনে এরশাদ সরকারের পতন হয়। দিবসটিকে গণতন্ত্র মুক্তি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। ১৯৮২ সালের মার্চে রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর এরশাদ সরকার দেশের রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি পর্যন্ত সবক্ষেত্রে গণবিরোধী ধারা প্রবর্তন করেন। রাজনৈতিক নেতারাও ছাত্র আন্দোলনে ব্যাপক নিপীড়নের শিকার হন। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়। ঢাকা পলিটেকনিকের ছাত্র মনিরুজ্জামান হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার প্রত্যয় ঘোষণা করে।
১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর হরতালের সময় নূর হোসেনকে স্বৈরাচার এরশাদের বাহিনী গুলি করে। নূর হোসেনের বুকে-পিঠে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। অন্যদিকে ওইদিন সেনা ও পুলিশ বাহিনী আমিনুল হুদা টিটুকে হত্যার পর গুম করে। এ ঘটনায় সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে এরশাদ হঠানোর আন্দোলনে নেমে পড়ে। এভাবে ঘটনাক্রমিক আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এরশাদ ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দেন। দীর্ঘ ৯ বছরের শাসনের অবসান ঘটে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর।
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, সেদিন যে দাবিতে নূর হোসেন শহীদ হয়েছিলেন, সে দাবি কি পূরণ হয়েছে? যে আকাক্সক্ষা নিয়ে ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন, সে স্বপ্নের কি বাস্তবায়ন হয়েছে? এ প্রশ্নগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ আমাদের নেই। যারা দেশ ও জাতির কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করে গেলেন, তাদের প্রতি কি আমাদের কোনো দায় নেই! সম্ভত নেই। সে কারণেই আজ আমরা তাদের ভুলতে বসেছি। তাদের সঙ্গে বারবার প্রতারণা করে চলেছি। অল্প কিছু মানুষ নূর হোসেনের মতো সব শহীদের স্মরণ করেন। সেটাও ক্ষেত্রবিশেষ স্বল্প পরিসরে। তবে এ কথাও সত্য যে, আজ হোক আর কাল হোক, সত্যের জয় হবেই। এক দিন হয়তো সেসব আত্মত্যাগী মহানের স্বপ্ন পূরণ হবে। যারা এ দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। হতাশার সব গ্লানি মুছে মেহনতি মানুষের বিজয় এক দিন আসবেই ।
গণতন্ত্রের পথে নূর হোসেন এক প্রজ্বলিত মশাল। এর অনির্বাণ যুগ যুগ অব্যাহত থাকবে। নূর হোসেনদের ক্ষয় নেই। মৃত্যু নেই। এরা মৃত্যুঞ্জয়ী। অভাগা বাংলা জননীর সাহসী সন্তানরা দুঃসময়ে বারবার জেগে উঠেছে প্রবলভাবে। তারই বিমূর্ত স্বাক্ষর শহীদ নূর হোসেন। আজকের দিনে শহীদ নূরের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
"




































